ইনসাইড বাংলাদেশরাজনীতি নাকি জননীতি

আগাগোড়া পুরো দলটাই কি চুরি করা শিখলো?

গতকাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এর সমাবেশ ছিল। যদিও ঐক্যফ্রন্টের সম্মিলিত সমাবেশ, কিন্তু সেখানে বেশিরভাগ ব্যানার, ফেস্টুনেই ছিল খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি। খালেদা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি। যেই মামলায় সাজা পাওয়ার তালিকায় আছে তারেক রহমানও।

দুর্নীতি শব্দটার সাথে বিএনপি কিংবা এর নেতাদের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। দুর্নীতিকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন ক্ষমতায় থাকতে। দুর্নীতিতে দেশকে তিনবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার রেকর্ডটাও যে তাদের দখলে। যে দলের শীর্ষনেতাদের দুর্নীতিপ্রবণ মনোভাব, সেই দলের কর্মীরা আসলে ভাল কিছু শিখবেন কার থেকে? সেই অশিক্ষার অভাবটা, রাজনৈতিক দৈন্যদশা যেন দিন দিন আরো প্রকট হয়ে ফুটে উঠছে। গতকালই যেমনটা দেখা গেল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায়। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদল ব্যানারে তো আস্ত একটা স্লোগান চুরি করে ফেললো!

“যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ
যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তবে তুমি বাংলাদেশ”

এই স্লোগানের নিচে লেখা তারেক রহমান। অর্থাৎ, এই স্লোগানটির আবিষ্কারক তারেক রহমান, এটা তারেক প্রচলন করেছে, কিংবা এটা তারই কোনো উক্তি। ব্যানারে স্লোগান যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তাতে তা-ই মনে হয়েছে। হায়রে, যুবদল! নেতিয়ে পড়া নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করতে একটা গোটা স্লোগান চুরি করে তারেকের নাম বসিয়ে দেয়া হলো, এটা কেমন ধারার রাজনীতি?

উল্লেখ্য, এই লেখাটি নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় ব্যবহৃত হয়েছিল সর্বপ্রথম। কিশোর শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে যে আন্দোলন করেছিল সেখানেই কেউ একজন প্রথম প্লেকার্ডে এই লেখাটি নিয়ে আসে। তারপরই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয় এই স্লোগানটি। বাংলাদেশের অন্যতম ক্রিয়েটিভ একটি আন্দোলন ছিল কিশোরদের সেই নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। অসংখ্য সুন্দর মুহুর্তের স্বাক্ষী হয়েছিল বাংলাদেশ, আমরা দেখেছি অনেক অনেক অসাধারণ স্লোগান, উক্তি, লেখা। সেই আন্দোলনের জনপ্রিয় স্লোগানটাই চুরি হলো এবার বিএনপির সমাবেশে। একটা স্লোগান অনেকে ব্যবহার করলে তাতে জাত যায় না।

আমি যেমন মনে করি, জয় বাংলা একটা সার্বজনীন স্লোগান। কারো সম্পত্তি নয়। সবাই দিতে পারে। এখন কেউ যদি জয় বাংলা স্লোগান লিখে নিচে উল্লেখ করে এটা তারেক রহমান কিংবা জিয়াউর রহমানের বাণী তাহলে, সেটা কি মানাবে? মানুষ হাসাহাসি করবে। কারণ, একটা জনপ্রিয় স্লোগান কোনো ব্যক্তিবিশেষের নামে চালিয়ে দেয়া যায় না। এগুলো শিশুতোষ কাজ। ফেসবুকে যেমন দেখি, আমরা দুই লাইন লেখার মুরোদ নেই, আরেকজনের লেখা কপি করে নিজের নামে চালিয়ে দেয় অনেক লেখাচোর, এরকম কাজ করলো যুবদল। নিজেদের অচল মাথা থেকে মাথা খাটিয়ে সুন্দর কোনো লেখা বের হয় না, তাই নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের লেখাটাই কপি করে, একদম নগ্নভাবে নকল করে নিজেদের চুরির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত নেতার নামে চালিয়ে দিলো। যে লোকের নামে চালিয়ে দেয়া হলো সেই তারেকের নামেই দুর্নীতি, চুরির অভিযোগের শেষ নেই। ক্ষমতায় থাকাকালীন সে হয়ে উঠেছিল হাওয়া ভবন সম্রাট। উইকিলিকসের গোপন নথিও ফাঁস হয়েছিল তারেকের দুর্নীতির খবর দিয়ে।

তারেক রহমানের যে বিভিন্ন দুর্নীতির মামলার রায়ে কত বছরের জেল, জরিমানা হয়েছে সেটা মনে হয় তিনি নিজেও গুণে শেষ করতে পারবেন না। এখন তার কাজ লন্ডনে বসে উড়ো উড়ো কথা বলা। আর সুযোগ পেলে আন্দোলন চুরির ফর্মূলা দেয়া। কোটা আন্দোলনে যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে ফোন দিয়ে আন্দোলনকে বিএনপির পক্ষে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন। সেই আলাপও ফাঁস হয়৷

বিএনপি তাদের নিজস্ব আন্দোলন ঠিকভাবে করতে পারে না। তাদের ঝটিকা মিছিল হয় ভোরের অন্ধকারে। তাদের অনশন কর্মসূচী হয় নাখাভুখা কর্মীদের খাদ্য উৎসব। যেহেতু নিজেরা আন্দোলন করতে পারে না, তাই দেশে কোনো জনসমর্থিত আন্দোলন হলে তারা সেই আন্দোলন নিয়ে বিচিত্র মন্তব্য দিয়ে নিজেদের কন্ট্রিবিউশন দেখাতে চায়। বস্তুত তাদের এইসব সমর্থন যতটা না আন্দোলনে কাজে লাগে, তারচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় সাধারণ আন্দোলনকারীরা। বিএনপি এখন স্বপ্নবিলাসী দল হয়ে গেছে। কেউ আন্দোলনে নামলেই তারা ভাবে এই আন্দোলন কোনোভাবে যদি কাজে লাগানো যায়। এটাকে সরকারবিরোধী আন্দোলন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে তারা উঠে পড়ে লাগে।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেও তারা একই কাজ করেছে। তারা বিবৃতি দিয়েছিল, তারা নাকি মাঠে নামলে সরকার পালিয়ে যাবে। অবশ্য, তারা কেন মাঠে নামতে পারে না তা জানা যায় না, হাজার বছর ধরে তারা ঈদের পরে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে নিজেরাই ভুলে যায় ঈদ কবে যায়, কবে আসে! তাই বিভিন্ন আন্দোলন নিয়ে তাদের তামাসা দেখলে হাসি পায়।

আজকাল নির্বাচনকে সামনে রেখে ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে তারা বিভিন্ন কর্মসূচীর দেয়ার চেষ্টা করছে। তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশ ছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এতদিন তারা অন্যের আন্দোলন চুরি করার চেষ্টা করতো, এখন তারা আন্দোলনের স্লোগান, লেখা চুরি করা শুরু করেছে। নিরাপদ সড়কের ন্যায্য সেই আন্দোলন, মেধাবী কিশোরদের হৃদয় থেকে উৎসারিত লেখা তারা চুরি করে নাম বসিয়ে দিয়েছে চুরি, দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত তারেক জিয়ার নামে।

সত্যিই সেলুকাস, এর চেয়ে বেশি আর কি আশা করা যায় তাদের কাছ থেকে? বিএনপির নেতাকর্মীদের এসব কান্ডকারখানা দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, আগা থেকে গোড়া পুরো দলটাই কি চুরি করাই শিখলো তবে?

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles