সিনেমা হলের গলি

স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ সময়ে বলিউড!

এই মুহূর্তে এক আশ্চর্য সময় পার করছে বলিউড। অন্য অনেক ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেই কমার্সিয়াল ঘরানার ছবি আর কিছুটা ভিন্ন ঘরানার অফট্র্যাক ছবির মত মোটা দাগের দুইটি ভিন্ন মাধ্যম তৈরী হয়ে গেলেও, বলিউডে সবধরণের ছবি যেন এক মোহনায় এসে মিলেছে। এই বলিউডেই যেমন একাধারে রেস থ্রি, বাঘি টু এর মত যুক্তিবুদ্ধিহীন, মাসালা মুভি নির্মিত হচ্ছে, আবার সেখানেই নির্মিত হচ্ছে প্যাডম্যানের মত জনসচেতনামূলক ছবি। এই বলিউডেই রেইডের মত ইতিহাসনির্ভর সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত ছবি যেমন মুক্তি পাচ্ছে, ঠিক সেই একই সমান্তরালে মুক্তি পাচ্ছে বীরে দি ওয়েডিং এর মত বিতর্ক উস্কে দেয়া ছবিও। অর্থাৎ একই সময়ে বলিউড ছুঁয়ে যাচ্ছে সকল ঘরানাকেই।

কিন্তু তারপরও এই সব ছবির মধ্যে একটি সাদৃশ্য কী, জানেন? সেটি হলো, এই সব ধরণের ছবিই সফলতার মুখ দেখছে। তার মানে হলো, বলিউডের দর্শক আর কেবল এক ধরণের ছবির দিকেই অন্ধের মত ঝুঁকে নেই। সব ধরণের ছবিকেই সমানভাবে গ্রহণ করছে তারা। আর তাই তো গত এক দশকের মধ্যে সেরা সময়টি পার করছে বলিউড। গত বছর পর্যন্তও যেখানে কান পাতলে কেবল শোনা যেত হাহাকার ধ্বনি, সেখানে এখন শোনা যায় কেবলই বিজয়োল্লাস।

গত বছরের প্রথমার্ধ্বে (৩০ জুন, ২০১৭ পর্যন্ত) বলিউড মাত্র চারটি ছবি উপহার দিতে পেরেছিল যেগুলো কিনা বিশ্বব্যাপী অন্তত দেড়শ কোটি রুপির বেশি আয় করতে সক্ষম হয়েছিল। সেই ছবি চারটি হলোঃ শাহরুখ খানের রইস (৩০৮.৮ কোটি), অক্ষয় কুমারের জলি এলএলবি ২ (৩০৭.২৯ কোটি), বরুণ ধাওয়ান-আলিয়া ভাটের বদ্রিনাথ কি দুলহানিয়া (২০০ কোটি) ও হৃত্বিক রোশানের কাবিল (১৭৬ কোটি)।

অথচ সেখানে এ বছর এখনও ছয় মাস পূর্ণ হতে না হতেই একশ কোটি আয় ছাড়িয়েছে আটটি ছবি! সঞ্জয় লীলা বানসালি পরিচালিত দীপিকা পাড়ুকোন-রনবীর সিং জুটির ছবি পদ্মাবতী বিশ্বব্যাপী আয় করেছে ৫৮৫ কোটি। টাইগার শ্রফের বাঘি ২ আয় করেছে ২৫৩.১৮ কোটি। লাভ রঞ্জন পরিচালিত সোনু কি টিটু কি সুইটি আয় করেছে ১৪৮.৫১ কোটি। অজয় দেবগনের রেইড আয় করেছে ১৪২.৮১ কোটি। অক্ষয় কুমারের প্যাডম্যান আয় করেছে ১২০.৫৬ কোটি। এছাড়াও সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত সালমান খানের রেস ৩ মুক্তির প্রথম চারদিনেই ঘরে তুলেছে ১৪০.৭৪ কোটি। তবে এই তালিকায় সারপ্রাইজ এনট্র্যান্ট হিসেবে রয়েছে বীরে দি ওয়েডিং আর রাজি।

বীরে দি ওয়েডিং তার বিষয়বস্তুর জন্য অনেক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বেশ অনুমিতভাবেই। কিন্তু পাশাপাশি সেটি যে বক্স অফিসেও সফলতার দেখা পাবে, তা হয়ত ভাবতে পারেনি কেউই। বছর দুয়েক আগে হলেও এ ধরণের ছবি নিয়ে কেবল সোশ্যাল মিডিয়াতেই বচসা হতো, অথচ বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ত ছবিটি। কিন্তু এবার আর তেমন কোন নিয়তি মেনে নিতে হয়নি ছবিটিকে। কারিনা কাপুর, সোনম কাপুর অভিনীত এ ছবিটিও এখনও মহা সমারোহে চলছে অনেক সিনেমা হলে, এবং ইতিমধ্যেই আয় করে নিয়েছে ১২৭.৪৪ কোটি। মুক্তির প্রথম সপ্তাহান্তেই ছবিটি পার করেছিল ৫০ কোটির মাইলফলক।

অন্যদিকে আলিয়া ভাটের রাজি তো ইতিহাসই রচনা করে ফেলেছে। বলিউডে নারীকেন্দ্রিক ছবি ব্যবসায়িক সাফল্য পায় না বলে একটি বিশ্বাস রয়েছে দীর্ঘদিনের। কঙ্গনা রানাউত আর বিদ্যা বালানের হাত ধরে প্রথম সেই বিশ্বাসে প্রথম বড় ধরণের ধাক্কা লেগেছিল। কঙ্গনার তানু ওয়েডস মানু আয় করেছিল ১৫০.৭৭ কোটি, আর কুইন আয় করেছিল ১০৮ কোটি। অন্যদিকে বিদ্যা বালানের ডার্টি পিকচার আয় করেছিল ১১৭ কোটি, যদিও সেটিতে বিদ্যা বালান ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন তারকা ছিলেন। তবে রাজি ভেঙে দিয়েছে পূর্বের সকল রেকর্ড। এ ছবিটি আয় করেছে ১৮৯.৫৫ কোটি। আর তার মাধ্যমে আলিয়া প্রমাণ করে দিয়েছেন যে বলিউডের অনেক পুরুষ তারকার চেয়ে তিনি কোন অংশেই কম যান না, বরং সামর্থ্য রাখেন কেবল একার স্টার পাওয়ারেই বক্স অফিসে ঝড় তুলতে।

এ তো গেল এ বছর ১০০ কোটির মাইলফলক ডিঙানো ছবিগুলোর কথা। তবে এর পাশাপাশি আরও বেশ কয়েকটি ছবি রয়েছে যারা হয়ত নির্দিষ্ট মাইলফলক পেরোতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু নিজেদের বাজেট অনুযায়ী হয়েছে দারুণ সফল। যেমন রাণী মুখার্জীর হিচকি (৭৬.৫ কোটি) ও বরুণ ধাওয়ানের অক্টোবর (৫৪ কোটি)। এ ছবি দুইটি হয়ত ব্লকবাস্টার হিট হয়নি ঠিকই। কিন্তু দুইটি ছবিরই বাজেট ছিল ২০ কোটির মত। তাই এই দুইটি ছবিও নিঃসন্দেহে সুপারহিট। এমনকি জন আব্রাহাম অভিনীত পরমাণুঃ দ্য স্টোরি অফ পোখড়ানও আয় করেছে ৮৪.৭০ কোটি। আর অমিতাভ বচ্চন-ঋষি কাপুরের ১০ কোটি বাজেটের মেলোড্রামাটিক ছবি ১০২ নট আউট আয় করেছে ৭৮.৫৯ কোটি।

যারা এটুকু পড়েই হাঁপিয়ে উঠেছেন, তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে বছরের প্রথমার্ধ্ব কিন্তু এখনও শেষ হয়নি। এবং তার আগেই মুক্তি পেয়ে যাবে রাজকুমার হিরানী পরিচালিত, রনবীর কাপুর অভিনীত সঞ্জয় দত্তের বায়োপিক সাঞ্জু। এই পরিচালকের শেষ দুই ছবি আয় করেছিল যথাক্রমে ৮৫০ ও ৪৫০ কোটি। এবং সাঞ্জু নিয়ে এই মুহূর্তে যে পরিমাণ হাইপ, তাতে ২৯ জুন মুক্তি পাওয়ার পর ছবিটি শতকোটির ক্লাবে ঢুকতে সর্বোচ্চ তিনদিনের বেশি নেবে বলে মনে হয় না।

সাঞ্জু, সঞ্জয় দত্ত, রনবীর কাপুর, রাজকুমার হিরানী

অর্থাৎ স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ প্রথমার্ধ্ব কাটিয়ে ফেলল বলিউড। বছরের বাকি সময়টাও বলিউডের জন্য সোনায় সোহাগা হবে বলেই অনুমান করা যাচ্ছে। কারণ এ বছর আরও অন্তত চারটি বড় রিলিজ রয়েছেঃ অক্ষয় কুমারের গোল্ড, আমির খানের থাগস অফ হিন্দুস্তান, শাহরুখ খানের জিরো, আর রনবীর সিংয়ের সিমবা। এগুলোর পাশাপাশি শতকোটির ক্লাবে নিশ্চিতভাবেই নাম লেখাবে ধাড়াক, সুঁই ধাগা, স্টুডেন্ট অফ দ্য ইয়ার আর টোটাল ধামালও। সেই সাথে যোগ হতে পারে আর দুই-একটি সারপ্রাইজ এনট্র্যান্টও।

২০১৮ সালটি তাই বলিউডের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে পুনর্জাগরণের বছর হিসেবেও।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close