ফেসবুকের অজান্তেই তাদের ব্যবহারকারীদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রভাবিত করা, তাদের তথ্য অপব্যবহার- সব মিলিয়ে এটা একটা উত্তেজনাকর খবর বটে। প্রায় চার বছর পর নিউইয়র্ক টাইমস, চ্যানেল ফোর আর দ্য গার্ডিয়ান ব্যাপারটিকে সামনে না আসলে হয়ত পাঁচ কোটি মানুষ জানতেনই না তাদের অগোচরে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে তাদেরকেই মানসিকভাবে প্রভাবিত করা হয়ে থাকতে পারে!

ঘটনার শুরু ২০১৩ সালে। ফেসবুকে তখন অনেক ধরণের অ্যাপ চলে, যেগুলো মানুষ হালকা মেজাজে ব্যবহার করে। কুইজ অ্যাপ, হরোস্কোপ অ্যাপ ইত্যাদি। তেমনি একটি কুইজ অ্যাপ বানান ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটিরি গবেষক আলেক্সান্ডার কোগান। ‘পার্সোনালিসিটি টেস্ট’ টাইপের সেই অ্যাপ থেকে ফলাফল পেতে হলে নিজের এমনকি বন্ধুদেরও বেশকিছু তথ্য দেয়া জরুরী ছিল। প্রায় ৩ লাখ মানুষ অ্যাপটি ব্যবহার করেছে সেসময়। এভাবে প্রায় ৫ কোটি মানুষের তথ্য চলে যায় কোগানের হাতে।

‘ক্যামব্রিজ এনালিটিকা’ হল নিউইয়র্কভিত্তিক একটি আধুনিক ‘ডাটা এনালাইসিস ফার্ম’ যারা কৌশলে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ভোটারদের এইসব তথ্য ব্যবহার করে থাকে। ডেভেলপার আলেক্সান্ডার কোগান এই ৫ কোটি মানুষের তথ্য, যেগুলো তারা একটা কুইজে অংশ নিতে গিয়ে ‘শেয়ার’ করেছিল, সব ক্যামব্রীজ এনালিটিকার কাছে বেচে দেয়। এখন একজন কর্মকর্তা, ক্রিস্টোফার উইলি- যিনি এই কোম্পানিতে কাজ করেছেন তিনি দাবি করছেন, ২০১৬ সালের আমেরিকা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণায় এইসব তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। কিভাবে? সেই তথ্যগুলো ব্যবহার করে ব্যবহারকারীদের মনতাস্ত্বিকভাবে প্রভাবিত করা হয়েছে ট্রাম্পের পক্ষে। আরও ধারণা করা হচ্ছে ব্রিটেনের ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়া অর্থাৎ ব্রেক্সিটের গণভোটেও সেই তথ্য অপব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

ঘটনা আপাতত এ পর্যন্তই। ক্যামব্রিজ এনালিটিকার প্রধান আলেক্সান্ডার নিক্সকে বরখাস্ত করা হয়েছে। কংগ্রেস থেকে ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গকে বলা হয়েছে ফেসবুক কিভাবে ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে সেটার যথেষ্ঠ প্রমাণাদি পেশ করতে। ব্রিটেনের সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান আবার জাকারবার্গকে ডেকে পাঠিয়েছেন এই মহাবিপর্যয়ের কারণ জানতে। সব মিলিয়ে ব্যাপারটা রাজনৈতিক দিকে মোড় নিয়েছে। রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান ব্যক্তিরা সবাই চটে গেছে ফেসবুকের উপর, জাকারবার্গ পড়ে গেছেন বিপদে।

এই পরিস্থিতিতে জাকারবার্গ কাল প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তার ফেসবুক পেইজে। প্রথমেই তিনি বলেছেন, আমাদের দায়িত্বই হলো ‘ইউজার’দের তথ্য রক্ষা করা। এবং সেটা যদি আমরা না পারি, তাহলে আমরা তাদের জন্য কাজ করার অধিকার রাখি না। ঠিক কি ঘটেছে তা বোঝার জন্য আমি কাজ করছি এবং সাথে সাথে তা আর যাতে না ঘটে, সেটা নিশ্চিত করার জন্যেও।

মার্ক জাকারবার্গ নিজের অবস্থান বেশ পরিষ্কার করে বলেছেন। তথ্য পাচার কিংবা অপব্যবহারের তিনি কিছুই জানতেন না, এমনটি বলেছেন সোজাসুজি। আসলে কিভাবে ক্যামব্রিজ এনালিটিকা কাজটি করেছে সেটার একটা ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেছেন তিনি। ২০১৫ সালে দ্য গার্ডিয়ানের মারফত জাকারবার্গ যখন জানতে পারেন আলেক্সান্ডার কোগান ফেসবুক ব্যবহারকারীদের তথ্য একটি কোম্পানির কাছে দিয়েছে তখন ফেসবুক থেকে কোগানের অ্যাপটি সাথে সাথে সরানো হয়। ফেসবুক থেকে ক্যামব্রিজ এনালিটিকার সাথে যোগাযোগ করা হলে কোম্পানিটি বলে তারা সব তথ্য ‘ডিলিট’ করে দিয়েছে। জাকারবার্গ জানিয়েছেন তাদের কাছে এই তথ্যের সত্যয়ন আছে ক্যামব্রিজ এনালিটিকার পক্ষ থেকে।

কারও কারও মনে প্রশ্ন জেগেছে, নিজেদের ব্যবহারকারীদের তথ্যের ব্যাপারে ফেসবুক কেবল শুনেই কিভাবে নিশ্চিত হতে পারল যে কোনও তথ্য অপব্যবহার করা হচ্ছে না? ফেসবুকের আরও সতর্ক এবং কঠোর হওয়া প্রয়োজন ছিল কি? মার্ক জাকারবার্গ একজন চমৎকার নেতৃত্বগুণ সম্বলিত মানুষ। তিনি তার প্রতিক্রিয়ায় একদম প্রথম অনুচ্ছেদে নিজের দূর্বলতা স্বীকার করে নিয়েছেন। বলেই দিয়েছেন, “আমরাও ভুল করেছি। আরও অনেক কিছু করার আছে।” তবে জাকারবার্গের ‘এপোলজি’তে একদম নরম হননি অনেকে। বিবিসির নর্থ আমেরিকা টেকনোলজি রিপোর্টার ডেভ লি বেশ তিক্ত পর্যালোচনা করেছেন জাকারবার্গের কথার। বলেছেন, ক্ষমা প্রার্থনা কোনও কথা হতে পারে না। ফেসবুকের নিশ্চয়ই জানতে হবে কিভাবে তারা জানলো না যে তাদের ব্যবহারকারীদের তথ্য অপব্যবহার করা হতে পারে! ভদ্রলোক বেশ ক্ষেপে গিয়েই বলেছেন, মার্ক জাকারবার্গের প্রতিক্রিয়া কোনো ধরণের ঘটনার ব্যাখ্যা ছিল না, বরং এটা ছিল আইনগত এবং রাজনৈতিকভাবে নিজেদের রক্ষা করা। ডেভ লি বলেছেন, ফেসবুক এমন একটা যুদ্ধক্ষেত্রে নামতে যাচ্ছে, যেখানে অনেক প্রতিপক্ষ।

মার্ক জাকারবার্গ তার বক্তব্য শেষ করেছেন আবেগীয় ভঙ্গিতে। “আমি ফেসবুক শুরু করেছি। এবং এখানে যা ঘটবে তার জন্য দিনশেষে আমিই দায়ী। আমাদের ফেসবুক কমিউনিটিকে রক্ষা করতে আমি খুব সিরিয়াস। ক্যামব্রিজ এনালিটিকা যেভাবে তথ্য ব্যবহার করেছে সেটা আর এখন সম্ভব না। যদিও এটা আমাদের আগের ভুলের ক্ষেত্রে কিছু যায় আসে না।” নিজের তৈরী করা ফেসবুকের ব্যবহারকারীদের উপর যথেষ্ঠ আস্থা আছে জাকারবার্গের। এমনভাবেই তিনি ঘোষণা দিয়েছেন যাতে সাধারণ ব্যবহারকারীরা এটা ভালো চোখেই দেখবে। জাকারবার্গ কেবল শূল বাণে বিদ্ধ হচ্ছেন বড় বড় প্রযুক্তিভিত্তিক কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতাদের কাছ থেকে। হোয়াটস এপের কো-ফাউন্ডার ব্রায়ন এক্টন গতকাল টুইটই করে ফেলেছেন, “এখন সময় হয়েছে ফেসবুক ডিলিট করার।”

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-