খেলা ও ধুলা

ফুটবল, বোবানের লাথি ও ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ!

ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সালের ৩১ মার্চ, সার্ব নিয়ন্ত্রিত যুগোস্লাভের সাথে। কিন্তু অনেক ক্রোয়েশিয়ান মনে করে আসলে যুদ্ধের শুরুটা হয়েছিল আরও এক বছর পূর্বে; স্বাধীনতার গৌরবময় ইতিহাসের রক্তক্ষয়ী এই যাত্রা কোন প্রথাগত রণক্ষেত্র ছিল না, ছিল একটি ফুটবল মাঠ! ১৩ মার্চ ১৯৯০ সাল, ক্রোয়েশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় ইতিহাসের প্রারম্ভে বিশাল এক প্রতিক্রিয়ার সূচনা ঘটল একজন ক্রোয়েশিয়ান দেশপ্রেমী ফুটবল খেলোয়াড়ের উড়ন্ত লাথির মধ্য দিয়ে!

জ্বনিমির বোবান, মিলানের হয়ে খেলে জিতেছেন চারটি সিরি আ শিরোপা, একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং প্রায় অখ্যাত ক্রোয়েশিয়ান ফুটবল দলের অন্যতম সদস্য যারা ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জন করে গোটা ফুটবল দুনিয়াকে অবাক করে দেয়।ক্রোয়েশিয়া ও মিলান কিংবদন্তিকে ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা ও জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রতীক হিসেবে দেখে ক্রোটরা। সত্যি বলতে খুবই অসামঞ্জস্য লাগবে যদি বলা হয় পুলিশের মুখে বোবানের একটি উড়ন্ত লাথিই পুরো একটি স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা করেছিল। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই যে এই একটি লাথির ঘটনা পুরো প্রক্রিয়াকে নিয়ে গেছে এমন এক পর্যায়ে যেখানে অনেক ক্রোটই মনে করে ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা এখান থেকেই!

ডায়নামো জাগরেবের মাকসিমির স্টেডিয়ামে আসলে কি হয়েছিল তা শুরু করার আগে ক্রোয়েশিয়ার ইতিহাসের পিছনে ফিরতে হবে।
কম বেশি অন্য সব স্বাধীনতাকামী জাতিগোষ্টির মতো ক্রোয়েশিয়ার ইতিহাস যথেষ্ট জটিল, ১১০২ সালের দিকে ক্রোয়েশিয়া যুক্ত হয় হাঙ্গেরির সাথে, এরপর নানা ঘটনার মধ্যদিয়ে ১৫২৭ সালে ক্রোয়েশিয়ার জায়গা হয় হাপসবুর্গ রাজ্যে, যেখানে অস্ট্রিয়ান-হাঙ্গেরিয়ান ক্ষমতার দ্বন্দ ও সাথে রয়েছে বাইরের রাজ্যের (অটোমান) ক্রমাগত চাপ। ক্রোয়েশিয়া শুধু মাত্র তাদের ঐতিহাসিক অঞ্চল নিয়ে সচেতন ছিল না, তারা চেয়েছিল অস্ট্রিয়ান ও হাঙেরিয়ানদের পাশাপাশি সমান রাজনৈতিক অধিকার অর্জন করতে। কিন্তু ১৫৩৩ সালে ঘটে ক্রোয়েশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনা; ক্রোয়েশিয়ার অসম্মতি সত্ত্বেও ক্রোয়েশিয়ান অঞ্চলে সার্বদের যুক্ত করতে থাকে অস্ট্রিয়ানরা যা শত বছরের উপরে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরি।
মূলত গ্রেটার সার্বিয়া গঠনের উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯১৮ সালে সার্ব নেতারা সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বহবোদিনা, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ও মন্ট্রেনেগ্রো নিয়ে গঠন করে যুগোস্লাভিয়া, যারা ছিল পুরোপুরি ভিন্ন জাতিস্বত্ত্বা, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে যুগোস্লাভ ভেঙ্গে গেলেও যুদ্ধ শেষে নানা জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একনায়ক টিটো দ্বিতীয়বারের মতো যুগোস্লাভিয়া গঠন করতে সক্ষম হয়। মূল কথা হলো প্রথম যুগোস্লাভিয়ার মত দ্বিতীয় যুগোস্লাভিয়াতেও ক্রোয়েশিয়ানদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। অন্য সব জাতিগোষ্ঠীর প্রতি সার্ব নিয়ন্ত্রিত আক্রমনাত্মক সরকারের আচরণ ছিল খুবই নিষ্ঠুর ও অমানবিক। সার্বিয়ায় আয়কর ক্রোয়েশিয়া অঞ্চলের তুলনায় কম ছিল, বৈদেশিক লোনের বেশিরভাগ খরচ করা হতো সার্বদের জন্যে এবং ক্রোয়েশিয়া গুরুত্বপূর্ন প্রায় সব জায়গায় নিয়োগ পেত সার্বরা। প্রথম যুগোস্লাভে যে অমানবিক আচরণ ও নিপড়নের স্বীকার হয়ে এসেছে ক্রোয়েশিয়া তার ব্যতিক্রম পরের সমাজতান্ত্রিক যুগোস্লাভিয়াতেও ঘটেনি। ১৯৮০ সালে টি্টোর মৃত্যু ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গনের প্রাক্কালে যুগোস্লাভিয়ায় সোচ্চার হয়ে উঠে স্বাধীনতাকামী জাতিগোষ্ঠিরা। ক্রোয়েশিয়াযে স্বাধীনতা ঘোষণা করবে তা আন্দাজ করতে পেরেই সার্ব নিয়ন্ত্রিত যুগোস্লাভিয়ার সরকার ক্রোয়েশিয়ার সার্বদের মধ্যে ১৯৮৮ সালে অস্ত্র বিতরণ শুরু করে দেয়, পরের বছর বসনিয়া-হার্জেগোভিনাতেও একই কাজ করে সরকার; মূল পরিকল্পনাটি করা হয় যুগোস্লাভিয়ার রাজধানীই বেলগ্রেদে।

রাজনৈতিক কড়চার পর এখন ফুটবলে ফিরে আসি, খেলাধুলার সাথে অনেকেই রাজনীতির মিশেল মানতে চায়না। কিন্তু জাতিগত দ্বন্দ্বে রাজনৈতিক অধিকারের প্রতিফলন খেলার মাঠে হরহামেশা গড়ায়, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। যাই হোক যুগোস্লাভিয়াতে সত্তুরের দশকে জাতীয়তাবাদ প্রকাশের মূখ্য মাধ্যম হয়ে উঠে ফুটবল। রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের এক বিশাল ক্ষেত্র হয়ে উঠে ফুটবল মাঠ যেখানে ফুটবল ভক্তরা নানা রকম রাজনৈতিক স্লোগান, গান, ব্যানার-ফেস্টুনে মাতিয়ে তুলতেন গোটা স্টেডিয়াম যেখানে ফুটবল দলের চেয়ে প্রায়সময়ই জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক ভূমিকা মূখ্য হয়ে উঠে। ফুটবলের মাঠ রাজনৈতিক মাঠে পরিবর্তিত হওয়ার এমন মুহুর্তে যুগোস্লাভিয়ার লিগ ম্যাচে ১৩ মে ১৯৯০ সালে মুখোমুখি হয় ক্রোয়াশিয়ার ডায়নামো জাগরেব ও অখন্ড যুগোস্লাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেদের ক্লাব রেড স্টার, রেড স্টার ক্লাব ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ক্লাব, যুগোস্লাভিয়ার যুদ্ধ সংগঠিত না হলে হয়ত ইউরোপে রেড স্টারের নাম অন্য মাত্রায় উচ্চারিত হতো। রবিবারের সেই ঐতিহাসিক দিনটিতে রেড স্টারের সবচেয়ে একনিষ্ঠ ও উগ্র সমর্থক গোষ্ঠী দেলিয়ে (Delije) প্রায় ৩০০০ সদস্য নিয়ে আরকানের নেতৃত্বে পা রাখে জাগরেবের স্টেডিয়ামে। আরকান বেলগ্রেদের একজন গ্যাংস্টার ছিল যে পরবর্তীতে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ক্রোয়েশিয়া ও বসনিয়ার যুদ্ধে আরকানের নিজস্ব বাহিনী দ্য টাইগার ব্যপক ধ্বংসজজ্ঞ চালায়, এই বাহিনীতে বেলিয়ের অনেক সমর্থক যোগ দিয়েছিল, হেগের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক ট্রাইবুন্যালে আরকানের বিচারও হয়।

অন্যদিকে জাগরেবের সমর্থকগোষ্ঠী ছিল স্বাধীনতাকামী ও ক্রোয়েশিয়ান জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ, এদের মধ্যে সবচেয়ে একনিষ্ঠ ও উগ্র সমর্থকদের একটি দল ছিল ব্যাড ব্লু বয়েজ, যাদের বেশিরভাগ পরবর্তীতে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। ম্যাচ শুরুর আগে থেকেই পুরো স্টেডিয়ামে বিরাজ করছে অন্যরকমের আবহ, স্টেডিয়াম ছেয়ে আছে একদল উগ্র ও ধ্বংসাত্মক মেজাজেররেড স্টার সমর্থক ও দেশপ্রেমী একনিষ্ঠ জাগরেব সমর্থকে। ম্যাচ শুরু হতেই মাঠের খেলার সাথে শুরু হয়ে যায় গ্যালারির উত্তাপ, দুই দলের সমর্থকরা একে অন্যকে তাতিয়ে স্লোগান দিতে থাকে। রেড স্টারের সমর্থকেরা পুরো ব্যাপারটিকে “Zagreb is Yugoslav” ও“We will kill Tudjman.”স্লোগানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রনের বাইরে নিয়ে যায়। Tudjman ছিলেন স্বাধীনতা প্রাক্কালের ক্রোয়েশিয়ার নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। ম্যাচটি যেন ছিল একটি যুদ্ধের আগমনী বার্তা, পুরো স্টেডিয়ামে তখন নরক ভেঙ্গে পরেছে যেন, মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই খেলা পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। রেড স্টারের বেলিয়ারা স্টেডিয়ামের চেয়ার ভেঙ্গে ছুড়ে মারতে থাকে জাগরেব সমর্থকদের দিকে, ভেঙ্গে ফেলে দুই দলের সমর্থকদের আলাদা করে রাখা বেড়াটিও। রেড স্টার সমর্থকদের এমন আক্রমণাত্মক আচরণ স্বত্বেও শাসক গোষ্ঠীর পুলিশ বাহিনী ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল, দাঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে তারা কোন ভূমিকাই পালন করছিল না। এরপর পাল্টা আক্রমন শুরু করে জাগরেবের সমর্থকগোষ্ঠী, উত্তর গ্যালারির বেড়া ভেঙ্গে নেমে আসে ব্যাড ব্লু বয়েজ। পুলিশ, দেলিয়ে ও ব্যাড ব্লু বয়েজের মাঝখানে ক্রোধের দেয়াল ব্যাতিত আর কোন কিছুই ছিল না তখন। ব্যাড ব্লু বয়েজরা দেলিয়ের আক্রমনের মুখে পরা জাগরেব সমর্থকদের সাহায্যে এগিয়ে আসলে পুলিশ তাদের উপরে চড়াও হয় তখন!

দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ও পুলিশের সাথে এই সংঘর্ষ চলে একটা লম্বা সময় পর্যন্ত, এর মধ্যে অবশ্য রেড স্টারের খেলোয়াড়েরা মাঠ ছাড়লেও কিছু জাগরেব খেলোয়াড় জাতীয়তাবাদের টানে মাঠে থেকে গিয়েছিল। এদের মধ্যে একজন ছিলেন বোবান এবং দাঙ্গার একসময় বোবান দেখলেন যে পুলিশ এক জাগরেব সমর্থককে রুলার দিয়ে মারছে, তখনই দৌড়ে গিয়ে উড়ে কষে এক লাত্থি মেরে পুলিশকে ধরাশায়ী করে ঐ সমর্থককে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন তিনি! বোবানের উপর পুলিশ সেইভাবে চড়াও হওয়ার পূর্বেই কিছু ব্যাড বয়েস ব্লুর সহায়তা সেখান থেকে নিরাপদে বের হয়ে আসেন তিনি। বোবানের অসাধারণ এই ভূমিকা গোটা ক্রোয়েশিয়ায় ব্যাপক জাতীয়তাবোধ ও দেশপ্রেমের উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবেজনপ্রিয়তা পায় যা পরবর্তী স্বাধীনতা যুদ্ধে ব্যাপক ভূমিকা রাখে বললে অত্যুক্তি করা হয়না।

স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনার পর বোবানকে নিষিদ্ধ করে যুগোস্লাভ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, তিনি বাদ পরেন ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ দল থেকে। উড়ন্ত লাথির ঘটনার ব্যাপারে বোবান বলেন,

সেখানে আমি ছিলাম একজন জনপ্রিয় মুখ যে কিনা নিজের জীবন, ক্যারিয়ার এবং যা কিছু খ্যাতি আমাকে এনে দিতে পারত, সব কিছুর ঝুকি নিতে প্রস্তুত ছিলাম, শুধু মাত্র একটি আদর্শের জন্যে, একটি কারণে জন্যে- ক্রোয়েশিয়ার জন্য।

ফুটবলার হিসেবে বোবান ছিলেন অসাধারণ, ১৯৯১ সালে ইউরোপের অন্যতম সেরা ক্লাব এসি মিলান কিনে নেয় এই ক্রোটকে। মিলানের হয়ে বোবানের অর্জন তাকে পরিণত করেছে তাদের একজন ক্লাব কিংবদন্তীতে।

ইউরোপের ইতিহাসে ফুটবলকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দাঙ্গার মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ একটি ছিল এটি, যা বদলে দিয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ঘটনার সপ্তাহ খানেক পরেই ক্রোয়েশিয়ার পার্লামেন্ট সিদ্ধান্ত নেয় তাদের অঞ্চলের পুলিশ বাহিনীতে ক্রোয়েশিয়ান নয় এমন পুলিশের সংখ্যা কমিয়ে আনার। যুগোস্লাভিয়ান লিগও মাত্র এক বছর কোনরকমে টিকে থাকে, ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। বেশিরভাগ ক্রোটই জাগরেবের সমর্থক ও বোবানের সাহসিকতাকে দেখেন সার্বদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ হিসেবে এবং মনে করেন এটিই ছিল তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের অলিখিত সূচনা। ১৩ মে’র ঘটনার স্মরণে ডায়নামো জাগরেবের স্টেডিয়ামের বাইরে একটি স্মৃতিস্তম্ভে লিখা রয়েছে,

সকল ডায়নামো সমর্থকদের জন্যে যারা ১৩ মে ১৯৯০ সালে যুদ্ধ শুরু করেছিল এবং শেষ করেছিল তাদের জীবন দিয়ে ক্রোয়েশিয়ান জন্মভূমির জন্যে।

তথ্যসূত্র-

  1. https://inavukic.com/2014/02/17/a-brief-history-of-the-war-in-croatia-background-battlefields-and-outcomes/
  2. http://www.croatianhistory.net/etf/et112.html#jugo
  3. http://www.balkaninsight.com/en/article/1990-football-riot-remains-croatia-s-national-myth-05-12-2016
  4. http://thesefootballtimes.co/2015/09/28/zvonimir-boban-and-the-kick-that-started-a-war/
  5. http://bleacherreport.com/articles/76141-a-real-football-war-the-croatian-patriotic-war 
Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close