সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা! বর্তমানে বেশ জনপ্রিয় ও বেশ সমালোচিত এক আয়োজন। শুধু বর্তমান সময়েই না, বলা যেতে পারে এ বিষয়ের জনপ্রিয়তা,আলোচনা-সমালোচনার ঝড় কোনকালেই কম ছিল না। খ্রিষ্টপূর্ব সময়েও সৌন্দর্য ও সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাকে ঘিরে রয়েছে নানা মিথ।

এক বিয়ের ভোজসভা। সব দেবদেবী নিমন্ত্রণ পেলেও নিমন্ত্রণ পাননি কলহদেবী এরিস। রেগে গিয়ে সে তার স্বভাবসুলভ কলহ সৃষ্টির কাজে নেমে পড়লেন। হেসপাইরিডিসদের বাগান থেকে একটি সোনার আপেল নিয়ে এলেন। অতি দুর্লভ ও লোভনীয় এই বস্তুটি তিনি আড়াল থেকে গড়িয়ে দিলেন ভোজসভায়। আপেলের উপর খোদাই করে লিখে দিলেন ‘সেরা সুন্দরীর প্রাপ্য।’ 

কলহদেবী স্বার্থক, ভোজ সভার আনন্দ ভুলে সবাই উঠে পড়ে লাগলেন নিজেকে সেরা সুন্দরী প্রমাণে। অবশেষে সবার মধ্য থেকে সুন্দরীর সংখ্যাটা তিনে এসে দাঁড়ালো। সেই সেরা তিনে ছিলেন অর্থ সম্পদের দেবী দেবরাণী হেরা,যুদ্ধের দেবী অ্যাথেনি আর প্রেম ও রূপের দেবী আফ্রোডাইতি। তবে এই তিন দেবীর মধ্যে কোন দেবীকে রাগিয়ে সেরা সুন্দরী নির্বাচন করবেন! ভয়ে বিচারকের ভারটা নিলেন না কেউই। তাই তিন দেবী চলে গেলেন বিশ্বের সেরা সুদর্শন পুরুষ প্যারিসের কাছে। হেরা প্যারিসকে লোভ দেখালেন সেরা ধনীতে পরিণত করার,অ্যাথেনি লোভ দেখালেন সেরা বীরের খ্যাতির আর আফ্রোডাইতি তার সামনে তুলে ধরলেন বিশ্বের সেরা সুন্দরী মানবী হেলেনের প্রেমের আকর্ষণ। ব্যস, কোনো রকম বাছবিচার ছাড়াই প্রেমকে প্রাধান্য দিয়ে আফ্রোডাইতিকেই বিজয়ী ঘোষণা করলেন প্যারিস। তার হাতেই তুলে দিলেন সোনার আপেল অর্থাৎ সেরা সুন্দরীর এওয়ার্ড। এই মিথেই উঠে আসে খ্রিষ্টপূর্বে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার বিষয়টি। সাথে এখানেই প্রশ্নবিদ্ধ সেরা সুন্দরী নির্বাচনের প্রক্রিয়াটিও। যা এখনো চলে আসছে প্রতি বছর বিশাল আয়োজনের মধ্যে চলতে থাকা এই সুন্দরী প্রতিযোগিতাগুলোতে।

একেক জনের কাছে একেক রকম মানে বহন করে এই প্রতিযোগিতা। পজেটিভভাবে গ্রহন করা কারো মতে মানেটা দাঁড়ায় ‘ এ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নারীরা নিজেদের তুলে ধরার, নতুন এক পরিচয় পাওয়ার, আরো আত্মবিশ্বাসী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।’ তবে, ‘নানান জনের নানান মত’, তাই এ বিষয়েও মতের সীমা নেই। যেহেতু সৌন্দর্যের ব্যাখ্যাটা একেকজনের কাছে একেকরকম তাই এই প্রতিযোগিতা বরাবরই বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ। তবে প্রতিবছর গতানুগতিকভাবে চলতে থাকা এই সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করলো ব্রাজিল।

ব্রাজিলের রাজধানী রিও ডি জেনেরিওর জেল কর্তৃপক্ষ কারাগারের নারী বন্দীদের জন্য আয়োজন করেছিলেন সুন্দরী প্রতিযোগিতার। কারাবন্দীদের মধ্যে সুন্দরী প্রতিযোগিতা! নিশ্চয়ই অবাক করা বিষয়? কিন্তু শুধু এ বছরই না, গত বছরও এই কারাগারের নারী বন্দীদের জন্য আয়োজন করা হয়েছিলো এই সুন্দরী প্রতিযোগিতার।

গত ৩০শে নভেম্বর, বৃহস্পতিবার এ বছরের সুন্দরী প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। প্রতিযোগিতার প্রতিযোগিদের মেকআপ,পোশাক নির্বাচন, হেয়ার স্টাইলসহ সব বিষয় খেয়াল রেখেছিলেন কারাগারের স্বেচ্ছাসেবকরাই। প্রতিযোগিতার সময় উপস্থিত ছিলেন দশজন বিচারক এবং ব্রাজিলিয়ান মডেল ও অভিনেত্রি ক্যারল নাকামুরা। শুধু তাই না, উপস্থিত ছিলেন কারাবন্দীদের পরিবারের লোকজনও। সব মিলিয়ে ভিন্নরকম উৎসাহ, আগ্রহের পাশাপাশি আবেগঘন এক পরিবেশ ছিলো কারাবন্দীদের জন্য। অন্যান্য সুন্দরী প্রতিযোগিতার মতো ভিন্নধর্মী এ সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজনে কোনো কমতি ছিল না। ৪৪০জন বন্দীর মধ্যে মাত্র ১০জন চূড়ান্ত পর্বে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সে ১০জন চূড়ান্ত প্রতিযোগীর মধ্যে সেরা সুন্দরীর মুকুট জিতেছেন ডাকাতি মামলায় ৩৯ বছরের কারাদণ্ড পাওয়া মিসেল নিরি। গত বছরের সেরা সুন্দরীর খেতাব জিতেছিলেন মাদক চোরাচালানির জন্য শাস্তিপ্রাপ্ত ২২ বছর বয়সী ক্যারোলিনা রোসা ডি সুজা।

এই কারাগারের অধিকাংশ নারীই মাদক সংক্রান্ত অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত। ব্রাজিলের আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে এই কারাগারে নারীর সংখ্যা ৬০০ ভাগ বেড়েছে। প্রাত্যহিক রুটিনে কিছুটা পরিবর্তন আনতেই এই আয়োজন করা হয় কারাগারে,জানান কর্তৃপক্ষরা।

একটি ফ্যান, চুল শুকানোর যন্ত্র এবং চুল স্টাইল করার যন্ত্র – এগুলো ব্রাজিলের কারাগারে বন্দী নারীদের মধ্যে সুন্দরী প্রতিযোগিতার পুরস্কার৷ কিন্তু পুরস্কার প্রাপ্তির চেয়েও বন্দী এই নারীদের কাছে এই প্রতিযোগিতা আরও বড় কিছু৷ চার দেয়ালের মাঝে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে আসা মানুষগুলো ক্ষণিক আনন্দ পেয়েছে, ভুলে থাকতে পেরেছে ধীর গতিতে টিকটিক করে পার হওয়া কষ্টের মুহূর্তগুলো- এই বা কম কীসে! 

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-