খেলা ও ধুলা

বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা অস্ট্রেলিয়ার রাজ্য দলে জায়গা পাওয়ারও যোগ্য নন!

তামিম ইকবাল, সৌম্য সরকার, ইমরুল কায়েস, সাব্বির রহমান, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম (উইকেটরক্ষক), নাসির হোসেন, মেহেদি হোসেন মিরাজ, তাইজুল ইসলাম, শফিউল ইসলাম, মুস্তাফিজুর রহমান। মুশফিকুর রহিমের নেতৃত্বে বাংলাদেশের এই একাদশটিকে টেস্ট ক্রিকেটের জন্য ‘নিয়ার পারফেক্ট’ একটি একাদশ বলা যায়। দুই-একটি পরিবর্তন হয়ত আনা যেতে পারে, যেমন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের অনুপস্থিতিটা খুব বেশি চোখে পড়ে। তারপরও এই একাদশটি হেলাফেলা করার মত নয়। বরং এই একাদশটিই বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়ের অংশ।

কী সেটি? সেটি হলো, গত বছর মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে এই একাদশটিই যে প্রথমবারের মত পাঁচ দিনের ক্রিকেটে হারিয়ে দিয়েছিল প্রবল পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়াকে। ২৭ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত হওয়ার কথা থাকলেও, টাইগাররা ম্যাচটি নিজেদের করে নিয়েছিল চারদিনেই। জিতেছিল ২০ রানের ব্যবধানে।

সে ম্যাচে টসে জিতে আগে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশ অধিনায়ক মুশফিক। বাকি সব ব্যাটসম্যানেরা ব্যর্থ হয়ে সাজঘরে আসা-যাওয়ার মিছিলে মত্ত থাকলেও, সাকিব-তামিমের ব্যাটিং দৃঢ়তায় ২৬০ রানের ভদ্রস্থ পুঁজি পায় বাংলাদেশ। সাকিব করেন সর্বোচ্চ ৮৪ রান, আর ৭১ রান আসে তামিমের ব্যাট থেকে।

জবাবে ব্যাট করতে নেমে নিজেদের প্রথম ইনিংসে মাত্র সাকিব-মিরাজের ঘূর্ণিতে মাত্র ২১৭ রানেই থেমে যায় অজিরা। সাকিব পাঁচ উইকেট তুলে নেন, পাশাপাশি মিরাজ তার ঝুলিতে পোরেন তিনটি উইকেট। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে ম্যাট রেনশ ৪৫ রান করলেও, অর্ধশতকের দেখা পাননি তার দলের কেউই।

দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশের অবস্থাও তথৈবচ। গত ইনিংসের সর্বোচ্চ রানস্কোরার সাকিব এবার ফিরে যান মাত্র ৫ রানেই। তবে আবারও ত্রাণকর্তার ভুমিকায় অবতীর্ণ তামিম। এবার তিনি করেন অতি মূল্যবাণ ৭৮ রান। দলের প্রয়োজনে এগিয়ে আসেন মুশফিকও। ২২১ রানের দলীয় সংগ্রহে তার অবদান ৪১ রানের।

অস্ট্রেলিয়ার সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৬৫ রান। আগের ইনিংসের ব্যর্থতা ভুলে ঘুরে দাঁড়ান ডেভিড ওয়ার্নার। ১১২ রানের অনবদ্য এক ইনিংস খেলেন তিনি। মাত্র ২৮ রানে দুই উইকেট পড়ে গেলেও, তৃতীয় উইকেটে অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথের সাথে জুটি গড়ে দলের সংগ্রহ নিয়ে যান ১৫৮ পর্যন্ত। এক পর্যায়ে তো মনেই হচ্ছিল, এই ম্যাচ জয় সফরকারীদের জন্য সময়ের ব্যাপার মাত্র।

কিন্তু না। ওয়ার্নারের বিদায়ের পর তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ে অজিদের ইনিংস। আর তা সম্ভব হয় আবারও সেই বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিবের কল্যাণেই। ফের পাঁচ উইকেট তুলে নেন তিনি। শিকার করেন ওয়ার্নার, স্মিথ, খাজার মত শীর্ষস্থানীয় ব্যাটসম্যানদের উইকেট। সঠিক সময়ে জ্বলে ওঠেন তাইজুলও। তিনি উইকেট পান তিনটি, আর মিরাজের ভাগ্যে জোটে দুইটি উইকেট। সেই সুবাদে শেষ মুহূর্তের যাবতীয় স্নায়ুচাপকে জয় করে, ধ্রুপদী এক ম্যাচ নিজেদের করে নেয় বাংলাদেশ।

যথারীতি ব্যাটে-বলে সমান আলো ছড়ানোয় ম্যাচসেরা সাকিব। আর ইতিহাস নতুন করে রচনার কল্যাণে বিশ্বব্যাপী শোনা যেতে থাকে বাংলাদেশের জয়ধ্বনি। তবে এক বছরেরও বেশি সময় পর, ‘লজ্জাজনক’ সেই হারের ব্যাপারে বলতে গিয়ে বাংলাদেশের এই অসাধারণ একাদশটিকেই অপমান করে বসেছেন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার টিম পারফরম্যান্সের প্রধান প্যাট হাওয়ার্ড। তার মতে, ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট অস্ট্রেলিয়া যে দলটির কাছে হার মেনেছিল, সেই দলের অধিকাংশ খেলোয়াড় নাকি অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া প্রতিযোগিতা শেফিল্ড শিল্ডে কোনো একটি রাজ্য দলের হয়ে অংশগ্রহণেরই যোগ্য না!

গিডিয়ন হেইসের সদ্য প্রকাশিত বই ‘ক্রসিং দ্য লাইন’-এ উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য। বাংলাদেশের কাছে হারের পর হাওয়ার্ড নাকি নিজের তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে একটি ইমেইলে লিখেছিলেন, “আমি যুক্তিসঙ্গতভাবে এ ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী যে, যারা আমাদেরকে মাত্রই হারিয়েছে সেই খেলোয়াড়দের মধ্যে বেশিরভাগেরই কোনো একটি রাজ্য দলে জায়গা পাওয়ার মতো যোগ্যতা নেই।”

এছাড়া তিনি আরও বলেছেন,

“বাংলাদেশের কাছে প্রথমবারের মতো একটি টেস্ট ম্যাচ হারের পর আমি এই মুহূর্তে বসে আছি ঢাকার হোটেলের একটি ক্যাফেতে। আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই লজ্জিত, এই হারের দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছি, এবং যেকোনো সমালোচনা খুশি মনে গ্রহণ করতে রাজি আছি। আপনারা যারা এখন ঢাকায় বসে আছেন, আপনারা পুরোপুরি অবগত আছেন যে এই ফলাফলটি ঠিক কতটা বাজে, আর আপনাদের কাছে বস্তুগত সুযোগও আছে আগামী কয়েকদিন বসে এর একটি যথাযথ সমাধান খোঁজার।

“জাতীয় দলের ফলাফলের জন্য সিস্টেমকেই সাধারণত বিচার করা হতে থাকে। আপনারা যেমনটি নিজেরাই কল্পনা করতে পারছেন যে আমাদেরকে বিভিন্ন ধরণের প্রশ্নে জর্জরিত করা হচ্ছে, এবং আমার মনে হয় সেগুলো ঠিকই আছে।”

হাওয়ার্ড যেভাবে দলের শোচনীয় হারের দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নেন এবং সিস্টেমের পুনর্বিবেচনায় যেকোনো সমালোচনাকে সাদরে আমন্ত্রণ জানায়, এ থেকে তার ‘স্পোর্টিং’ মনোভাবই প্রকাশ পায়। কিন্তু তিনি ঠিক কী কী ভালো কথা বলেছেন, সে সবই ম্লান হয়ে যায়, যখন তিনি সরাসরি একটি জাতীয় দলের টেস্ট স্কোয়াডের খেলোয়াড়দের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, এবং তাদেরকে সরাসরি ‘রাজ্য দলে জায়গা পাওয়ার যোগ্য না’ বিশেষণে বিশেষায়িত করেন।

হাওয়ার্ডের এই উদ্ধৃতি নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে গোটা বিশ্বজুড়ে। বাংলাদেশ যখন ছোট দল ছিল, সদ্যই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রেখেছিল, তখন তাদের ক্রিকেটীয় শক্তি নিয়ে হাসি-তামাশা কম হয়নি। এবং সকল অপমান অবহেলা তারা মুখ বুজেই সহ্য করেছে। কিন্তু এখন যখন তারা ক্রমশই একটি ক্রিকেটীয় পরাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে, এবং অবলীলায় টেস্ট ক্রিকেটে হারিয়ে দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড-শ্রীলংকার মতো দলকেও, তখন সেই দলটির খেলোয়াড়দের নিয়ে সিএ কর্মকর্তার এমন দাম্ভিক বক্তব্য কি খুব বেশি অপমানজনক নয়?

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close