সকাল নয়টা থেকে রাত নয়টা, এসময়ের মধ্যে যদি আপনি কখনো শাহবাগ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির দিকে হাঁটা শুরু করেন, তবে কিছু পথ যেতেই ফুটপাতে দেখা মিলবে তার। একটি বইভর্তি ভ্যানগাড়িতে সাদা কাগজে লেমেনেটিং করা ছোট্ট সাদা রঙের সাইনবোর্ড ঝোলানো- “বইপোকা”। তার পাশেই মুখভর্তি খোঁচা দাঁড়ি আর পুরু গোঁফ নিয়ে দাঁড়ানো যুবকমধ্য বয়স্ক ভবঘুরে মতন এক প্রমিতভাষী ভদ্রলোক। যিনি ক্যাম্পাসে বইপোকা নামেই সর্বজন পরিচিত। বর্ণনা শুনে এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝে যাবার কথা যে বইপোকা পেশায় একজন বইবিক্রেতা। আর ভ্রাম্যমান এ ভ্যানটির মালিকানা তারই। বাংলা ভাষার জনপ্রিয় সব বইয়ের পাশাপাশি পৃথিবী বিখ্যাত নানা বিদেশী বইয়ের বাংলা অনুবাদের সংগ্রহ রয়েছে তার এই ভ্যানে।

চুয়াডাঙ্গার শিক্ষিত এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান মদু মন্ডল ওরফে বইপোকা। বাবা মায়ের স্বপ্ন ছিল আদরের ছেলে মদু আইন বিষয়ে পড়াশোনা করবে। ভাল রেজাল্ট করে একদিন বড় আইনজীবী হবে। তাদের সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্দেশে ২০০৭ সালে মায়ের কাছ থেকে ৫০০ টাকা নিয়ে আইন পড়তে প্রথম ঢাকায় আসেন মদু। আত্মীয় এবং পরিচিতজনদের থেকে ঋন নিয়ে ভর্তিও হন ধানমন্ডি ল’কলেজ -এ।

তবে একদিকে অর্থাভাব অন্যদিকে শহুরে যান্ত্রিক শৃঙ্খল। এর মাঝেই কিছুদিন পরই তিনি আবিস্কার করলেন আইন পড়া আর তাকে আকৃষ্ট করে না। আর যাই হোক আইনজীবী হওয়া তাকে দিয়ে হবে না। তখন তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। ঘটনাচক্রে সেসময় তার পরিচয় হয় বঙ্গবন্ধু হলের রিপন নামে এক আবাসিক ছাত্রের সাথে। তার পরামর্শেই একদিন মদু বই বিক্রি করবে বলে মনস্থির করে। কিন্তু বই বিক্রির জন্য তো বইয়ের সংগ্রহ থাকা চাই! আর এর জন্য দরকার ন্যূণতম পুঁজি। কিন্তু এই পুঁজিই বা আসবে কি করে! এক্ষেত্রেও মদুকে সাহায্যে এগিয়ে আসেন রিপন নামের তার সে বড় ভাই। রিপন ভাই এর পুঁজিতে মাত্র ৫০ টি বই নিয়ে প্রথমবারের মত বসেন বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পাশে। কিন্তু ঘটনা ভিন্নদিকে মোড় নেয় তার ল’কলেজের পরীক্ষায় অকৃতকার্য হবার খবরে। পুনরায় পরীক্ষা দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে নেবার আর্থিক সামর্থ্যও যে তার নেই! ফলে অগত্যা তাকে ঢাকা ত্যাগ করতে হয়।

কিন্তু ততদিনে বইয়ের প্রতি মনের অজান্তে সৃষ্ট ভালবাসায় চুয়াডাঙ্গার ফিরে গিয়ে মফস্বল শহর কার্ফাজডাঙ্গায় শুরু করেন তার নতুন স্বপ্নের বাস্তবায়নের কাজ। পরিবার ও অন্যান্যদের সহায়তায় সেখানে অল্প কিছুসংখ্যক বই নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন “জ্ঞানাগার” লাইব্রেরী। তার যাপিত জীবনের স্বপ্ন তখন শুধু বই এবং বই। তবে ঢাকা ছেড়ে ছোট্ট এ মফস্বলে মদু প্রতিনিয়তই অস্বস্তিতে ভুগতেন। জ্ঞানরাজ্যে অবগাহনে তৃষ্ণার্ত এ মানুষটি একসময় অনুভব করলেন শহর ছেড়ে নিরবে নিভৃতে এভাবে পরে থাকা জীবন তার জন্য নয়। তিনি কোলাহল পছন্দ করেন, হাজার লোকের ব্যস্ত শহরে উদ্বেলিত হন। মফস্বলের নিরিবিলি নির্জনতা তাকে সেভাবে টানে না। একান্নবর্তী পরিবারও ততদিনে এক ছন্নছাড়া জীবনের এই ধরনের ভাবুক কার্মকান্ডকে প্রশ্রয় দিতে না পেরে তার উপর থেকে পুরোপুরি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে।

২০১৩ সালের ঘটনা। সব মায়া কাটিয়ে “জ্ঞানাগার” এর সমগ্র বই নিয়ে স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন মদু মন্ডল। ঢাকায় এসে এবারও রিপন ভাই এর সাহায্যে নিয়ে একটি ভ্যানগাড়ি কিনে পলাশী মোড়ে শুরু করেন বই বিক্রি। থাকার জায়গা না থাকায় দিনে বই বেঁচে নজরুল সমাধিতেই কোনরকম ঘুমিয়ে রাত পার করে দেন। ঐবছর শাহবাগের উত্তাল গণজাগরণ মঞ্চেও কোন কোন রাত নির্ঘুম কাটে তার। সেদিনগুলোয় তার বেশ ভালোই বই বিক্রি হয়, অনেক লেখক, প্রকাশকের সাথেও সেসময় পরিচয় ঘটতে থাকে। বিভিন্ন জায়গা থেকে, বিভিন্ন জনের কাছ থেকে বই পাওয়া শুরু হয় তার। বইপোকার ভ্যান তখনই স্থানান্তরিত হয় বর্তমান এই জায়গায়।

জীবনযাত্রা পথে বই এতদিনে তার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। অবসর সময়ে নিজে বই পড়ায় অভ্যাস্ততায় বই তার ধ্যান-জ্ঞান। বই’ই তার একমাত্র লালিত স্বপ্ন। এসময়ে এসে গুছিয়ে কথা বলা আর লেখার জন্যেও অনেক প্রকাশকের দৃষ্টিগোচরে আসেন মদু। জীবনের আর অন্যান্য অপ্রত্যাশিত ঘটনার মতই একটা সময়ে রিপন ভাইয়ের সাথে সম্পর্কের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। যদিও তা আর তেমন বাঁধা হয়ে দাড়ায়নি তার স্বপ্নপূরণের পথে। এখন তিনি নিজেই চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন স্বপ্নযাত্রার সহযাত্রী ৮০০ এর অধিক বই ধারনকারী “বইপোকা” কে।

এরইমধ্যে জীবনের এ নানা চড়াই উত্‍রাই সঙ্গী করেই লিখেছেন তার প্রথম বই “অনুফল – ১”। যেটি অয়ন প্রকাশনী থেকে গতবছরের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে। বইপোকা স্বপ্ন দেখে একদিন আর ভ্যান নয়, ইন্ঞ্জিনচালিত বাইকে করে তার স্বপ্নরা শহরের এ মাথা ওমাথা ছুটে জ্ঞান বিলিয়ে বেড়াবে। সেদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বইপোকার শাখা থাকবে। যাদের কিনা নাম হবে বইপোকা ১, ২, ৩, ……

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-