খেলা ও ধুলা

একটি মৃত্যু, হাজারো প্রশ্ন ও অমীমাংসিত কিছু রহস্য

শোনা গেল লাশকাটা ঘরে
নিয়ে গেছে তারে;
কাল রাতে ফাল্গুনের রাতের আধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাদ
মরিবার হল তার সাধ।

জীবনানন্দ দাস লিখেছিলেন অনেক বছর আগে, তার ‘আট বছর আগে একদিন’ কবিতার প্রথম কয়েকটা লাইনে। জীবনানন্দের নাম বা তার কবিতা দক্ষিণ আফ্রিকা এবং পাকিস্তানের সাবেক কোচ বব উলমারের শোনার কথা নয়, পড়ার কথাও নয়। তবুও জীবনবাবুর কবিতার সঙ্গে কি অদ্ভুতভাবেই না মিলে গেল উলমারের জীবনের শেষের গল্পটা! ফাল্গুনের এক রাতে কাউকে কিছু না বলে অজানায় পাড়ি জমালেন বব উলমার, তাও কিনা এমন একটা সময়ে, যখন ক্রিকেট বিশ্ব আক্রান্ত বিশ্বকাপ জ্বরে, আয়ারল্যান্ডের কাছে হেরে তার দল পাকিস্তান বিদায় নিয়েছে বিশ্বকাপ থেকে! মৃত্যুদূত সেই অস্থির সময়টাকেই বেছে নিয়েছিলেন বব উলমারের সামনে হানা দেয়ার জন্যে। ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর জন্ম হয়েছিল সেই মৃত্যুতে, জন্ম হয়েছিল হাজারো প্রশ্নের, হাজারো রহস্যের, যেগুলোর কোন স্থায়ী সমাধান হয়নি আজও।

জ্যামাইকা, ২০০৭। ওয়েস্ট ইন্ডিজে বসেছে ক্রিকেট বিশ্বকাপের আসর, এ গ্রুপে স্বাগতিক ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তান। প্রথম দুই ম্যাচেই হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল দলটার। এরমধ্যে দ্বিতীয় ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের কাছে পাকিস্তানের হেরে যাওয়াটা মেনে নেয়ার মতো ছিল না। নবাগত একটা পুঁচকে দলের কাছে পরাশক্তিদের হারটা তো বিস্ময় জাগানোর মতোই। তবে ঢের বিস্ময় যে তখনও অপেক্ষা করছে, সেটা জানা ছিল না কারো। ভগ্ন হৃদয় নিয়েই সেদিন হোটেলে ফিরেছিল পাকিস্তান দল, ডিনারের পর তেমন কথাবার্তাও হয়নি, সবারই মন খারাপ ছিল মোটামুটি। দলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের রুমে চলে গিয়েছিলেন কোচ বব উলমার, অনেকেই হয়তো জানতো না, শেষবারের মতো সবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছেন তিনি! 

পরদিন সকালে হোটেলে নিজের কক্ষের বাথরুমের দরজার সামনে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল বব উলমারকে। শরীরটা উপুড় হয়ে পড়ে আছে, মুখের সামনের দিকে খানিকটা থেঁতলে গিয়েছিল, মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল ফেনা। রক্তও বেরিয়েছিল খানিকটা। কয়েকবার ডোরবেল বাজানোর পরেও দরজা না খোলায় হোটেল কর্তৃপক্ষকে খবর দেয় হোটেলবয়। নিরাপত্তাকর্মীরা এসে দরজা ভেঙে আবিস্কার করেন বব উলমারের নিথর দেহটা। সেই দেহে তখন প্রাণ নেই। জ্যামাইকার স্থানীয় পুলিশ বাহিনীও এসে পৌঁছেছে ততক্ষণে, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো বব উলমারকে, সেখানকার ডাক্তার নিশ্চিত করলেন, বেশ কয়েক ঘন্টা আগেই মারা গেছেন ভদ্রলোক।

খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। শোকে মূহ্যমান হলো ক্রিকেটবিশ্ব, সেই সঙ্গে হলো স্তম্ভিতও। কারণ ততক্ষণে বব উলমারের মৃত্যুটা রহস্যে পরিণত হওয়া শুরু করেছে। আগের দিনের আয়ারল্যান্ডের কাছে পাকিস্তানের হারের সঙ্গে প্রবীণ এই কোচের মৃত্যুর যোগসূত্র খুঁজতে শুরু করে দিয়েছে মিডিয়া। চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে জ্যামাইকার স্থানীয় পুলিশের পক্ষ থেকে শুরুতে জানানো হলো, হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয়েছে উলমারের। কিন্ত পরে আগুনে ঘি ঢাললো তাদেরই করা পাল্টা মন্তব্য, জ্যামাইকান পুলিশ জানালো, এটা কোনভাবেই স্বাভাবিক মৃত্যু হতে পারে না, তাদের চোখে ঘটনাটা পরিস্কার হত্যাকাণ্ড। শুরু হলো জল্পনা-কল্পনা, কে খুন করেছে বব উলমারকে? নির্বিবাদী এই লোকটাকে মেরে কার কি লাভ? 

এই হোটেল রুমেই মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল বব উলমারকে

একদিন পরেই শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলো ভারতও। দুই হট ফেবারিটের কেউই নেই টুর্নামেন্টে, তার ওপরে বব উলমারের এমন মৃত্যু- বিশ্বকাপের আমেজটাই যেন কোথায় গায়েব হয়ে গেল নিমেষে! খুন না স্বাভাবিক মৃত্যু- এই প্রশ্নে তখন দ্বিধাবিভক্ত সবাই। তদন্ত করছিল স্থানীয় পুলিশ এবং গোয়েন্দারা, তাদের সঙ্গে যোগ দিল স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড এবং ইন্টারপোলও। হত্যাকাণ্ডের পক্ষে বিশ্বাসীদের সংখ্যা তখন বাড়ছে ধীরে ধীরে।

একেকজন একেক থিওরির জন্ম দিচ্ছেন, কেউ বলছেন খাবার বা পানীয়তে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে খুন করা হয়েছে উলমারকে। ড্রাগের ওভারডোজের মাধ্যমে উলমারকে হত্যা করা হয়েছে বলেও মত দিয়েছিলেন অনেকে। কেউ আবার বলছেন, গলা টিপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল পাকিস্তানের কোচকে। নাকে আর গালের চোট ধস্তাধস্তির ফলে সৃষ্টি হয়েছে। আবার হার্টঅ্যাটাকের ধাক্কায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েও এই চোট লাগাটা অস্বাভাবিক নয়। ময়নাতন্তের ফলাফল হাতে না পাওয়ায় নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছিল না কিছুই।

কিন্ত বব উলমারকে কে খুন করবে? কেনই বা করবে? তার সঙ্গে তো কারো সরাসরি কোন বিবাদ ছিল না, ছিল না কোন ব্যক্তিগত শত্রুতাও। হ্যাঁ, মান অভিমান হয়তো ছিল, কিন্ত সেজন্যে কেউ কাউকে খুন তো করে না। যে রাতে বব উলমারের মৃত্যু হয়, সেই ১৮ই মার্চ রাত সোয়া তিনটার দিকে নিজের ল্যাপটপ থেকে একটা মেইল পাঠিয়েছিলেন তিনি, তার মানে মোটামুটি শেষ রাত পর্যন্তই জেগে ছিলেন উলমার, বেঁচেও ছিলেন। তার মৃত্যুটা হয়েছে ভোররাত চারটা থেকে সকাল সাতটা-আটটার মধ্যে যে কোন সময়ে। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে পেগাসাস হোটেলের কক্ষে ঢুকে তাকে খুন করা কি সম্ভব? 

উলমারের জন্যে শোক পালন করছে ক্রিকেটবিশ্ব

চেক করা হলো হোটেলের করিডোরে থাকা সিসিটিভির ফুটেজ। সেটাও বেশ ঝাপসা, ভালোভাবে পরীক্ষার জন্যে সেই ফুটেজ পাঠানো হলো ইংল্যান্ডে। সেখান থেকে জানানো হলো, সেই রাতে বব উলমারের কক্ষে বাইরে থেকে দরজা দিয়ে কেউ ঢোকেনি, উলমারও কামরা থেকে বের হননি। তবে ৩৭৪ নম্বর রুম, যেটায় বব উলমার ছিলেন, সেটার সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা গেছে পাকিস্তানের সহকারী কোচ মুশতাক আহমেদ, অধিনায়ক ইনজামাম উল হক এবং শহীদ আফ্রিদিকে। তারাও একই ফ্লোরে থাকা নিজেদের রুমের দিকে যাচ্ছিলেন বলেই মনে হয়েছে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের।

বাজীকর বা জুয়াড়িদের দিকেই সন্দেহের তীরটা প্রথমে গিয়েছিল। ক্রিকেট ম্যাচকে ঘিরে ফিক্সিঙের ইতিহাস তো নতুন কিছু নয়। বিশ্বকাপের মতো আসরের একটা ম্যাচকে ঘিরে বাজীকরেরা জাল পেতে বসবেন, সেটাও স্বাভাবিক। আয়ারল্যান্ডের কাছে পাকিস্তানের হেরে যাওয়াটা ভীষণই অপ্রত্যাশিত ছিল, অনেক বাজীকর আর জুয়াড়ি প্রচুর টাকা হেরেছিল এই ম্যাচটায়। তাদের কেউ যদি বব উলমারের ওপর শোধ তুলতে চায়, তাতে অবাক হবার কিছু ছিল না। তাছাড়া বব উলমার নিজেও ক্রিকেটের ম্যাচ ফিক্সিঙের ওপর একটা বই লিখছিলেন তখন। দুইয়ে দুইয়ে চার মেলানোর চেষ্টা করছিল তদন্তকারী সংস্থাগুলো। বব উলমারের মৃত্যুর পেছনে দাউদ ইব্রাহিমের হাত আছে কিনা, সেটাও খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন তারা।

সন্দেহের রাডার থেকে বাইরে ছিলেন না পাকিস্তানের খেলোয়াড়েরাও। অধিনায়ক ইনজামাম থেকে শুরু করে আফ্রিদি কিংবা ইউনিস খান, সবাইকেই একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে জ্যামাইকান পুলিশ এবং ইন্টারপোলের কর্তাব্যাক্তিরা। পাকিস্তান দলের দেশে ফেরাও পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল তদন্তের কারণে। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটায় মাত্র ১৩২ রানে অলআউট হয়েছিল পাকিস্তান দল, দশটা উইকেটের সবগুলোই ছিল ক্যাচ আউট। এমন একটা থিওরি তখন জন্ম নিয়েছিল যে, কোচের চোখের আড়ালে হয়তো ফিক্সিঙে জড়িয়ে পড়েছিল পাকিস্তানের খেলোয়াড়েরা। সেটা জেনে ফেলাতেই খুন হতে হয়েছিল বব উলমারকে। তবে সেটা প্রমাণ মেলেনি শেষমেশ। 

বব উলমারের মৃতদেহ নিয়ে আসা হচ্ছে বিমানে করে

ময়নাতদন্তের ফলাফলে অবশ্য খুন, শ্বাসরোধ, বিষপ্রয়োগ বা ধস্তাধস্তির কোন তথ্যই আসেনি। প্রায় দেড় মাস ধরে বব উলমারের মৃতদেহ রাখা হয়েছিল জ্যামাইকার কিংস্টনের হাসপাতালের মর্গে। পরিবারের সদস্যদেরও উলমারের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে জ্যামাইকায় আসতে দেয়া হয়নি, তাদের বলা হয়েছিল, তাদের জীবনের ওপরেও হামলা হতে পারে। দেড় মাস পরে চিরনিদ্রায় সমাহিত হয়েছিলেন বব উলমার, সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন একগাদা প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর মেলেনি আজও। বব উলমারের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, তদন্তের প্রক্রিয়া নিয়ে তারা সন্তুষ্ট নয়, তবে জ্যামাইকার পুলিশের ওপর কোন অভিযোগও নেই তাদের।

কথিত আছে, জ্যামাইকা এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের জাতীয় ভাবমূর্তিতে কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া না ফেলতেই তড়িঘড়ি করে বব উলমারের মৃত্যুরহস্যের দায়সারা সমাধান করা হয়েছিল, স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল ঘটনাটাকে। ম্যাচ ফিক্সিঙের দায়ে অভিযুক্ত এবং ক্রিকেট থেকে নির্বাসিত দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটার হ্যান্সি ক্রোনিয়ে তো উলমারেরই সাবেক শিষ্য এবং প্রিয়পাত্র ছিলেন। হ্যান্সি ক্রোনিয়ের মৃত্যুটাও তো একটা রহস্য হয়ে আছে, শিষ্যের মতো উলমারও কি এমন কোন ‘পাতানো’ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন? স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের এক তদন্তকারী কর্মকর্তা তখন বলেছিলেন, বব হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, এই বিষয়ে তিনি নিশ্চিত, কিন্ত যথাযথ প্রমাণটা কারো পক্ষেই কখনও হাজির করা সম্ভব হবে না। এটা কি সিরিয়াস কোন বক্তব্য ছিল, নাকি নিছক হেঁয়ালি, সেটাও ব্যাখ্যা করেননি সেই কর্মকর্তা। বব উলমারের মৃত্যুটা তাই ক্রিকেটেরই অমীমাংসিত একটা রহস্য হয়ে আছে, যে রহস্যের সমাধান হয়তো কখনোই হবে না আর।

আরও পড়ুন- 

Comments

Tags

Related Articles