অবিশ্বাস্য! অসম্ভব! অদ্ভুত! শব্দগুলো গল্পেই পাবেন। ফুটবল মাঠে এ শব্দগুলো অতি ব্যবহারে ক্লিশে হয়ে গেছে। হবেই বা না কেন! এখনকার লিস্টার সিটি, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ কে দেখলে কোনো কিছুকেই অবিশ্বাস্য, অসম্ভব, অদ্ভূত মনে হবে না। কিন্তু আপনি এখন এমনি এক গল্প পড়তে চলেছেন যা আপনাকে বিশ্বাস করাতে বাধ্য করবে যে ফুটবলেও অবিশ্বাস্য, অসম্ভব আর অদ্ভূত শব্দগুলোর অস্তিত্ব রয়েছে।

ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ার কাউন্টির মিডলসব্রো শহরের গ্রোভ হিলের ১১ নম্বর ভ্যালি রোডে পাশেই একটি বাড়ি। বাড়িটিতে যিনি থাকেন তিনি সেখানকারই একটি মিষ্টির দোকানের কর্মচারী। প্রতিদিন সকালে দোকানে যাওয়া আর সন্ধ্যায় কাজ শেষে বাড়ি ফেরা, লোকটির কাজ ছিল এই। ওহহো, আরেকটি কাজ ছিল, সেটি হল বছর বছর একটি করে সন্তান জন্ম দেয়া! ছোট পরিবারই সুখী পরিবার এই মন্ত্র কানে না নিয়ে তিনি বড় পরিবারই সুখী পরিবার এই তত্ত্বে উজ্জীবিত হয়েছিলেন।

১৯৩৫ সালের ২১ মার্চ, পরিবার অপরিকল্পনার অংশ হিসেবে লোকটির ঘরে জন্ম নিল তার ৬ষ্ঠ সন্তান, একটি ছেলে (পরে আরো তিনটি সন্তান হয়েছিল তার, মোট সন্তান ছিল ৯ জন)। নাম রাখা হল ব্রায়ান হাওয়ার্ড ক্লফ।

একটু বড় হতে দেখা গেল ছেলেটির খেলাধুলার প্রতি কোনো অনীহা নেই, কিন্তু পড়াশোনায়ও তাঁর কোনো আগ্রহ নেই। ১১ বছর বয়সে ব্রায়ান ইলেভেন প্লাস এক্সামে ফেল করল। এরপর তিনি ভর্তি হলেন মার্টন গ্রোভ সেকেন্ডারি মডার্ন স্কুলে। ১৯৫০ সালে স্কুল ত্যাগ করলেন ব্রায়ান, কোনো কোয়ালিফিকেশন ছাড়াই! এরপর কাজে যোগদান করলেন আরএএফ রেজিমেন্টে। সেখানে ব্রায়ান কাজ করেন ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত।

ফুটবল টা ভালোই খেলতেন। নিজের শহরের ক্লাব মিডলব্রোর হয়ে খেলা শুরু করেন। তাঁদের হয়ে ২২২ লীগ ম্যাচে করেন ২০৪ গোল। টানা ৪ মৌসুমে তিনি ৪০ গোল বা তার বেশি গোল করেছিলেন! তখনকার যুগে যা ছিল রীতিমতো অবিশ্বাস্য। ব্রায়ান মিডলব্রোর ডিফেন্স নিয়ে খুবই বিরক্ত ছিলেন। কারণ তিনি এবং বাকি স্ট্রাইকাররা যতোই গোল করতেন ব্রোর ডিফেন্স কিভাবে কিভাবে যেন এর থেকে বেশি গোল খেয়ে বসতো। এক ম্যাচে মিডলসব্রো ৬-৬ গোলে ড্র করল চার্লটন অ্যাথলেটিকের বিপক্ষে। ব্রায়ান রেগে গিয়ে তাঁর সতীর্থদের জিজ্ঞেস করলেন- ‘‘ম্যাচ জিততে আমাকে ঠিক কয়টা গোল করতে হবে’’?

১৯৬১ সালের জুলাইয়ে ক্লফ মিডলব্রোকে অনুরোধ করলেন তাঁকে ছেড়ে দিতে। মিডলসব্রো তা মেনে নিল এবং তাঁদেরই স্থানীয় প্রতিদ্বন্দী সান্ডারল্যান্ডের কাছে ক্লফকে ৫৫ হাজার পাউন্ডের বিনিময়ে বিক্রি করে দিল। সান্ডারল্যান্ডের হয়ে ব্রায়ান ক্লফ ৭৪ লিগ ম্যাচে করেন ৬৩ গোল। ১৯৬২-১৯৬৩ মৌসুমের ডিসেম্বর হতে হতেই ব্রায়ান লিগে ২৪ গোল করে ফেলেন, সান্ডারল্যান্ড তখন দ্বিতীয় বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হওয়ার চেষ্টা করছিল।

২৬ ডিসেম্বর ১৯৬২, ক্লফের খেলোয়াড়ি জীবনের সবচেয়ে কালো দিন। রোকার পার্কে বারির বিপক্ষে সেদিন ম্যাচ ছিল সান্ডারল্যান্ডের। আবহাওয়া ছিল খেলার অনুপযুক্ত। তাও খেলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিলেন রেফারি। প্রচন্ড ঠান্ডা এবং বৃষ্টিপাত ছিল তখন। বল নিয়ে এগোতে থাকা ক্লফ বারির ডি-বক্সে ঢুকে গেলেন, তাঁকে বাঁধা দিতে এগিয়ে এলেন বারির গোলরক্ষক ক্রিস হারকার। ফলে যা হওয়ার হলো, অনিবার্য সংঘাত। ক্লফের হাঁটুর ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেল। এ ধরণের ইঞ্জুরি সাধারণত রিকভারি করার মতো না। কিন্তু দুই বছর পর ক্লফ মাঠে ফিরলেন, কিন্তু হায়! মাত্র তিন ম্যাচ খেলার পরেই হাঁটুর চোট এতটাই প্রকট আকার ধারণ করল যে এবার তাঁকে বাধ্য হয়েই অবসর নিতে হল। ইংলিশ লিগের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোল রেশিও ০.৯১৬ সহ ২৬৮ গোল করা ক্লফ অকাল অবসর নিলেন। তখন ক্লফের বয়স মাত্রই ২৯! যে বয়সে একজন খেলোয়াড় নিজের সেরা ফর্মে থাকেন, সেই বয়সেই কিনা অবসর নিয়ে নিতে হল ব্রায়ান ক্লফকে! ফুটবল কখনো কখনো খুব নিষ্ঠুর।

ক্লফ ফুটবল ছাড়লেও ফুটবল ছাড়তে পারেনি ক্লফকে। তাই তো পরের বছরই ফিরে এলেন কোচ হিসেবে। ক্লফ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, খেলোয়াড়ি জীবনের সব আক্ষেপ তিনি ঘুচাবেন ম্যানেজার হিসেবে। ব্রায়ান ক্লফ ইংলিশ ফুটবলের চতুর্থ স্তরের দল হার্টলিপুল ইউনাইটেডের দায়িত্ব নিলেন। ক্লফের বয়স তখন মাত্র ৩০! তিনিই ছিলেন তখনকার ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে সবথেকে কমবয়সী কোচ।

হার্টলিপুল হাপিত্যশ করছিল ইংলিশ ফুটবলের উপরের স্তরে উঠার জন্য। আগের ছয় মৌসুমের পাঁচটিতেই তাঁরা চতুর্থ স্তরে শেষ দুই দলের একটি হিসেবে শেষ করেছিল। ক্লাবের আর্থিক অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। ক্লফ স্থানীয় পাব-বারগুলোতে টাকা সংগ্রহের আশায় ঘুরে বেড়াতেন, ড্রাইভারের বেতনের টাকা বাঁচানোর জন্য ব্রায়ান বাসের ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবার আবেদন করেছিলেন যাতে অ্যাওয়ে ম্যাচগুলোতে তিনি নিজে দলীয় বাস চালিয়ে নিয়ে যেতে পারেন! এবার আপনিই বলুন, ক্লফ আসলে দলের কোচ ছিলেন নাকি ছিলেন সর্বেসর্বা?

বিস্ময়ে চোয়াল ঝুলে পড়বে যখন জানবেন এই মানুষটিকেই ১৫ নভেম্বর, ১৯৬৬ সালে বরখাস্ত করেছিলেন ক্লাবের চেয়ারম্যান আর্নেস্ট অর্ড! ম্যানেজারদের সাথে মাইন্ড গেম খেলায় অর্ড বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। হার্টলিপুল সেই মৌসুমে ক্লাবের ইতিহাসের সেরা অবস্থান ৮ম স্থানে থেকে লিগ শেষ করেছিল, পরের মৌসুমেই তাঁরা ক্লাব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো উপরের স্তরে প্রমোশন লাভ করে। নিশ্চয়ই আপনার মনে হচ্ছে, অর্ডকে এখন সামনে পেলে তার দু গালে কষিয়ে দু’টো থাপ্পড় বসাতেন।

হার্টলিপুল থেকে বরখাস্ত হলেও ১৯৬৭ সালের মে মাসেই ক্লফ ডার্বি কাউন্টির দায়িত্ব পান। ব্রায়ান আসার আগের পুরো এক দশক ডার্বি কাউন্টি ইংলিশ ফুটবলের ২য় স্তরে পড়ে খাবি খাচ্ছিল। ক্লাবের একমাত্র বড় শিরোপা বলতে ছিল ১৯৪৬ সালে জেতা এফএ কাপ। ডার্বির ম্যানেজার হিসেবে ক্লফের প্রথম মৌসুমে ডার্বি আগের মৌসুমের থেকে একধাপ নিচে অবস্থান করে মৌসুম শেষ করল।

কিন্তু ক্লফ নিজের পরিকল্পনায় ছিলেন অটুট। তিনি সেই মৌসুমে কয়েকজন নতুন খেলোয়াড় দলে এনেছিলেন। যাদের মধ্যে ছিলেন রয় ম্যাকফারল্যান্ড, জন ও’হেয়ার, জন ম্যাকগভার্ন, অ্যালান হিনটন এবং লেস গ্রিন। নতুন মৌসুমে শুরুতে ডার্বির ১১ জন খেলোয়াড় দল ছেড়ে গেলেন, আগের দলের মাত্র ৪ জন থেকে গেলেন নতুন মৌসুমে। সেই চারজন ছিলেন কেভিন হেক্টর, অ্যালান ডারবান, রন ওয়েবস্টার এবং কলিন বোল্টন। ক্লফ ক্লাবের সেক্রেটারি, গ্রাউন্ডসম্যান, চিফ স্কাউট এবং দুজন চা পরিবেশিকাকে বরখাস্ত করলেন যাদেরকে তিনি হাতেনাতে ধরেছিলেন ডার্বির ম্যাচ হারের পরেও নাচতে থাকা অবস্থায়। এরপর ক্লফ ডেভ ম্যাককে এবং উইলি কারলিনকেও সাইন করালেন। ক্লফের ডার্বি ওই মৌসুমে ২য় বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ১ম বিভাগে উঠে গেল। সেই মৌসুমে ক্লাব রেকর্ড টানা ২২ ম্যাচ অপরাজিত ছিল ডার্বি।

ব্রায়ান বিশ্বব্যাপী পরিচিত ছিলেন একজন কঠোর কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক কোচ হিসেবে। তিনি সবসময় নিজের খেলোয়াড়দের কাছ থেকে সুন্দর ফুটবল দেখতে চাইতেন এবং প্রেসের করা কোনো স্টুপিড প্রশ্নের উত্তরও দিতেন নিজস্ব স্টাইলে। ক্লফ বিখ্যাত ছিলেন মি.ক্লফ নামে, তাঁর দল ডার্বিও বিখ্যাত ছিল পিছিয়ে পড়া ম্যাচও নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসতে। ১ম বিভাগে ফেরার পর ১ম মৌসুমে ডার্বি ৪র্থ হয়ে শেষ করল। যা ছিল গত ২০ বছরের মধ্যে ডার্বির সেরা লিগ অবস্থান। আর্থিক অনিয়মের দায়ে ডার্বি পরের মৌসুমে ইউরোপিয়ান টুর্নামেন্ট খেলা থেকে বঞ্চিত হয় এবং উল্টো তাঁদেরকে ১০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করা হয়।

১৯৭০-১৯৭১ মৌসুমে ডার্বি ১ম বিভাগে ৯ম হয়। ১৯৭১ এর ফেব্রুয়ারিতে ক্লফ নিজের দল শক্তিশালী করা জন্য ব্রিটিশ রেকর্ড ১ লাখ ৭৫ হাজার পাউন্ডের বিনিময়ে দলে নিয়ে আসেন কলিন টডকে। মজার ব্যাপার হল টডকে যেদিন ডার্বি কিনেছিল সেদিন সকালেই ক্লফ টডকে কেনার গুজব উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

১৯৭১-১৯৭২ মৌসুমে ডার্বি শিরোপার ত্রিমুখী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। তাঁদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল লিভারপুল, লিডস ইউনাইটেড। নিজেদের শেষ ম্যাচে ১-০ গোলে জিতে ডার্বি লিগের শীর্ষে চলে যায়। লিভারপুল এবং লিডস দুদলেরই সুযোগ ছিল ডার্বিকে টপকে যাবার। কিন্তু নিজেদের শেষ ম্যাচে লিডস উলভসের বিপক্ষে এবং লিভারপুল আর্সেনালের বিপক্ষে ড্র করায় চ্যাম্পিয়ন হয় ডার্বি। এটিই ছিল ডার্বির ৮৮ বছরের ইতিহাসের প্রথম লিগ শিরোপা।

১৯৭২ সালের আগস্টে ডার্বির প্রি-সিজন ট্যুর ঠিক হয় নেদারল্যান্ডস এবং পশ্চিম জার্মানিতে। কিন্তু ট্যুরে যেতে বেঁকে বসেন ক্লফ। তিনি স্পষ্ট বলে দেন পুরো পরিবারসহ না গেলে তিনি যাবেন না। ডার্বির চেয়ারম্যান স্যাম লংসন ক্ষেপে উঠেন এবং ক্লফকে বলেন তিনি কাজে যাচ্ছেন, কোনো ছুটি কাটাতে নয়। এর ফলে ক্লফ দলের সহকারি ম্যানেজার পিটার টেইলরকে দলের সাথে সেই ট্যুরে পাঠান।

১৯৭২ সালের ২৪ আগস্ট ক্লফ লিস্টার সিটির ডেভিড ন্যাশকে ব্রিটিশ রেকর্ড ২ লাখ ২৫ হাজার পাউন্ডের বিনিময়ে সাইন করান। কিন্তু ক্লফ ন্যাশকে কেনার ব্যাপারে ডার্বি বোর্ডের সাথে আলোচনা করেননি। ফলে ডার্বির পরিচালক জ্যাক কির্কল্যান্ড ক্লফকে সাবধান করে দেন যেন তিনি এত টাকার বিনিময়ে আর কোনো খেলোয়াড় না কিনেন।

৩ সেপ্টেম্বর ডার্বির ম্যাচ শেষের ইন্টারভিউতে ব্রায়ান হঠাৎই ডার্বির সমর্থকদের কথার আক্রমণ করে বসেন। তিনি বলেন, সমর্থকরা মারাত্মক রকমের অকৃতজ্ঞ। ডার্বি যখন কোনো ম্যাচ জিতে তখনই কেবল তাদের চিৎকার করে কিন্তু ক্লফ চান তারা যেন ডার্বির হারের সময়ও দলের পাশে থাকে। কিন্তু সমর্থকরা সেটি কখনোই করত না। একই ইন্টারভিউতে ক্লাবের পলিসি নিয়ে সমালোচনা করেন ক্লফ। পরের দিন বোর্ড পরিচালক স্যাম লংসন সমর্থকদের কাছে ক্লফের বক্তব্যের জন্য ক্লাবের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চান।

সেই মৌসুমে ডার্বি লিগ শিরোপা ধরে রাখতে ব্যর্থ তো হয়ই, তাঁরা নেমে যায় ৭ম স্থানে। কিন্তু ইউরোপিয়ান কাপে খর্বশক্তির দল নিয়েও পৌঁছে যায় সেমিফাইনালে। সেমিতে জুভেন্টাসের কাছে ৩-১ এগ্রিগেটে হেরে বিদায় নেয় ডার্বি। ম্যাচের পর ড্রেসিং রুম থেকে ক্লফ ইতালিয়ান সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন – “No cheating bastards do I talk to. I will not talk to any cheating bastards.” এরপর ২য় বিশ্বযুদ্ধে ইতালির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বসেন ব্রায়ান।

তাঁর এধরণের মন্তব্য ভালোভাবে নেয়নি ডার্বি বোর্ড। ৫ আগস্ট, ১৯৭৩, ক্লফ সানডে এক্সপ্রেসের এক আর্টিকেলে লিডস ইউনাইটেরডের কোচের সমালোচনা করেন। পরের দিন ক্লফকে খেলা ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য জরিমানা করা হয়। ১৯৭৩ এর সেপ্টেম্বরে ক্লফ ডার্বি বোর্ডকে কিছু না জানিয়ে ওয়েস্ট হ্যাম যান এবং ববি মুরের জন্য ৪ লাখ পাউন্ড বিড করেন। ওয়েস্ট হ্যাম তাঁর প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে। ডার্বির বোর্ড ক্লফের যাওয়া কিংবা বিড করা সম্পর্কে কিছুই জানত না। ১৯৭৩ সালের ১১ অক্টোবর লংসন ক্লফকে বোর্ড মিটিংয়ে ডেকে নেন, তিনি চাইছিলেন ক্লফকে বরখাস্ত করতে। কিন্তু লংসন বাকি সদস্যদের কাছ থেকে সমর্থন না পাওয়ায় আটকে যায় ক্লফের বরখাস্ত হওয়া।

দুই দিন পর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ১-০ গোলে হারানোর পর জ্যাক কির্কল্যান্ড সহকারি কোচ টেইলরকে ডেকে জিগেস করেন দলে টেইলরের রোল টা কি? সেদিনই কির্কল্যান্ড স্যার ম্যাট বাসবির দিকে V চিহ্ন দেখানোয় ক্লফকে ক্ষমা চাইতে বলেন। ক্লফ স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করেন। কির্কল্যান্ড ক্লফকে এই শর্তও দেন যে ক্লফ কোনো পত্রিকায় লিখতে পারবেন না, কোনো টিভি শোতে যেতে পারবেন না।

বোর্ড সদস্যদের সাথে অজস্র ঝামেলা আর তাঁর নিজের মন উঠে যাওয়ায় ক্লফ ডার্বির ম্যানেজারের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। মৌসুমের বাকি তখন মাত্র ৪ সপ্তাহ। ডার্বি ওই মৌসুমে লিগ চ্যাম্পিয়ন হলেও ক্লফের প্রস্থানের পর নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। ১৯৮০ সালে ২য় এবং ১৯৮৪ সালে ৩য় বিভাগেই অবনমিত হয় ডার্বি কাউন্টি।

ডার্বি থেকে চলে আসার পর ক্লফ দায়িত্ব নেন ৩য় বিভাগের দল ব্রাইটন হোভ এন্ড আলবিয়নের। আলবিয়ন ১৯তম হয়ে লিগ শেষ করায় বরখাস্ত হন ব্রায়ান ক্লফ। এরপর লিডসের দায়িত্ব নিলেও টানা ৬ ম্যাচ হারায় ৪৪ দিন পর সেখান থেকেও বিতারিত হন ব্রায়ান ক্লফ। ১৯৭৫ সালের শীতকাল। ব্রায়ান ক্লফ আবারো ফিরলেন কোচিংয়ে। এবার নটিংহ্যাম ফরেস্টের হয়ে।

ক্লফ যখন ক্লাবে আসলেন নটিংহ্যাম তখন ২য় বিভাগের ১৩ তম স্থানে পড়ে আছে। তাঁরা আগের দশকে একবারই ১ম বিভাগে খেলেছিল, ক্লাবের সাফল্য বলতে সর্বসাকুল্যে ২টি এফএ কাপ জয়। অ্যালান ব্রাউনকে সরিয়ে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল ক্লফকে। নটিংহ্যামের হয়ে প্রথম ম্যাচে প্রতিপক্ষ টটেনহ্যাম হটস্পার্স। এফএ কাপের রিপ্লাই ম্যাচ ছিল সেটি। টটেনহ্যাম ছিল ১ম বিভাগের দল এবং ইতিমধ্যে ৫ বারের এফএ কাপ চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু অঘটন ঘটিয়ে স্পার্সদেরকে ১-০ গোলে হারিয়ে পরের রাউন্ডে চলে গেল নটিংহ্যাম। ক্লফ নিজেকে অনেকটাই বদলে নিয়েছিলেন। তিনি টিভি শোতে খুব কম যেতেন এবং তাঁর তীর্যক মন্তব্যগুলোও আর তিনি করতেন না। সেই মৌসুমে ২য় বিভাগে ৮ম হয়ে শেষ করল নটিংহ্যাম।

১৯৭৬-১৯৭৭ মৌসুমে নটিংহ্যাম ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হল। ১ম বিভাগে উঠে এসে দেখা মেলল এক নতুন নটিংহ্যাম ফরেস্টের। ১৯৭৭-১৯৭৮ মৌসুমে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে লিভারপুলকে লিগ কাপের ফাইনালে ১-০ গোলে হারিয়ে আলোচনা খোরাক জোগাল নটিংহ্যাম। অথচ লিভারপুল তখন গোটা ইউরোপের ত্রাস। ইংলিশ ফুটবলে তখন লিভারপুল রাজত্ব চলছে। চারিদিকে লালদের জয়কার। লিভারপুলের রাজত্বে ভাগ বসানো তো দূরে থাক তাঁদেরকে চোখ রাঙানোর মতো কোনো দলই তখন ইংল্যান্ডে ছিল না। শুধু ইংল্যান্ড না, ইউরোপেও লিভারপুল ধারাবাহিকভাবে ভালো করে যাচ্ছিল। সেই লিভারপুলকেই হারাল ক্লফের নটিংহ্যাম ফরেস্ট।

সেই মৌসুমেই লিভারপুলকে ৭ পয়েন্টের ব্যবধানে হারিয়ে ১ম বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বসল নটিংহ্যাম। ক্লাবের ১১৪ বছরের ইতিহাসে সেটিই ছিল প্রথম লিগ জয়। যে দলটি এক মৌসুম আগেও খেলতো ২য় বিভাগে, সেই দলটিই পরের মৌসুমে হয়ে গেল ১ম বিভাগ চ্যাম্পিয়ন। লিস্টারের রূপকথাকেও হার মানায় এই গল্প।

হার্বার্ট চ্যাপম্যান এবং কেনি ডালগ্লিশের পর তৃতীয় ম্যানেজার হিসেবে দুটি ভিন্ন দলের হয়ে ইংলিশ লিগ জিতেন ব্রায়ান ক্লফ। ১৯৯২ সালে ইংলিশ লিগের নাম প্রিমিয়ার লিগ হওয়ার পর এখন পর্যন্ত দুটি ক্লাবকে চ্যাম্পিয়ন করাতে পারেননি কোনো ম্যানেজার। এ থেকেই বোঝা যায় কাজটা কতটা কঠিন।

লিগ তো জিতলেন বটে, কিন্তু কে ভেবেছিল এর থেকেও বড় চমক অপেক্ষা করছে! ক্লফ নিজেও ভেবেছিলেন কি?

১৯৭৮-১৯৭৯ মৌসুমে নটিংহ্যাম লিগ জিততে পারল না, লিভারপুলের পেছনে থেকে রানার্সআপ হয়ে শেষ করল লিগ। সাউদাম্পটনকে ৩-২ গোলে হারিয়ে টানা ২য় বার জিতল লিগ কাপ। কিন্তু এসবের কিছুই তখন আর অবাক করার মতো না। অবাক করার মতো যেটি ঘটল সেটি হল নটিংহ্যাম ইউরোপিয়ান কাপেরর ফাইনালে পৌঁছে গেল তাও আগেরবারের চ্যাম্পিয়ন লিভারপুলকে হারিয়ে। এখানেই শেষ নয়, ফাইনালে মালমো কে ১-০ গোলে হারিয়ে জিতে নিল ইউরোপিয়ান কাপ!!! নটিংহ্যামের ইতিহাস বদলে দিল ওই এক জয়। রাতারাতি বড় ক্লাব হয়ে উঠল তাঁরা। হয়ে উঠল অন্য ক্লাবগুলোর ত্রাস।

পাঠক ভাবছেন এবার বুঝি থামবে নটিংহ্যাম রূপকথা? না পাঠক, আপনাদের চোয়াল আরেকবার বিস্ময়ে ঝুলে পড়বে যখন জানবেন পরের বছরও ইউরোপিয়ান কাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল এই নটিংহ্যাম ফরেস্টই। ফাইনালে তখনকার সময়ের জার্মান পরাশক্তি হামবুর্গকে ১-০ গোলে হারিয়ে টানা ২য় বারের মতো তাঁরা জিতে ইউরোপের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ট্রফিটি।

টানা ২ বার ইউরোপিয়ান কাপ জিতলেও ব্রায়ান ক্লফের কাছে এটিই সবথেকে বড় সাফল্য ছিলনা! তাহলে? ক্লফের কাছে সবথেকে বড় সাফল্য ছিল নটিংহ্যামের ২৬ নভেম্বর ১৯৭৭ থেকে ৯ ডিসেম্বর ১৯৭৮ পর্যন্ত লিগে টানা ৪২ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ডটি।নটিংহ্যাম ভেঙ্গেছিল ১৯১১ সালে বার্নলির টানা ৩৫ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড। যদিও পরে ২০০৪ সালে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে আর্সেনাল টানা ৪৯ ম্যাচ অপরাজিত থেকে ভেঙ্গে দেয় সেই রেকর্ড। কিন্তু এতে তো আর ক্লফের নটিংহ্যামের কৃর্তিত্ব কমছে না।

ইউরোপিয়ান সাফল্যের পরে ধীরে ধীরে ভেঙ্গে যেতে থাকে নটিংহ্যামের সর্বজয়ী দলটি। ১৯৮০-৮১ মৌসুমে লিগে ৭ম এবং ১৯৮১-১৯৮২ মৌসুমে নটিংহ্যাম লিগে হয় ১২ তম। ভাঙ্গাচোরা দল নিয়েই ক্লফ নটিংহ্যামকে ১৯৮৯ এবং ১৯৯০ সালে লিগ কাপ জিতিয়েছিলেন। ১৯৯০ সালে দীর্ঘদিনের বন্ধু পিটার টেইলরের মৃত্যুতে ভেঙ্গে পড়েন ক্লফ। ১৯৯৩ সালে নটিংহ্যামের কোচের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে কোচিং ক্যারিয়ারের ইতি টানেন কিংবদন্তি ব্রায়ান হাওয়ার্ড ক্লফ।

১৮ বছরে নটিংহ্যামকে সর্বমোট ৯০৭ ম্যাচে কোচিং করিয়েছিলেন ব্রায়ান ক্লফ। এর মধ্যে ৪০৭ ম্যাচে জিতে নটিংহ্যাম, ২৪৬ টিতে করে ড্র এবং ২৫০ টি ম্যাচে হারে তাঁরা। এই সময়ের মধ্যে নটিংহ্যাম ১ বার ২য় বিভাগ, ১ বার ১ম বিভাগ, ৪ বার লিগ কাপ, ২ বার ফুল মেম্বারশিপ কাপ, ১ বার এফএ চ্যারিটি শিল্ড, ১ বার অ্যাঙ্গলো-স্কটিশ কাপ, ২ বার ইউরোপিয়ান কাপ এবং ১ বার ইউরোপিয়ান সুপার কাপ জিতে। নটিংহ্যামের বয়স এখন ১৫১ বছর। ১৮৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ক্লাবটি তাঁর শ্রেষ্ঠ সন্তানের সানিধ্য পেয়েছিল ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত, খুব কম নয়, ১৮ টি বছর।

ডার্বি, নটিংহ্যামের কোচ থাকাকালীন সময়ে ক্লফ বহুবার ইংল্যান্ডের কোচ হবার প্রস্তাব পেলেও তিনি রাজি হননি শুধুমাত্র কম শক্তিশালী দলগুলোকে নিজস্ব পরিচয় গড়ে তোলায় সাহায্য করার জন্য। আজকে আমরা লিস্টার সিটি, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের সাফল্য দেখে যেমন গর্বিত তেমন রোমাঞ্চিতও। কিন্তু আজকের লিস্টার কিংবা অ্যাটলেটিকোর পূর্বসুরী ক্লাব নটিংহ্যাম ফরেস্ট আর আজকের ক্লদিও রানিয়েরি কিংবা ডিয়েগো সিমিওনেরা যে ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আছেন সেই ভিত গড়ে দেয়ার কারিগর কিন্তু ব্রায়ান হাওয়ার্ড ক্লফই।

ক্লফের মদ খাওয়ার অভ্যাস ছিল। মদে এতটাই চুর হয়ে থাকতেন যে ৬৭ বছর বয়সেও তাঁকে শল্যবিদের ছুরি-কাঁচির নিচে যেতে হয়েছে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করার জন্য। লিভার ট্রান্সপ্লান্টও পারেনি শেষরক্ষা করতে। ২০০৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ডার্বি সিটি হাসপাতালের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে পাকস্থলীর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নটিংহ্যাম ফরেস্টের পিতা, তাঁদের ইতিহাস বদলে দেয়ার কান্ডারি, নটিংহ্যামের জনগণের নায়ক স্যার ব্রায়ান হাওয়ার্ড ক্লফ।

ক্লফ ছিলেন সেই মানুষদের একজন যারা শত ঝড়ঝঞ্জা সহ্য করেও টিকে ছিলেন বিপুল বিক্রমে। নিজে যা ভালো মনে করতেন সেটাই করতেন। ছিলেন দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সাধারণ মানুষের নায়ক ব্রায়ান ক্লফের কীর্তি কখনো ভুলবে না বিশ্ব।

পরপারে বসে হয়ত লিস্টার কিংবা সিমিওনের অ্যাটলেটিকোর মতো আন্ডারডগ দলগুলোর সাফল্য দেখছেন, মনে মনে হাসছেন আর ভাবছেন তাঁর উত্তরসূরীরা তাঁর দেখানো পথেই আছে, শত ঝড়েও পথ হারায়নি ক্লফীয় ধাতুতে গড়া অদম্য মানুষগুলো।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-