১…

ছেলেটার বয়স ১৭ কি ১৮, ইন্টারমিডিয়েটে পড়ে। প্রায়ই আমার চেম্বারে আসতো। কখনো বুকে ব্যথা, কখনো বা পেটে সমস্যা, কখনো বা অনিদ্রা। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কখনো খারাপ কিছু পাইনি। আমার ধারণা ছিলো সমস্যাগুলো মানসিক, ডায়াগনোসিস লিখে রেখেছিলাম Somatoform disorder….

যে বয়সে ছেলেমেয়েরা থাকে উচ্ছ্বল-প্রাণবন্ত, সে বয়সে একটা ছেলে নানা মানসিক সমস্যা নিয়ে ঘুরে বেড়াবে -সেটা আমার জন্য পীড়াদায়ক। কাজেই একদিন অনেক সময় নিয়ে তার এই রোগ সম্পর্কে তাকে বুঝিয়েছিলাম, মেডিকেলীয় ভাষায় যাকে আমরা কাউন্সেলিং বলি আর কি….

তেমন লাভ হয় নি। অবশ্য Somatoform disorder এর রোগীগুলো অনেকটা এমনই, কাউন্সেলিং এর ধার এরা ধারে না। ছেলেটা ফাইল হাতে নিয়ে ছুটে বেড়াতো কখনো স্কয়ার, কখনো ইউনাইটেড বা কখনো আমার চেম্বারে ঘুরে ঘুরে….

ছেলেটার পারিবারিক কাঠামো আমার জানা ছিলো। ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তান, বাবার সাথে পরবর্তীতে বিয়ে করা নতুন মা’কে নিয়ে থাকে, নিজের মায়েরও অন্যত্র বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো।আমার সাথে ছেলেটার সম্পর্ক তখন অনেকটাই খোলামেলা। একবার চিকিৎসা লিখতে লিখতে জিজ্ঞেস করেছিলাম: “মায়ের কাছে যান না? মাকে দেখতে ইচ্ছে করে না?”

মারুফ প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে টলোমলো চোখে বলেছিলো: “মাকে দেখতে ইচ্ছে করে স্যার। কিন্তু দেখতে যাই না। মায়ের সংসারে ঝামেলা হয়, বাবাও রাগ করেন….”

কথাটা শুনে আমার দম বন্ধ হয়ে এসেছিলো। মাত্র ১৭/১৮ বছর বয়স, আমার বয়সের অর্ধেক বলা যায়, অথচ ছেলেটা তার বুকের গহীনে বাবা-মাকে একসাথে না পাবার কি এক সমুদ্রসম বেদনা নিয়েই না দিনগুলো কাটায়!

মারুফ ছেলেটার সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিলো আমার ডিউটি থাকাকালীন আমারই হেল্থ কমপ্লেক্সের ইমার্জেন্সি রুমে। Suicidal attempt নিয়েছিলো ইঁদুরের বিষ খেয়ে, হয়তো এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা সে আর সহ্য করতে চায়নি….

২….

আমি তখন Synesis IT তে পার্ট টাইম জব করি। কাজ তেমন কিছুই না, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যায় মোবাইলে কল আসলে দিকনির্দেশকমূলক কিছু কথাবার্তা বলা। মাঝের বাকী সময়টা কাটে ডেস্কটপে সেভ করে রাখা মুভিগুলো দেখে….

এক এক শিফটে আমরা ৩-৫ জন ডাক্তার থাকতাম। আমার শিফট টাতে প্রায়ই এক আপু আমার সাথে ডিউটিতে আসতেন। আপুটাকে আমি একটু ভয়ই পেতাম, চোখের দৃষ্টি আমার কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হতো না। আপু মাঝে মাঝে একা একা কথা বলতেন, কখনো চিৎকার দিয়ে উঠতেন, কখনো বা টেবিলে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠতেন….

একবার বিরক্ত হয়ে এক সিনিয়র ভাইকে জিজ্ঞেস করলামঃ ” ভাই, আপুর সমস্যা কি বলেন তো? এরকম করে কেনো মাঝে মাঝে?”

ভাই বলেছিলেনঃ” বাদ দাও, ব্রোকেন ফ্যামিলির মেয়ে, একটু এমন করবেই, ইগনোর করো…”

আপু ব্রোকেন ফ্যামিলির মেয়ে, একথা শোনার পর উনার এরকম আচরণে আমি আর ভয় পেতাম না, বিরক্তও হতাম না। বরং আমার মাঝে সেসময়টায় তখন এক দুঃখবোধ কাজ করতো। মনে মনে ভাবতাম, বাবা মায়ের আদর পেলে উনিও অন্য সব মেয়ের মত রাজকন্যা হয়েই থাকতেন, স্বাভাবিক আচরণ করতেন…..

৩….

গাজীপুরের এক রিসোর্টে গিয়েছি। শীতের শেষ। চিকিৎসকদের বার্ষিক বনভোজন টাইপ ব্যাপার। ঘোরাঘুরি করে ক্লান্ত হয়ে কাছের এক বেঞ্চিতে বসলাম..

একটু দূরেই ছোট ছোট বাচ্চারা খেলছে। আমি বেশ আগ্রহ নিয়ে বাচ্চাদের খেলা দেখা শুরু করলাম। মনযোগ ব্যাহত হলো। একটা ৫-৬ বছরের বাচ্চা ছেলেকে দেখলাম অন্য সব বাচ্চা থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তার সমবয়সীদের হৈ-হুল্লোড় তাকে খুব একটা আকর্ষণ করছে বলে মনে হলো না….

বাচ্চা ছেলেটিকে দেখলাম একদৃষ্টিতে একটা বাচ্চা মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ বলা নেই, কওয়া নেই সে বাচ্চা মেয়েটির কাছে গিয়ে দুহাত দিয়ে তার গলা টিপে ধরলো। আমি উঠে গিয়ে ছাড়াতে যাবার আগেই দু’পক্ষের অভিভাবকরা চলে এলেন।

বাচ্চা ছেলেটির এমন আচরণে আমি তখন কিছুটা হতভম্ব। বিষয়টা কি বোঝার চেষ্টা করলাম, বাচ্চাটার ব্যাপারে খোঁজ খবর নিলাম। ইন্টারেস্টিং কিছু তথ্য পেলাম…

অদ্ভুত আচরণ করা ছেলেটি ব্রোকেন ফ্যামিলির, থাকে নাকি তার চিকিৎসক মায়ের সাথে। আরো ভয়ংকর তথ্য যেটা পেলাম সেটা হলো- বাচ্চাটির মা যখন লেখাপড়া করে, তখন দরজায় খিল লাগিয়ে লেখাপড়া করে যাতে তার ছেলে তার রুমে ঢুকতে না পারে, বাচ্চা ছেলেটি মা’কে ডেকে ডেকে হয়রান হয়ে কান্নাকাটি করে দরজার ওপারেই নাকি ঘুমিয়ে পড়ে….

মা থেকেও নেই, বাবা তো আরো আগেই উধাও হয়েছে। ছেলেটির শৈশব কতটা ভয়ঙ্কর-সেটা কি চিন্তা করতে পারছেন?

কখনো কি ভয়ঙ্কর ক্রিমিনালদের জীবনী পড়েছেন? আমি পড়েছি। সেই পড়া থেকে আপনাদের একটা তথ্য দেই। অনেক ক্ষেত্রেই ভয়ঙ্কর ক্রিমিনালগুলো ব্রোকেন ফ্যামিলির প্রোডাক্ট। ৪ ঠা নভেম্বর, ২০১০ সালের The Telegraph পত্রিকার একটা নিউজ আপনাদের জানাই: “Children from broken homes ‘nine times more likely to commit crimes”….

আপনারা কি ঐ বাচ্চা ছেলেটির আচার-আচরণের অস্বাভাবিকতার কারণটি বুঝতে পারছেন?

৪….

মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আগের সময়টাই ভালো ছিলো, যে সময়টা ছিলো সরলতার, যে সময়টায় জীবনটাকে এত জটিলভাবে দেখতে হতো না। সে সময়টায় ব্রোকেন ফ্যামিলি নামে কোন কনসেপ্ট ছিলো না, সে সময়টায় বাবা-বা, চাচা-চাচী, দাদা-দাদীরা একত্রে বসবাস করতো। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোর আদরের কোন কমতি হতো না। মায়ের মার খেয়ে এরা চাচীর কাছে যেতো, বাবার বকুনি খেলে এরা দাদীর কোলে গিয়ে গুটুশুটি মেরে বসে থাকতো।

আমি নিশ্চিত ঐ সরল সময়টা কখনো অভিমানী মারুফের জন্ম দিতো না, ঐ মায়াবী সময়টায় জন্ম নিলে আপুটিকে মাঝে মাঝে টেবিলে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠতে হতো না, ঐ স্বপ্নময় সময়টাতে হিংস্র আচরণ নিয়ে কোন বাচ্চা বেড়ে উঠতো বলে আমার মনে হয় না…..

৫….

একটা বিষয় প্রায়ই আমার মাথায় ঘুরপাক খায়। বিষয়টা আপনাদের বলেই ফেলি। হতাশার আগুনে পুড়ে বিহ্বল হয়ে যে দুজন মানুষ একই পথে হাটার ইতি টেনে নতুন মানুষের সাথে নতুন পথে হাঁটেন–তারা কি সেই নতুন সম্পর্কে আসলেই আনন্দিত থাকেন? যে স্বপ্নের হাতছানিতে পুরোনো সম্পর্ককে মাড়িয়ে নতুন সম্পর্কে জড়ানো হয়, সেই মায়বী স্বপ্ন কি কখনো সত্য হয়ে ধরা দেয়?

আপনারা এর উত্তর কি দেবেন, সেটা জানি না। তবে নিজে কি দেখেছি, সেটা বলতে পারি। পুরোনো সম্পর্ককে ঝেরে ফেলে যারা নতুন সম্পর্কে সুখের মায়জাল বুনতে চান–তারা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই সেই সুখস্বপ্নকে স্পর্শ করতে পারেন নাই। ফেসবুকের ঝলকময় দুনিয়া আপনারা দেখেন, রাতের গভীরে তাদের আর্তনাদ কিন্তু আমরা দেখতে পাই না।

তবে কেন এই ছুটোছুটি? কেন এই ভাঙ্গাগড়ার খেলা? কেন ভবিষ্যত প্রজন্মের এই ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে এত কষ্ট দেয়া?

৬….

কারো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে ইনফ্লুয়েন্স করা আমার এই লেখার উদ্দেশ্য না, ভাবনাগুলো আমার একান্তই নিজের। প্রতিটি মানুষ আলাদা, কাজেই তাদের চিন্তাজগত ভিন্নভাবে আবর্তিত হবে-এটাই স্বাভাবিক। আমার সেই চিন্তাজগত যদি কারো মনে কষ্ট দিয়ে থাকে তবে আমার লেখার শেষ প্রান্তে আমি ক্ষমা চেয়ে নিলাম….

তবে আমার কেন যেন খুব ভয় হয়। আমার কেন যেন মনে হয়–যে নির্দয়তা, নিষ্ঠুরতা ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তানদের সাথে করা হয়, এর প্রত্যুত্তর এরা খুব ভয়ঙ্কর ভাবেই আমাকে বা আপনাকে দিবে। সেদিনটি কারো জন্যই খুব একটা সুখকর হবে বলে মনে হয় না…..

Comments
Spread the love