সভ্যতার সুত্রপাত হয় যখন মানুষ ‘লেখা’ আবিষ্কার করে। অর্থাৎ নিজের মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত তথ্য যখন থেকে মানুষ সংরক্ষন করা শিখে গেল তখন থেকেই সভ্যতার জয়যাত্রা শুরু। মহাকালের বিবর্তনে এরপর আমাদের বসবাস করা শুরু হল কাগজের মধ্যেই। কাগজে লিখিত ‘তথ্য’ই হয়ে গেল আমাদের বাস্তবতা। কাগজে যদি লিখিত হত কোন কাল্পনিক ধারণা, বাস্তবতার মত করে, কালক্রমে সেটাই পরিণত হয়ে যেত বাস্তবতায়! এভাবে পৃথিবীর সমস্ত রাষ্ট্র ব্যবস্থা- প্রতিষ্ঠান- ব্যাংক- ধর্ম- কর্পোরেশন দাঁড়িয়ে আছে আমাদের কাগজে লিখিত কাল্পনিক বাস্তবতার উপরে ভিত্তি করে।

ঠিক যেমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। আদি কালে যখন মানুষ শিক্ষিত হত তখন কোন গ্রেডিং বা মার্কিং সিস্টেম ছিলনা। প্লেটোর একাডেমিয়া তে কেউ এ+ পেতে যেতনা। প্লেটোও তাদেরকে সার্টিফিকেট প্রদান করতেন না। শেকসপিয়রের সময়ে যারা পড়াশুনা করতে যেতেন তাদের ক্ষেত্রে মার্কিং ব্যাপারটা ছিলনা। পড়াশুনার শেষ পর্যায়ে তাদের পরিচয় হত- হয় ডিগ্রী লাভ করেছে অথবা ডিগ্রী লাভ করেনি – এভাবে। মূলত শিল্প বিপ্লবের পরেই শিক্ষা ব্যবস্থায় মার্কিং বা গ্রেডিং সিস্টেম চালু হয়।শিল্প বিপ্লবের সময় রাষ্ট্র- শিল্প প্রতিষ্ঠানের ভাষা হয়ে যায় ‘নাম্বার’। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও সেটা অনুসরণ করে। তখনই ছাত্রছাত্রীদেরকে মূল্যায়ন করার ভিত্তি হয় তার অর্জিত মার্কস।

শুরুতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে শিক্ষিত করা, আলোকিত করা, চিন্তাশীল ও মননশীল করে গড়ে তোলা। কিন্তু যখন গ্রেডিং বা মার্কিং শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি হয়ে গেল তখন থেকে মার্কস অর্জনই হয়ে গেল মূল লক্ষ্য- ছাত্র এবং প্রতিষ্ঠান- উভয়েরই। আর তখন থেকেই শিক্ষার মূল যে উদ্দেশ্য ‘মানুষকে আলোকিত করা’ সেটা থেকে একাডেমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো বিচ্যুত হতে শুরু করল। পৃথিবীর অধিকাংশ সফল মানুষ যে স্বশিক্ষিত এবং একাডেমিক প্রতিষ্ঠান থেকে ড্রপআউট- এতে তাই খুব বেশি অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমাদের ব্যবস্থাটাই এমন হয়ে গেছে যে গ্রেডের পিছনে ছুটতে ছুটতে সত্যিকার জ্ঞান ও শিক্ষা অর্জন ব্যাপারটা আমরা ভুলে গেছি, ভুলে গেছেন আমাদের শিক্ষকরাও। কাগজে লেখা হয়ে গেছে এই সিস্টেম, তাই আমরা এখনও সেটাই বয়ে বেড়াচ্ছি।

মার্কস এর লোভ আমাদের কোথায় নিয়ে এসেছে সেটা বুঝতে হলে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ দেখাই যথেষ্ট। প্রশ্ন ফাঁস, কোচিং বাণিজ্য, লাখ লাখ টাকা দিয়ে কোন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি সব কিছুর মূলেই এই সিস্টেম। এর থেকে বের হওয়ার কি কোন উপায় আছে? উপায় একটা আছে, তবে এর জন্য বড় রকমের সাহসী হতে হবে। সিস্টেমকে বুড়ো আঙুল দেখানোর মতো সাহসী। রবীন্দ্রনাথ কিংবা স্টিভ জবসের মতো সাহসী। সেটা সবাই হয়তো পারবে না। তবে কেউ যদি সাহস করে সত্যিকার শিক্ষা লাভ করার সক্ষমতাটুকু অর্জন করতে পারে, আগামির ইতিহাস, সাদা পৃষ্ঠায়, নতুন কাগজে তারাই লিখবে…

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-