আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল কক্সবাজারে গিয়েছিলেন, সেখানে কিছু উন্নয়ন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন, পরিদর্শন করেছেন রোহিঙ্গা ক্যাম্প। সেটা খবর নয়, খবর হচ্ছে, স্থানীয় এক জনসভায় তিনি বিতর্কিত সাংসদ আবদুর রহমান বদিকে পাশে নিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন, ‘বদির কোন বিকল্প নেই’ বলে! ইয়াবা সম্রাট হিসেবে যার খ্যাতি আছে, দুর্নীতি মামলায় মহামান্য আদালত যাকে সাজা দিয়েছেন, যার কারণে মায়ানমার থেকে ইয়াবার চালানগুলো টেকনাফ হয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে, দেশের যুবসমাজ আক্রান্ত হচ্ছে সেই মরণঘাতি ইয়াবার সর্বনাশা ছোবলে, সেই আবদুর রহমান বদিকেই যখন সরকারী দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যাক্তি কক্সবাজারে ‘আওয়ামীলীগের ভবিষ্যত’ হিসেবে খেতাব দেন, তখন নিস্ফল আক্রোশে বিরক্ত হওয়া ছাড়া আসলেই আর কিছু করার বা বলার থাকে না।

উখিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগ আয়োজিত সেই সমাবেশে ওবায়দুল কাদের স্পষ্ট করে বলেছেন- ‘বদি গরিবের বন্ধু, বদির কোনো বিকল্প নেই। উখিয়া টেকনাফের উন্নয়নের জন্য বদি অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। রোহিঙ্গাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনগণের জন্য বদির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নানা সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসময় কাদের বলেন, ‘বদি সবসময় সংসদে আপনাদের কথা বলেন। আগামী নির্বাচনে বদিকে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আবারো জয়ী করতে হবে।’

ওবায়দুল কাদের আবদুর রহমান বদিকে ‘গরীবের বন্ধু খেতাব দিয়েছেন, কিন্ত এটা বলতে ভুলে গিয়েছেন যে বদি ইয়াবার বন্ধু, বাংলাদেশের আপামর ইয়াবাসেবী সমাজের বন্ধু। বাংলাদেশের ইয়াবা জগতের অন্ধকার একটা রাজ্য আছে, সেই রাজ্যের আকৃতিটাও বিশাল, আর সেই বিশাল রাজ্যে আবদুর রহমান বদি অবিসংবাদিত সম্রাট। মুকুটহীন রাজার মতোই একজন তিনি, গডফাদার, কিংবা ফাদার অব গডফাদারও বলতে পারেন। তার ব্যবসার সীমারেখা তো শুধু বাংলাদেশে নয়, সেটা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিস্তৃত। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তিনি নাকি দক্ষিণ এশীয় মাদক জোনে ‘মেজভাই’ নামে পরিচিত!

আবদুর রহমান বদি’র বাবা ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান, শুরুতে জাতীয় পার্টির রাজনীতি করতেন। এরশাদের পতনের পরে ভোল পাল্টে বিএনপিতে যোগ দেন। বাবার সেই প্রতিভা বদিও পেয়েছেন, বিএনপির রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি, মনোনয়ন না পাওয়ায় নাম লেখান আওয়ামীলীগে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিএনপি আমলে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে বিভিন্ন চোরাচালানি ব্যবসায় হাত পাকিয়েছিলেন বদি। ১৯৯৬ নির্বাচনের আগে বিএনপি থেকে সাংসদ হিসেবে মনোনয়ন দাবী করেছিলেন, কিন্ত বদির রেকর্ড খারাপ থাকায় তাকে সেবার মনোনয়ন দেয়নি বিএনপির হাইকমান্ড। তারপরই তিনি যোগ দেন আওয়ামীলীগে।

ইয়াবা, আবদুর রহমান বদি, টেকনাফ, ওবায়দুল কাদের

স্বাধীনতার পরে ১৯৭৩ আর ১৯৯৬ ছাড়া বাকী নির্বাচনগুলোর একটিতেও কক্সবাজার-৪ আসন থেকে আওমীলীগ জিততে পারেনি। ২০০৯ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের জোয়ারে এই আসনে জিতে আসেন বদি, এজন্যে তাকে বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়নি। চারদলীয় জোটের দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেতেই কক্সবাজারের লোকে দলে দলে নৌকায় ভোট দিয়েছিল সেবার, প্রার্থী কে সেটাও হয়তো দেখেনি অনেকেই। এর আগে তিনি টেকনাফ পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন একবার। আর এভাবেই পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন আবদুর রহমান বদি।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদনে দাবী করা হয়েছিল, আবদুর রহমান বদির বাবা এজহার মিয়া ওরফে এজহার কোম্পানীও নাকি ছিলেন আন্তর্জাতিক চোরাচালান সিণ্ডিকেটের গডফাদার গোত্রীয় একজন। পুলিশের ওয়ারেন্ট ছিল তার নামে। বাবার সুযোগ্য সন্তানের মতোই ক্ষমতায় বসে নিজের রাজ্যপাট গুছিয়ে নিতে শুরু করেন বদি। টেকনাফএর মানচিত্রটা একটা টানেলের মতো, মায়ানমার থেকে এখান দিয়েই বাংলাদেশে ঢোকাটা সবচেয়ে সহজ। ইয়াবার জন্মস্থান এই পার্শবর্তী দেশটা, এখান থেকে স্রোতের মতো ইয়াবা আসতে শুরু করে বদি এমপি হবার পর থেকেই। টেকনাফ হয়ে ওঠে মাদকের রাজধানী, কিংবা আলাদা একতা রাজ্য, যেখানে আবদুর রহমান বদির কথাই শেষ কথা, তার সিদ্ধান্তই শিরোধার্য্য!

ইয়াবা ব্যবসার পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করে আবদুর রহমানের পরিবারের সদস্যেরা। শতশত কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তির অধিকারী তারা, দাবী করেছে মিডিয়া। ইয়াবা ব্যবসাটা সংক্রামক ব্যধির মতো করে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো টেকনাফে, তারপর পুরো কক্সবাজার জেলাতেই। অল্প পরিশ্রমে অনেক লাভ, খানিকটা ঝুঁকি আছে, কিন্ত তাতে কি! পুলিশের হাতে ধরা পড়লে দুইদিনে জেল থেকে ছাড়িয়ে নেয়ার লোকও তো আছে। মানুষজন মাছের ঘের, কাঠের ব্যবসা, লবনের আড়ত বন্ধ করে দিয়ে নেমে পড়েছে ইয়াবা ব্যবসায়। কক্সবাজার বেড়াতে গেলে হোটেলের ওয়েটার থেকে রাস্তার রিক্সাওয়ালা সবার কাছেই আপনি ইয়াবার বড়ি পাবেন!

প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়েই এসবকিছু ঘটছে, ইয়াবার চালান আসছে, ভাগ-বাটোয়ারা হচ্ছে, তারপর আলাদা আলাদাভাবে সেগুলো ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে। কিন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অসহায়, কিছু তো করার নেই তাদের! এলাকার সাংসদ যদি সরাসরি যুক্ত থাকেন এটার সঙ্গে, তার পরিবার যদি হয়ত এই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকারী, এইসব প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় যদি ইয়াবার ডিলারেরা বুক ফুলিয়ে হেঁটে বেড়ায়, চোখ বন্ধ করে রাখা ছাড়া পুলিশ আর কিইবা করতে পারে! এমপি বদি এবং তার স্ত্রীর গাড়ি থেকে একাধিকবার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে, কিন্ত ফলাফল? অশ্বডিম্ব! এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাত থেকে আটক হওয়া ইয়াবার চালান ছাড়িয়ে নিয়ে গেছেন আবদুর রহমান বদি, এমন ঘটনাও ঘটেছে!

ইয়াবা, আবদুর রহমান বদি, টেকনাফ, ওবায়দুল কাদের

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা দেশের ৩১ জন শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকায় ভাই-বেয়াই, মামা-ভাগ্নে মিলিয়ে বদিসহ ১০ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর নাম রয়েছে। অথচ তাদের টিকিও ছুঁতে পারছে না কেউ! শুনতে অবাক লাগে! তাহলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় কি বদির এই অনৈতিক কার্যক্রমকে সমর্থন করছে? নইলে কেন তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না? উল্টো সরকারদলের সাধারণ সম্পাদক কক্সবাজারে গিয়ে তাকে অভয় দেন, তার হয়ে ভোট চান! দুর্নীতির মামলায় সাজা হলেও তিনি বেরিয়ে আসেন জেল থেকে, তাকে বরণ করে নেয়ার জন্যে তার ‘ইয়াবা ব্যবসার সহযোগী’রা ব্যানার ফেস্টুন দিয়ে ভরিয়ে দেন পুরো জেলা, বিশাল জনসভা করে শো-ডাউন করা হয়, যেন সবার ওপরে বদিই সত্য, তাহার ওপরে আর কিছু নাই!’

শুধু যে ইয়াবা ব্যবসাই আবদুর রহমান বদির একমাত্র কার্যক্রম, তা কিন্ত নয়। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী টেকনাফ স্থলবন্দর, হাট-বাজার, ঠিকাদারি, পরিবহন, পর্যটকবাহী জাহাজ, টার্মিনাল, জেটিসহ সীমান্ত চোরাচালান ব্যবসা-সবকিছুই তার নিয়ন্ত্রণে! নানা সময়ে বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী কর্মকর্তাদের মারধরের ইতিহাসও রয়েছে তার! ভোটকেন্দ্রের সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার, বন কর্মকর্তা, স্কুল শিক্ষক, আইনজীবি সহ কেউই রেহাই পাননি তার হামলার হাত থেকে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারে গিয়ে সমুদ্রের জলে পা ভেজান, সেই ছবিটা দেখে আনন্দে মন ভরে ওঠে, কিন্ত সেখানেই আবার আবদুর রহমান বদিকে উপস্থিত থাকতে দেখে শঙ্কায় আক্রান্ত হয় মন। দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তি ওবায়দুল কাদের যখন নৌকা মার্কায় বদি’র হয়ে ভোট চান, তখন ভয় হয় আমাদের। পঁচাত্তরের পরে এই নৌকাটাকে ভাসিয়ে রাখতে কম যুদ্ধ করতে হয়নি আওয়ামীলীগকে। এই নৌকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৌকা, জাতীয় চার নেতার নৌকা, কতশত নাম না জানা নেতাকর্মীর রক্ত লেগে আছে এই নৌকার গায়ে, এই নৌকায় শেখ হাসিনাকে জীবিত রাখতে নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন কতজন! সেই নৌকাটায় ফুটো করতে এমন একজন বদিই তো যথেষ্ট! এটা কি দায়িত্বশীল কারো মাথায় ঢোকে না?

তথ্যসূত্র- বাংলাদেশ প্রতিদিন, যুগান্তর।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-