খেলা ও ধুলা

ন্যু ক্যাম্পের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই!

চোখে রাজ্যের ঘুম নিয়ে লীগের খেলা দেখতে বসতাম। এল ক্লাসিকো হলে অবশ্য ভিন্ন কথা। সকালের ক্লাসের চিন্তা তখন তাড়িয়ে বেড়াতো না। সবাই ঘুমালে আস্তে করে টিভিটা ছেড়ে দিতাম, ভলিউম দেয়ার দরকার পড়তো না। কারণ পায়েরাই তখন কথা বলতো। মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে পা লুকাতাম চাদরে আর চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করতাম একটা গোলের জন্য। মাঝেমাঝে গোল গৌণ হয়ে যেত, মুগ্ধ হয়ে দেখতাম টিকিটাকা। বুসকেটসের ব্যাক পাস মাচেরানোর কাছে, মাচেরানোর কাছ থেকে বল নিয়ে যায় দানি আলভেস, দানি আলভেস মেসিকে তো পাস দিবেই দিবে, মেসি থেকে জাভি, জাভি থেকে ইনিয়েস্তা, ইনিয়েস্তা মাঝমাঠকে মুগ্ধ করে বল নিয়ে যেত ডিবক্সের কাছাকাছি, বাঁকানো শটে বল আবার মেসির কাছে, জাভির সাথে ওয়ান টু, তারপর আলতো চিপে গোলকিপারের মাথার ওপর দিয়ে গোল। কী দুর্দান্ত! কী মুগ্ধকর! 

এমনই এক মুগ্ধ করা দলের সমর্থন করতাম এক সময়। একের পর এক চ্যাম্পিয়নশীপ, লীগ টাইটেল আর ব্যক্তিগত অর্জনে মুগ্ধ করা সময় ছিল সেটি। টেকো মাথার এক লোক এসে টিকিটাকার পসরা সাজিয়ে সব ট্রফির টিকবক্সে টিক দিয়ে গিয়েছিল। আর কেনই বা দিবে না, সে দলটাই তো ছিল বিশ্বসেরা। গোলকিপিং এ ভালদেসের বিশস্ত হাত যে কীনা জাতীয় দলে ব্রাত্য হয়ে পুরো মনোযোগটাই ক্লাবে ঢেলে দিয়েছিল। ডিফেন্সে পরীক্ষিত সৈনিক পিকে, পুয়োল, মাচেরানো, দানি আলভেসরা। 

মাঝমাঠের কথা আর কীইবা বলবো, স্বাপ্নিক মাঝমাঠ ছিল সেটি। বুসকেটসের দুই পাশে সৃজনশীলতার পসরা সাজিয়ে বসা জাভি আর ইনিয়েস্তা। আক্রমণের প্রানভোমরা তো একজনই, লিওনেল মেসি; সাথে তার দুই সহযোদ্ধা ভিয়া আর পেদ্রো। প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিতো সেই টিম। বল পজিশন বেশি রাখার আশা খেলা শুরু হবার আগেই ছেড়ে দিতো বিপক্ষ দল। মেসিকে থামাতে হবে এই বুদ্ধি করে দল সাজালে জাভি আর ইনিয়েস্তা ভারী পড়ে যেত, আর মাঝমাঠকে গার্ড দিতে চাইলে মেসি একাই গুড়িয়ে দিতো তাদের। স্বপ্নের এক বার্সেলোনার খেলা দেখার সাক্ষী ছিলাম আমি। সে স্বপ্ন এখন মলিন অনেকটাই। সময়ের খরস্রোতে একে একে হারিয়ে গেছে পুরনো সৈনিকরা। যারা টিকে আছে একদিন তারাও চলে যাবে। রেখে যাবে শুধু মধুর কিছু স্মৃতি। মনে করিয়ে দিয়ে যাবে কেন স্রেফ ক্লাবের চেয়েও বেশি কিছু ‘বার্সেলোনা’। কেন ড্রিম টিমটা আর কখনোই ফিরে আসবার নয়। হায়! 

আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, বার্সেলোনা, ন্যু ক্যাম্প

সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিটুকুও একদিন খড়কুটোর মতো উড়ে ভেসে যাবে।
রঙিন বর্তমান ভুলিয়ে দেবে সাদাকালো সব অতীতগুলোও।
তবু হয়তো কোন একদিন চায়ের চুমুকে নস্টালজিয়ার চাষ করতে করতে মনে পড়ে যাবে পুয়োলের হেডে করা কোন গোলের কথা।
ইনিয়েস্তার মাঝমাঠের কারিকুরি অথবা ভালদেসের মুষ্টিবদ্ধ কোন সেভের কথা।
মাচেরানোর গোললাইন থেকে করা ডিফেন্স হয়তো ফিরে ফিরে আসবে,
সবচেয়ে মিস করবো বুঝি দানি আলভেসের মেসিকে দেয়া সে ক্রসটাই।
জাভির হাতে একটা ব্যালন না দেখার কষ্টটা তখনো তাজা থেকে যাবে,
শুধু থাকবে গার্দিওলার বুড়ো টাকে চুমু খেয়ে মেসির বিদায়ের অপেক্ষাই।

একদিন পুরো ছবিটাই সাদাকালো করে টাঙিয়ে দেবো ঘরের দেয়ালে।
ছেলে মাঝেমাঝেই দেখে অবাক হয়ে ভাববে- কী ওল্ড ফ্যাশন তার বাবাটা!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close