এরকম একটা ধ্বংসস্তুপ থেকে যে জীবিত বের হতে পেরেছি সেটাই অবিশ্বাস্য লাগছে!

১৩ তারিখ রাত ১১:৪৫ মিনিট, দেশ ট্রাভেলসের হুন্দাই লিমুজিনে চড়েছি। আমাদের ঢাকা-রাজশাহী রুটে এটাই সবচেয়ে নিরাপদ এবং আরামদায়ক গাড়ি। অথচ সে গাড়িতেই দুর্ভাগ্যবশত দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হারিয়ে গেল দুটি প্রাণ! প্রত্যেক যাত্রীই কোন না কোন ভাবে আহত হয়েছে। কারো ভেঙেছে হাত, কারো পা, কারো কেটে গেছে, থেঁতলে গেছে, নাহয় প্রচন্ড ব্যাথা পেয়েছে হাতে-পায়ে, পিঠে শরীরে। সিটবেল্ট বেঁধে থাকার কারনে বেঁচে গিয়েছি আমি!

ঘুমিয়ে ছিলাম, রাত ২টার দিকে ঘুম ভেঙে গেল। মোবাইলের লক খুলছিলাম একজনকে কল দেওয়ার জন্য। ঠিক সে সময়ই চোখের সামনে ঘটে গেল আমার দেখা ভয়াবহ অ্যাক্সিডেন্টগুলোর একটা।

আমাদের বাসটা চালকের অদক্ষতার কারনে শুরু থেকেই অস্বস্তি নিয়ে চলছিল। এলোমেলো ওভারটেকিং, খারাপ রাস্তায় জোরে চলা, সাথে যত্রতত্র হর্ণ বাজানো তো আছেই। এরমধ্যে বনপাড়া হাইওয়ে টোলপ্লাজা পার হওয়ার পর বাস আরো জোরে চলা শুরু হলো। দূর থেকে বামদিকে একটা ট্রাক দেখে বাসটা ওভারটেক করার সিদ্ধান্ত নিলো। ডানে মাথা ঘোরাতেই ড্রাইভার দেখে অপজিট থেকে আরেকটা বাস আসছে। এবার বামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই চোখে পড়ে সামনের ট্রাকটা সচল না, থেমে আছে। ততক্ষণে আর বাস থামানোর বা ঘোরানোর কোন উপায় নেই!

ড্রাইভারের সামনে তখন তিনটি রাস্তা খোলা,
১। অপজিট থেকে আসা বাসের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ,
২। চলনবিলে বাস নিয়ে তলিয়ে যাওয়া,
৩। যতটুকু সম্ভব ব্রেক করে ট্রাকের পেছনে ধাক্কা মারা।

ড্রাইভার তিন নম্বর পথটাই বেছে নিলেন! বাম দিকে কোণা করে বাস যেয়ে ধাক্কা মারলো ট্রাকের পেছনে। এরপর…

সামনে দরজার কাছে থাকা ১৩-১৪ বছরের হেল্পার আর ২২-২৩ বছর বয়সী সুপারভাইজার জাস্ট চ্যাপ্টা হয়ে গেছে! হেল্পারের ছোট দেহটা আটকে ছিল রডের সাথে, সুপারভাইজার তখন পানি থেকে ডাঙায় তোলা মাছের মতো খাবি খাচ্ছিলো। অন্যদের বিভৎস বর্ণনা আর দিতে পারছি না!

আমার এখন সারা শরীরে প্রচন্ড ব্যাথা, বিশেষ করে ডান পা, হাত, মাথার বামপাশ আর পিঠ। নিচের ঠোঁট থেঁতলে কিমার মতো হয়ে গেছে। ওষুধ আর ইঞ্জেকশনের উপরে আছি। একটু সুস্থ্য হলেই আবার ফিরছি, তারপর বান্দরবান, পাহাড়, নদী, জঙ্গল। আমার সেই চেনা পাহাড়ী গ্রাম! তবে সব কিছুই অন্যরকম হতে পারতো, এর চেয়ে খারাপ হয়ে হতে পারতো বাসের হেল্পার ও সুপারভাইজারের মতো। আবার এমনও হতে পারতো, আমার বাকী জীবন কাটাতে হচ্ছে হুইল চেয়ারে।

এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী অসতর্ক চালক, যে বেপরোয়াভাবে বাস চালাচ্ছিলো। এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী টহল পুলিশ, যারা নিজেরা স্বীকার করেছে যে দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগেই তারা অন্ধকারে ইন্ডিকেটর অফ করে মৃত্যুদূত হয়ে বসে থাকা ট্রাকটিকে দেখেছিল কিন্তু সরায়নি।
এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী হাইওয়ে পুলিশ, যাদের মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ছিল।

আমি বেঁচে গেছি সত্যি। কিন্তু প্রতিটি প্রাণই যে মূল্যবান, হোক সে পেটের দায়ে কিশোর বয়সে খেলা ছেড়ে বাসের হেল্পার হওয়া ছেলেটির প্রাণ কিংবা যাত্রীর বেশে কোন সাধারণ জনগণের প্রাণ। আমি এর বিচার চাইছি না, কারন যে রাষ্ট্র যে সমাজ মানুষের প্রাণের মূল্য দিতে জানে না তার কাছে বিচার চাওয়াটাই অর্থহীন।

দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফিরে লিখেছেন- মাগুর রুবায়েত।

Comments
Spread the love