সিনেমা হলের গলি

বলিউড এবং আন্ডারওয়ার্ল্ড, অদ্ভুত এক বন্ধুত্ব!

গুলশান কুমার গিয়েছিলেন জাতিশ্বর মহাদেব মন্দিরে পূজো দিতে। পশ্চিম আন্ধেরীর জিতনগরে এটার অবস্থান। মাঝেমধ্যেই এখানে আসেন তিনি, নিয়মিত পূজো দেয়ার অভ্যাস আছে এই মন্দিরে। সেদিনও এসেছিলেন তিনি, তারিখ ১২ই আগস্ট ১৯৯৭। মন্দির থেকে বেরিয়ে একটু সামনে পার্ক করে রাখা গাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন সিনেমার প্রযোজক এবং টি-সিরিজের কর্ণধার এই ব্যক্তি। হুট করেই দুটো অল্পবয়েসী ছোকরা এসে দাঁড়ালো তার সামনে, তাদের চোখেমুখে অস্থিরতার আভাস।

টকটকে লাল দুইজোড়া চোখে মৃত্যুর ছায়া পড়তে ভুল করেননি গুলশান কুমার। সঙ্গে সঙ্গেই দৌড় দিয়েছিলেন তিনি, কিন্ত সঙ্গে সঙ্গেই পিস্তল বের করে গুলি করেছিল ছেলেগুলো। একটার পর একটা, পুরো ম্যাগাজিন খালি করার নেশায় মেতেছিল যেন তারা! প্রায় পনেরোটা বুলেট গুলশান কুমারের শরীরে ঢুকিয়ে দিয়ে তবেই ক্ষান্ত হয়েছিল আততায়ীরা। কাজ শেষে পিস্তল উঁচিয়ে এলাকাও ছেড়েছিল তারা, গুলশান কুমারের নিথর দেহটা অনেকক্ষণ বাদে ট্যাক্সিতে করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন একজন।

বলিউড, মাফিয়া, আন্ডারওয়ার্ল্ড, গুলশান কুমার, দাউদ ইব্রাহিম, হাজী মাস্তান

সেবারই প্রথম বলিউড আর মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের দ্বন্দ্বটা প্রকাশ্যে আসে। আলোচনা শুরু হয় ফিল্মি দুনিয়া আর মাফিয়াদের মধ্যেকার সম্পর্ক নিয়ে। এর আগে ব্যাপারটা ছিল ওপেন সিক্রেট। সবাই জানতো, কিন্ত কেউ মুখে আনতো না কিছুই। গুলশান কুমারের মৃত্যুর পরে মিডিয়া নাছোড়বান্দা হয়ে লেগে গিয়েছিল, মুম্বাই পুলিশও বেশ সিরিয়াসলি নিয়েছিল কেসটাকে। পুলিশি তদন্তেই জানা যায়, দাউদ ইব্রাহিমের ডি-কোম্পানী গ্যাং খুন করেছিল গুলশান কুমারকে। আর এই খুনের নির্দেশ দিয়েছিল আরেক মিউজিক ডিরেক্টর নাদিম-শ্রাবণ। দাউদের বিশ্বস্ত সহযোগী আবু সালেমের মাধ্যমে টাকার লেনদেন হয়েছিল। যদিও গ্রেফতার হবার পরে আদালতে দেয়া জবানবন্দীতে খুনের সঙ্গে নাদিম-শ্রাবণের সংযোগের কথা অস্বীকার করেছিল আবু সালেম।

এ তো গেল দ্বন্দ্বের কথা। এমনিতে কিন্ত বলিউডে মুম্বাইয়ের মাফিয়াদের দৌরাত্ন্য সেই সত্তর-আশির দশক থেকেই ছিল, কে জানে, হয়তো এখনও আছে! বোম্বের প্রথম মাফিয়া ডন হাজী মাস্তানের সঙ্গে দিলিপ কুমার, সুনীল দত্তদের ভালো বন্ধুত্ব ছিল। করিম লালাও ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতেন হিন্দি ফিল্মস্টারদের সঙ্গে। তাদের পার্টির শোভা বাড়াতেন তারকারা। আশির দশকের আগে থেকেই হিন্দি সিনেমায় বিনিয়োগ শুরু করে মাফিয়ারা। এটার পেছনে পুরোপুরিই অর্থনৈতিক কারণ জড়িত। বলিউডে লগ্নি করলে কালো টাকা অনায়াসে সাদা বানিয়ে বের করে আনা যায়, কোন আইনী ঝামেলায় পড়তে হয় না, আর তাই ফিল্ম্র বিনিয়োগ করার এই সহজ সুযোগটা হাতছাড়া করতে চায়নি বোম্বের কোন মাফিয়াই। উপরি হিসেবে নায়িকাদের সঙ্গে খানিকটা ভাব জমানোর সুযোগ তো থাকতোই। আর নতুন নায়িকা হলে কথাই ছিল না।

মাঝেমধ্যে তো নিজেদের প্রেমিকাকে সিনেমায় আনার জন্যেও প্রযোজকেরা খাতায় নাম লেখাতেন অনেক গ্যাংস্টার! আবার মাফিয়াদের পছন্দমতো নায়ক বা নায়িকাদের নিতে রাজী না হলে প্রাণসংশয়েও পড়তে হতো পরিচালক-প্রযোজককে! ১৯৯৫ সালে জাভেদ সিদ্দিকী নামের এক সিনেমা প্রযোজককে খুন করে দাউদ ইব্রাহিমের এক হিটম্যান। জাভেদের অপরাধ ছিল, তিনি দাউদের পাঠানো এক পাকিস্তানী অভিনেত্রী অনিতা আইয়ুবকে নায়িকার রোল দিতে চাননি!

বলিউড, মাফিয়া, আন্ডারওয়ার্ল্ড, গুলশান কুমার, দাউদ ইব্রাহিম, হাজী মাস্তান

বলিউডের সুপারস্টারেরা অনেকেই নিজেদের তাগিদেই সংযোগ রাখতেন মাফিয়াদের সঙ্গে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে ভালো খাতির ছিল সঞ্জয় দত্তের। তাকে তো জেলও খাটতে হয়েছে মাফিয়াদের থেকে বেআইনী অস্ত্র রাখার দায়ে। সালামান খানের সাথেও অনেক মাফিয়া গ্যাংস্টারের বন্ধুত্বের গুজব শোনা গেছে। ঋষি কাপুর দুবাইতে গিয়ে দাউদ ইব্রাহিমের চায়ের নেমন্তন্য গ্রহণ করেছেন। প্রীতি জিনতা-অর্জুন রামপালেরাও আন্ডারওয়ার্ল্ডের লোকজনের সঙ্গে ভালো বন্ধুত্ব বজায় রেখেছিলেন একটা সময়ে। তবে এই ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিলেন নায়িকারা। তাদের কেউ কেউ তো এসব মাফিয়াদের সঙ্গে সংসারও পেতেছেন! মমতা কুলকার্নি বা মনিকা বেদীরা হারিয়ে গেছেন অন্ধকার জগতের প্রবল ঘুর্ণিপাকে তাল সামলাতে না পেরে। দাউদ ইব্রাহিমের সাথে স্টেডিয়ামে একসঙ্গে খেলা দেখার ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর ক্যারিয়ারটাই শেষ হয়ে গিয়েছিল মন্দাকিনীর।

বলিউডে মাফিয়াদের প্রভাব বা হস্তক্ষেপ পুরনো ঘটনা। মহেশ ভাট তো একবার বলেছিলেন, “বলিউডে এমন কোন অভিনেতা-অভিনেত্রী নেই, যিনি স্বেচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে মাফিয়াদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেননি।” ২০০০ সালে মুক্তি পেয়েছিল রাকেশ রোশান পরিচালিত কাহো না পেয়ার হ্যায়। এই সিনেমার লাভের একটা বড় অংশ চাঁদা হিসেবে দাবী করেছিল আলীবাবা বুদেশ নামের মুম্বাইয়ের এক মাফিয়া। রাকেশ রোশান সেটা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। বুদেশের লোকেরা মাঝরাস্তায় গাড়ি থামিয়ে রাকেশের হাত আর কাঁধে গুলি করেছিল, আর শাঁসিয়ে গিয়েছিল, পরেরবার চাঁদা না দিলে গুলিটা বুকে করা হবে! সেই সময়ে যারা নামকরা প্রযোজক ছিলেন, বনী কাপুর থেকে শুরু করে মুকেশ ভাট বা রাকেশ রোশান, সবাই মাদিয়াদের নির্দিষ্ট পরিমান চাঁদা দিয়েই সিনেমা বানাতেন।

বলিউড, মাফিয়া, আন্ডারওয়ার্ল্ড, গুলশান কুমার, দাউদ ইব্রাহিম, হাজী মাস্তান

গুলশান কুমার যে জায়গাটায় খুন হয়েছিলেন, আন্ধেরী ওয়েস্টের সেখানকার বাসিন্দারা এখনও সেই খুনের ঘটনা নিয়ে কথা বলতে ভয় পান। মিডিয়ার সামনে চেহারা দেখাতে চান না কেউই। এমনকি যে ব্যক্তি গুলশান কুমারকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনিও মুখ বন্ধ করে রাখেন! প্রাণের ভয় তো সবারই আছে। বলিউডে যারা কাজ করেন, যতো বড় সুপারস্টারই হোন, প্রাণের ভয় সেখানেও আছে। সেজন্যেই হয়তো গ্যাংস্টারদের জীবন নিয়ে সিনেমা নির্মিত হলেও, তাদের সঙ্গে বলিউডের সম্পর্ক নিয়ে মুখ খুলতে চান না তেমন কেউই। সবার ঘাড়ে তো একটাই মাথা, কি দরকার অবেলায় সেটা খোয়ানোর!

তথ্যসূত্র- ফোর্বস ডটকম, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, হিন্দুস্তান টাইমস।

Comments

Tags

Related Articles