রক্তাক্ত একাত্তর

জুলিয়াস সিজার, বঙ্গবন্ধু ও একজন কর্নেল তাহের!

ইতিহাসের দৃশ্যপটগুলো খোলস বদলে ফিরে আসে বারেবার। একই গল্পের চরিত্রগুলো থাকে ভিন্ন, সময়কাল থাকে ভিন্ন। কিন্তু গল্পের সারাংশ একই। ঠিক তেমনি খ্রিস্টপূর্ব ৪৪ সালের রোমের একটি ঘটনা একই চরিত্রদের উত্তরসূরিদের কাঁধে ভর করে আবারো ফিরে আসে ১৯৭৫- এর ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে।

পরাক্রমশালী রোমান বীর ও সম্রাট জুলিয়াস সিজার ও রাজনীতির মহাকবি, স্বাধীনতার শিল্পী বঙ্গবন্ধুর জীবনের অনেক মোড় ও চূড়ান্ত পরিণতির মধ্যকার সাদৃশ্য আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, কিভাবে একই গল্পের পুনরাবৃত্তি ঘটে একই দৃশ্যপটের পংক্তি ইতিহাসের কাব্যে ভেসে ওঠে।

জুলিয়াস সিজার তাঁর সৈনিক জীবনে পদার্পণের প্রথম দিক থেকেই একের পর এক যুদ্ধে জয়ী হয়ে নিজের জাত চিনিয়েছিল। এর মধ্যে গালিক যুদ্ধ (Gallic War) ছিল অন্যতম। আর, বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই শুধু নয় বরং কিশোর বয়স থেকেই ছিলেন অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাঁর বজ্রকন্ঠ সজাগ ছিল সংগ্রামী জীবনের প্রথম দিক থেকেই। তিলে তিলে এই ইতিহাসের এই দুই মহানায়ক গড়ে তুলেছিলেন তাঁদের হিমালয়সম, অতিমানবীয় ব্যক্তিত্বকে।

জুলিয়াস সিজার তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তাঁর থেকে জ্যেষ্ঠ আরেক দুই মহারথী সিনেটর ক্রাসাস ও পম্পেইকে নিয়ে গঠন করেন ট্রায়ামভারেট (Triumvirate)। তাঁদের এই রাজনৈতিক জোট সিনেটের নির্বাচনে জয়ী হয় এবং অল্প ক’দিনের জন্য তাঁরা কনসাল হিসেবে একত্রে রোম শাসনও করেন। এই ট্রায়ামভারেটের কথা মনে করিয়ে দেয় কিভাবে বঙ্গবন্ধু তাঁর জ্যেষ্ঠ আরেক দুই প্রতাপশালী রাজনীতিবিদ সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানীকে নিয়ে গঠন করে আওয়ামী মুসলিম লীগ (যা পরে আওয়ামী লীগ হয়)। এবং তাঁদের এই দল যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে জয়ীও হয়।

আমৃত্যু আদর্শিকভাবে বঙ্গবন্ধুর ক্রাসাস হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাঁকে সমর্থন করে গেলেও মুজিব-ভাসানী সম্পর্কে ভাঙ্গন ধরে। মুজিবের পম্পেই অর্থাৎ মওলানা ভাসানী তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ায় যেমনটা ঘটেছিল সিজার আর পম্পেই- এর মাঝে।

সিজারের হন্তারকদের মধ্যে অন্যতম ছিল ব্রুটাস, যে খন্দকার মুশতাক হয়ে ফিরে আসে আবার। দু’জনই ছিল এই দুই মহানায়কের সবথেকে কাছের ও বিশ্বস্ত লোক। দু’জনই বিশ্বাসঘাতকতার নতুন সংজ্ঞায়ন করে নির্মম ইতিহাসের জন্ম দিয়েছিল। পেছন থেকে পিঠে ছুরি বসিয়ে দু’জনই আত্মপ্রকাশ করে কুখ্যাত শঠকার হিসেবে। সিজারের মুখে ছুরি দিয়ে আঘাত করা ক্যাসিয়াস পঁচাত্তরে মেজর বজলুল হুদার কাঁধে ভর করে যে গুলি চালিয়ে ঝাঁঝরা করেছিল বঙ্গবন্ধুর কোমল বুক। আর, কিম্বার-কাসকা নিঃসন্দেহে ফারুক-রশিদের পূর্বসূরি।

দেয়াল - হুমায়ূন আহমেদ, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড, শোক দিবস

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর হন্তারক ও তাদের সঙ্গীরা রাস্তায় উল্লাস করে আর মেজর ডালিম রেডিওতে এসে ভাষণ দিয়ে তাদের ‘বিজয়ের’ কথা দেশবাসীদের জানায়। একইভাবে রোমের রাস্তাঘাট উল্লাসে মাতিয়ে তোলে ‘লিবারেটররা’ আর সবাইকে জানায় যে, এটা নাকি তাদের নতুন বিজয়।

ব্রুটাস-ক্যাসিয়াসদের এই উল্লাস দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তাদের আনন্দে বাধ সাধে সিজারের সবচেয়ে কাছের সহচর মার্ক এন্টোনি ও তাঁর পালকপুত্র ওক্টভিয়ান সিজার অথবা অগাস্টাস। এন্টোনি-অগাস্টাসের সম্মিলিত লিজিয়ন (সৈন্যবাহিনী) সিজার হন্তারকদের পরাজিত করে তখতের দখল নেয়। সিংহাসন ফিরে পায় সিজারের অনুসারীরা। সিজারের আদর্শ ও দর্শন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় রোমান সাম্রাজ্যে।

পঁচাত্তরের মার্ক এন্টোনি এটিএম হায়দার ও পঁচাত্তরের অগাস্টাস খালেদ মোশাররফও একই কায়দায় সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা থেকে হটায় মুশতাক গংদের। মুজিব-ঘাতকরা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।

বিপ্লব ও সংহতি দিবস

কিন্তু, একই আদর্শের অনুসারীদের ক্ষমতা পুনর্দখলের এই আয়োজনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় কর্নেল তাহের। এই চরিত্রটি খ্রিস্টপূর্ব ৪৪ সালে অনুপস্থিত ছিল। আদর্শিক পুনর্জন্ম নেয়া খালেদ-হায়দাররা তাই অবগত ছিল না এই চরিত্রটি সম্পর্কে। তাঁরা চিনতো না কোন কর্নেল তাহেরকে। খ্রিস্টপূর্ব ৪৪ সালের রোমে তাহের নামের চরিত্রটি থাকলে কি তবে মার্ক এন্টোনি-অগাস্টাসের পরিণতিও কি তবে খালেদ-হায়দারের মত হতো?

*

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles