বাংলা একাডেমির হিসেব অনুযায়ী এবারের মেলায় প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। বিগত বছরের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, টাকার অঙ্কটা ক্রমবর্ধমান। এটি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য একটা ভালো খবর যে- মানুষ বই কিনছে এবং এই কেনার পরিমাণ প্রতি বছর বাড়ছে। অর্থাৎ একটা ব্যাপার পরিষ্কার যে, মানুষের মধ্যে পড়ার ক্ষুধা আছে। হয়তো যতটা থাকার দরকার ততটা নেই, কিন্তু আছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, বই লেখা, বই পড়া, বই কেনা এই সব কিছুই ঘটছে ফেব্রুয়ারির বই মেলাকে কেন্দ্র করে। কেমন হতো যদি সারাটা বছর জুড়েই বই নিয়ে এই আগ্রহ উদ্দীপনা বজায় থাকতো?

আমাদের এখানে বই নিয়ে যেটুকু মাতামাতি, তার পুরোটাই ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রিক। লেখকরা বইমেলা মাথায় রেখে লেখা তৈরি করেন, প্রকাশকরা বইমেলা মাথায় রেখেই বই ছাপান। মোটামুটি অক্টোবর-নভেম্ভর থেকেই প্রেসের কল ঘুরতে শুরু করে। মহাসমারোহে বইমেলা সম্পন্ন হবার পর আবার সব যেন স্তিমিত হয়ে যায়। এখন ধরা যাক, বছরে এমন একটা নয়, দুটো বড় আকারের বইমেলা হয়। সেক্ষেত্রে বইয়ের জগতে এই যে গতি, সেটা কি সারা বছর জুড়েই বেগবান থাকবে না?

এবারের বইমেলায় অসংখ্য মানুষ এসেছে। অধিকাংশই হয়তো ঘুরতেই এসেছে, তাও তারা বসুন্ধরা সিটিতে না ঘুরে বইমেলায় ঘুরতে এসেছে- এটাই তো বিশাল ব্যাপার। আমি এখানে ঋণাত্মক কিছু দেখিনা। আর মানুষ যে শুধু ঘুরেছে তা নয়, বইও কিনেছে- তাতো পরিসংখ্যান দেখেই বলা যাচ্ছে। বইও প্রকাশ হচ্ছে প্রচুর। এবারের মেলায় প্রায় সাড়ে চার হাজার বই নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে! কিন্তু, এখানে একটা বড়সড় সমস্যা আছে। সেটা হলো– বইয়ের মান।

অনেক অনেক নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে সত্যি, কিন্তু সেগু্লো কতটুকু মান-সম্পন্ন তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আমাদের দেশে বই প্রকাশ করার ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। লেখকদের নিজের পকেটের টাকা খরচ করে বই ছাপাতে হয়, অথবা চুক্তিবদ্ধ হতে হয় বই বিক্রি করিয়ে দেয়ার জন্য। কাজেই যে কেউ টাকা খরচ করলেই বই প্রকাশ করে ফেলতে পারছে। অথচ প্রতিটি প্রকাশনীর একটি সম্পাদন পরিষদ থাকা দরকার যাদের কাজ হবে নতুন জমা পড়া পাণ্ডুলিপিগুলো যাচাই বাছাই করে দেখা যে সেগুলো প্রকাশের উপযোগী কিনা। এভাবে মান নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটা বজায় থাকলে সংখ্যায় কম হলেও মানে ভালো বই আমরা পেয়ে যাব সহজেই।

বাংলা একাডেমি মোট কত টাকার বই বিক্রি হয়েছে তার একটা হিসেব আমাদের দিয়েছে। কিন্তু এই টাকা থেকে লেখকরা কি আদৌ লাভবান হচ্ছে? একজন প্রতিষ্ঠিত সনামধন্য লেখককে সেদিন আক্ষেপ প্রকাশ করতে দেখলাম এই বলে যে, তাঁর বই কত কপি ছাপানো হয়েছে এবং কত কপি বিক্রি হয়েছে- এটা প্রকাশক তাকে কখনোই জানায়নি, ফলে তিনি তাঁর প্রাপ্য সম্মানীটুকু পাচ্ছেন কিনা- সেটা নিয়ে তিনি সন্দিহান। এই যদি হয় একজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের অবস্থা তাহলে নতুন লেখক দের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। এ ব্যাপারে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন অতি প্রয়োজনীয় একটা ব্যাপার।

বই প্রকাশের ব্যাপারটি আসলে শুধু ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রিক হওয়ার কথা নয়, সারা বছর ধরেই হবার কথা। পর্যাপ্ত পরিমাণ চাহিদা থাকলে অর্থাৎ পাঠকের সংখ্যা বেশি হলেই কেবল মাত্র প্রকাশকরা এই কাজটি করতে পারে। যেহেতু আমাদের বই নিয়ে উচ্ছ্বাস শুধুমাত্র ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রিক বা বইমেলা কেন্দ্রিক, তাই বছরে আরেকটি বইমেলা আয়োজনের ব্যাপারটি মাথায় রাখা যেতে পারে। সারা বছর, সমগ্র দেশ জুড়েই ছোটবড় বইমেলা হয়। কিন্তু সেগুলো পর্যাপ্ত নয়। বড় আকারের মেলার আয়োজন হতে পারে। তবে সেটা যে ঢাকাতেই হতে হবে- এমন নয়। হতে পারে ঢাকার বাইরেও। ঢাকা মানেই তো বাংলাদেশ নয়।

ফেব্রুয়ারির একুশে বইমেলার সাথে আমাদের আবেগ জড়িয়ে আছে। আমাদের বই এবং মননলীলতা-সৃজনশীলতা চর্চার পুরোটাই আবর্তিত হয় এই বইমেলা ঘিরে। এক ২৮ ফেব্রুয়ারিকে বিদায় জানাতে জানাতে আমরা অপেক্ষা করি পরবর্তী ১ ফেব্রুয়ারির। বাণিজ্য মেলা যদি কিছুদিনের জন্য বাড়ানো যেতে পারে, তবে ফেব্রুয়ারির বইমেলা কেন নয়?

বইয়ের জগতে আমাদের অবগাহন আনন্দময় হোক। যান্ত্রিক ব্যস্ত জীবনের কোলাহলে, নগরবাসী শিশুটি যখন পিতার হাত ধরে অবাক চোখে বইমেলা ঘুরে বেড়ায়- সেই দৃশ্যটি দেখার জন্য হলেও বইমেলা আবারো ফিরে আসুক দ্রুততম সময়ে।

ছবি কৃতজ্ঞতা- দৈনিক ইত্তেফাক

Comments
Spread the love