সিনেমা হলের গলি

বলিউডে নেপোটিজম: শেষমেশ সিদ্ধান্ত দর্শকদেরই!

নেপোটিজম নিয়ে বলিউড সরব হয়েছে প্রায় এক বছর হয়ে গেল। শুরুটা হয়েছিল কফি উইথ করনে কঙ্গনা ও সাইফের এপিসোড থেকেই। তারপর তো সবার মুখে মুখেই নেপোটিজম। এক পক্ষ নেপোটিজমের পথ ধরে আসা অভিনেতাদের ধুয়ে দিচ্ছেন তো আরেক পক্ষ ইনিয়ে বিনিয়ে নেপোটিজমের গুণগান গাইছে। অনেকেই অনেক বক্তব্য দিয়েছে, দিচ্ছে এই বিষয়টি নিয়ে কিন্তু কেউ তা থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দিতে পারছে না বা নেপোটিজমের এক্সিস্টেন্সের সাথে মানিয়েও চলতে পারছে না। তো এসবের শেষ কোথায়? আদৌ কি কোন শেষ আছে? চলুন আলোচনা করা যাক।

নেপোটিজমের সহজ বাংলা হল স্বজনপ্রীতি। তো বলিউডে স্বজনপ্রীতির যে হই-হল্লা হলো সেটি কেন হলো বা হওয়ার কী আদৌ প্রয়োজন ছিল কীনা তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। নেপোটিজম বলতে বলিউডে সরাসরি বোঝানো হয় যে, একজন অভিনেতা কিংবা অভিনেত্রীর ছেলে অথবা মেয়ে অথবা আত্মীয়কে তাদের বাবা-মা’র ইনফ্লুয়েন্সের কারণে সহজেই বলিউডে সুযোগ করে দেয়া। তো এই নেপোটিজমের কারণে কী কী ক্ষতি হচ্ছে-

  • এত জনবহুল দেশের এতো এতো প্রতিভারা যেখানে সুযোগ পেতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চেষ্টা করে যায় বছরের পর বছর সেখানে এই স্টারকিডরা খুব সহজেই সে সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে নেপোটিজমের কারণে।
  • অভিনয়, সিনেমা এগুলো যেহেতু ক্রিয়েটিভ মাধ্যম সুতরাং স্ট্রাগল না করে, কিছু শিখে না এসে হুট করে সুযোগ পেয়ে যাওয়া এই স্টারকিডরা সে মাধ্যমটার কোয়ালিটি নীচে নামিয়ে দিচ্ছে।

মোটা দাগে এ দুটোই হচ্ছে নেপোটিজমের কজ এন্ড ইফেক্ট। তো স্বাভাবিকভাবেই যারা কষ্ট করে বলিউডের মাটিতে নিজের ঘাঁটি গড়তে পেরেছে তারা সুযোগ পেলে এদের এক হাত দেখে নিতে ছাড়ে না। কিন্তু সেই এক হাত দেখে নেয়াটা এখন কেন এতো বেশি প্রচার পাচ্ছে, এতো বেশি মানুষ বলছে যেখানে যুগের পর যুগ ধরে এই নেপোটিজমের ধারা চলে আসছে! তার কারণ হচ্ছে, এখন কোয়ালিটির যে ডাউনফল তা আগে ছিল না। আগের স্টারকিডরা জানতো তাদের সার্টেইন একটা লুক দরকার হবে, সার্টেইন একটা সময় তাদের অভিনয়, ফাইটিং, ড্যান্স শিখতে হবে তারপর সার্টেইন প্রোডিউসারের (আগে কালের বেশিরভাগ প্রডিউসার ছিল আন্ডারগ্রাউন্ড সন্ত্রাসী অথবা বিজনেসম্যান) সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তারপর লঞ্চ হতে হবে।

আর এখন পুরো প্রক্রিয়াটা অনেক সহজ হয়ে গেছে। টেকনোলজি বুমের সাথে সাথে স্টারকিডের লুক যেমনই হোক না কেন তাদের শেইপে নিয়ে আসে, সার্জারি করে একটা মানানসই চেহারা এনে দেয়া এখন খুবই সহজলভ্য। পাশাপাশি স্টান্ট, কোরিওগ্রাফি এখন একা অভিনেতার কাঁধে থাকে না; তাকে রিস্ক নিতে হয় অনেক কম। অডিশন তাদের এখন দেয়াই লাগে না বলতে গেলে। প্রোডিউসার হিসেবে টেরোরিস্টরা মার্কেট ছেড়ে দেয়ার পর ফিল্মের লোকজনই বেশি ঢুকেছে, বিজনেসম্যানরাও ক্রিয়েটিভ ডিসিশন নেয়ার জন্য ফিল্ম ফ্যাটার্নিটির লোকই নিয়োগ দেয় তাদের প্রোডাকশন হাউজে। সুতরাং যারা প্রোডিউস করার ডিসিশন নেয় তারা স্টারকিডদের ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছে, কারও মামা-চাচা-খালারাই সে পজিশনে থাকে।

আর এখনকার দর্শকও আগের চেয়ে অনেক ক্ষমাশীল। সুতরাং সুযোগ পাবার চান্স বেশি থাকে। আগেকালের দর্শকদের মুগ্ধ করতে একজন অভিনেতাকে অনেক কিছু করতে হতো। অভিনয়ে নতুনত্ব আনতে হতো, নতুন গল্প বলতে হতো। এখন আপনি সিক্স প্যাক দেখালেই কেল্লা ফতে, অভিনয় কোন ছাড়! তবে এখনকার দর্শক ব্রুটাল একদিক দিয়ে সেটা হল তারা ভুলে যায় খুব সহজেই। তাই আগের জনপ্রিয় অভিনেতারা যেমন সুপারস্টারডম ইনজয় করেছে সেটা বর্তমান অভিনেতারা কখনো পাবে সেটা কল্পনাও করা অসম্ভব।

নেপোটিজমের এই দিকগুলো কেবল বলিউডে না, আমাদের উপমহাদেশীয় সমাজব্যবস্থাতেই গ্রোথিত অনেকটা। ডাক্তারের ছেলে ডাক্তার হলে, ইঞ্জিনিয়ারের ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হলে, সরকারি চাকুরের ছেলে সরকারি চাকুরে হলে- নায়কের ছেলে নায়ক হবার সুযোগ পাবে না কেন! এখন তাই প্রসঙ্গ চলে আসে সেই সুযোগেই। অর্জুন কাপুর যে পরিমাণ সুযোগ পেয়েছে, আয়ুষ্মান সেটা পায়নি। আবার অর্জুন কাপুর দশটা ফ্লপ দিলেও সিনেমা পাবে কিন্তু আয়ুষ্মান পাঁচটা দিলে ওর দিকে কেউ ফিরেও তাকাবে না। কিন্তু আয়ুষ্মান যা পাবে সেটা হল সুযোগ পেয়ে সফল হলে যে প্রশংসা পাবে সেটা আনম্যাচড হবে। অর্জুন সফল হলে সেটা হালকা পিঠ চাপরে দেয়া পর্যন্তই। হয়তো সেটার প্রচার কৌশলের কারণে অর্জুনকেই সুপেরিয়র মনে হবে কিন্তু দর্শক তো জানে সে কাকে ভালোবাসে। তাই নেপোটিজমের পুরো ইস্যুটাই আমি দর্শকদের ওপর ছেড়ে দিতে বলি।

দর্শক কখনোই তাদের পছন্দ না হলে কোন স্টারকিডকেও দু’পয়সা দাম দিবে না। আপনি সালমান, ঋত্বিক, রনবিরকে দেখতে পারেন, যাদের দিকে কেউ আঙুল তুলে বলবে না এরা ‘নেপো কিড’ কারণ এরা পরিশ্রম দিয়ে নইলে অভিনয় দিয়ে নিজেদের চিনিয়েছে, দর্শকদের অঢেল ভালোবাসা নিজেদের করে নিয়েছে। কিন্তু হারমান বাওয়েজা, আথিয়া শেঠি, সুরাজ পাঞ্চোলি, জ্যাকি ভাগনানিরা কিন্তু ঠিকই নেপো কিডের তকমা পাবে কারণ তারা সুযোগ পেয়েও হেলায় হারিয়েছে ডিটারমিনেশন ও যথাযথ পরিশ্রম না থাকার কারণে। আর এই দ্বিতীয় লটের অসফল নেপোকিডদের সংখ্যাটাই আসলে বেশি। দিনশেষে দর্শকই আসলে ডিসিশন নেবে সে কাকে ভালোবাসবে, নো ম্যাটার হোয়াট সে কার ছেলে বা কার মেয়ে।

দর্শক ‘সঞ্জু’ সিনেমা দেখতে যাবে, রনবীর আর ভিকি কৌশলকে ভালোবেসে বের হবে। জানবেও না একজনের বাবা বিশাল স্টার ছিল আর আরেকজনের বাবা মামুলি স্টান্টম্যান। দিনশেষে রনবীরকে আর ভিকিকে একরকমই ভালোবাসবে দর্শক তাদের পারফরমেন্সের জন্য। সিনেমার ক্ষেত্রেও তাই, স্টারকিডদের সিনেমা যতই গ্র্যান্ড হোক আর সুপারহিট গান থাক; বলার মতো গল্প না থাকলে আর দেখানোর মতো অভিনয় না থাকলে দর্শক একসময় ঠিকই ছুঁড়ে ফেলবে, স্রেফ দর্শককে একটু সময় দিতে হবে। নইলে তো অর্জুনের নমস্তে ইংল্যান্ড ১০ কোটিও কামাতে পারে না যেখানে সেখানে আয়ুশ্মানের বাঁধাই হো থাকে ১০০ কোটির পাহাড়চূড়ায়। দর্শক নেপোটিজমের ধার ধারে না ভাই, তাদের কাছে একটা টার্মই ম্যাটার করে- এন্টারটেইনমেন্টিজম।

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles