ভিনদেশে অচেনা মানুষদের মাঝে জন্মদিন উদযাপনের গল্প!

Ad

১৮ ই নভেম্বর ছিল আমার জন্মদিন । আমি সে সময় অফিসের কাজে ডেনমার্কে । ১৬ তারিখে শেষ হওয়া কনফারেন্সে বিভিন্ন দেশ থেকে মোট যে ১১ জন আমরা গিয়েছিলাম, তার ১০ জনই ১৭ তারিখ দুপুরের ভেতরেই যার যার দেশের পথে রওনা হয়ে গিয়েছে; বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আর একখানা ট্রেইনিং বাকী আছে বলে আমাকে একা একা রয়ে যেতে হয়েছে আরোও প্রায় সপ্তাহখানেকের জন্য। ১৭ তারিখ অফিস সেরে হোটেলে ফিরে একটু একটু মন খারাপ হচ্ছিল । এমন নয় যে দেশে থাকলে জন্মদিনে বিশাল কোন আয়োজন হত, কিন্তু অন্তত রাত বারোটার সময় অর্ধাংগিনী আর কন্যা মিলে উইশ করতে ভুলত না; আর সাথে অবশ্যই থাকত কোন না কোন সারপ্রাইজ গিফট্ আর কন্যার হাতে বানানো কার্ড আর চিঠি ! এবার রাত ১২ টায় এসবের কিছুই পাব না । এমনকি বান্ধববিহীন এই বিদেশী শহরে রাত বারোটায় বার্থডে উইশ করারও কেউ নেই ! হোটেলে কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে থেকে ভাবলাম মন খারাপ করেই বা কি হবে, বরন্চ একটু হেঁটে আসা যাক, সাথে ডিনারটাও সেরে নেয়া যাবে ।

স্থানীয় এক রেস্টুরেন্টে ডেনিশ রেসিপিতে পাহাড়ী হাঁসের মাংশ দিয়ে তৈরী একটা ডিশ দিয়ে ডিনার সেরে হাঁটতে বেরুলাম । বাইরে কনকনে ঠান্ডা – তাপমাত্রা ২-৩ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড । রাস্তাঘাটে লোকজন তেমন একটা নেই বললেই চলে । তবে ডেনমার্ক রীতিমত ক্রাইম-ফ্রী দেশ বলে গভীর রাতে সম্পূর্ণ একা একা হাঁটতে একটুও ভয় লাগে না । আর ওদের জন্য অনেক বড় শহর হলেও, অরহুস শহরটা আমাদের দেশের তুলনায় বলা যায় ছোট্ট ছিমছাম নিরিবিলি এক শহর । ৫০০ বছরের পুরানো চার্চ, পাথর বিছানো খোলামেলা চত্বর, লাল রংগা টালি আর লালচে ইটের ছোট ছোট কাঠের ঘরবাড়ি – সামনে ক্রিসমাস বলে বেশীর ভাগ বাড়ির জানালায় ছোট ছোট ল্যাম্প সারা রাত ধরে জ্বলে, ছোট ছোট চমৎকার সব আলোজ্বলা দোকান, শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা ছোট্ট খাল, তার দুপাশে গড়ে ওঠা ছিমছাম সব ক্যাফে – সবকিছুতেই একটা সেই পুরোনো ইউরোপের ছাপ; হঠাৎ হঠাৎ মনে হয় যেন একলাফে দু-তিনশ’ বছর পেছনে চলে এসেছি !

নিরিবিলি জনশূণ্য টুকটাক আলোজ্বলা রাস্তায় হাঁটতে দারুণ লাগছিল ! আমিও কয়েকপ্রস্থ মোটা জ্যাকেট, বুটজুতো, ক্যাপ-কানটুপি, হাতমোজা ভাল করে চাপিয়ে হেঁটে হেঁটে বেড়াচ্ছিলাম কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই – অলিগলি যেদিকে ভাল লাগছিল । পকেটে গুগল ম্যাপ আছে – হারিয়ে যাবার ভয় নেই । হাঁটতে হাঁটতে প্রায় সাড়ে এগারোটার কাছাকাছি – মনে হলো কোথাও একটু বসতে পারলে খারাপ হতো না । আর এতক্ষণ হেটে বেড়ালেও প্রচন্ড ঠান্ডায় এক কাপ গরম কফির জন্য মনটা আনচান করছিল । কিছুক্ষণ পর দেখলাম খালের পারে একটা ক্যাফে থেকে তখনোও আলো আর শব্দ ভেসে আসছে । ঢুকে গেলাম ।

পাব-কাম-ক্যাফেটা বেশ জমজমাটই বলা চলে – সেই রাতেও বেশ কিছু লোকে ভরা । সাথে দেখলাম এক কোনায় বসে কয়েকজন লোক আর মহিলা মিলে নানা ধরণের ইন্স্ট্রুমেন্ট নিয়ে মিউজিক বাজাচ্ছে । কিছু ইন্স্ট্রুমেন্ট আমার চেনা যেমন ভায়োলিন, গিটার কিন্তু কিছু আবার অদ্ভুদ দেখতে । তবে সব মিলিয়ে সুরটা দারুণ উঠছিল । মনটা খারাপ থাকলেও একমগ কফি নিয়ে কোণার এক টেবিলে চুপচাপ ওদের সুর উপভোগ করতে বসে গেলাম । ছোট্ট একটা ভিডিও আছে ক্যাফেতে ভেতর বসে মোবাইলে রেকর্ড করা । চাইলে দেখে আসতে পারেন এখান থেকে –  

“ইয়ো ব্রো, তোমার কি মন খারাপ নাকি?” কফির মগ হাতে নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম; অদ্ভুৎ বাচন ভংগীর এই ডাক কানে যেতে কিছুটা অবাক হয়েই মুখ ঘুরালাম, কারণ প্রথমত: বাচনভংগীটা ঠিক ইউরোপীয়ান না, আর দ্বিতীয়ত: ডেনিশরা সাধারণত অচেনা কাউকে হঠাৎ করে এমনভাবে কিছু জিজ্ঞাসা করে না । যা ভেবেছি তাই । আফ্রিকান এক লোক টেবিলের পাশে রীতিমত আমার দিকে কৌতুহলী দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে । তিরিশের কাছাকাছি বয়স হবে । হালকা হেসে বললাম “না, মন ঠিক খারাপ না । তবে একটু Gloomy ফিল করছি।” এইবার পাশের চেয়ারে বসে পড়ে গল্প জমাবার ভংগীতে বলল “কি হয়েছে বলো? Gloomy কেন?” কিছুটা বিব্রত হলেও একটু দো-মনো করে জন্মদিনের ব্যপারটা বলেই ফেললাম । হা হা হা করে সেই বিখ্যাত আফ্রিকান টাইপের দিল খোলা হাসি দিয়ে বলল “এই ব্যাপার ! দাঁড়াও তোমার মন ভাল করে দিচ্ছি ।” বলেই বার থেকে একটা খালি গ্লাস নিয়ে চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে গেল ।

টুংটুং করে কয়েকবার গ্লাস বাজিয়ে সবাইকে থামিয়ে দিয়ে রীতিমত ঘোষণা দেয়ার ভংগীতে বলল “আমি কেনিয়া থেকে এসেছি । শুনেছি ডেনমার্ক নাকি পৃথিবীর সুখীতম মানুষের দেশ । কিন্তু আমার তো মনে হয় তোমরা লোক ভাল না !”

শুনে আমার আক্কেলগুড়ুম ! ব্যাটা মাতাল না কি ! বলে কি ! ক্যাফে ভর্তি ডেনিশদের সাথে দাংগা বাঁধাবে না কি !

“কেন কেন? আমরা লোক ভাল না এ ধারণা হলো কেন তোমার?” – স্বাভাবিকভাবেই বেশ কয়েকজন ডেনিশের প্রশ্ন !

“সুখীতম মানুষের দেশে একজন মানুষ যার কিনা আর পাঁচ মিনিট পর জন্মদিন, সে মুখ গোমড়া করে বসে আছে তাকে উইশ করার কেউ নেই বলে, আর তোমরা কিছুই করছো না ! তোমাদের ভাল লোক বলি কিভাবে বল ?” কেনিয়ান ব্যাটার উত্তর ।

স্বাভাবিক ভাবেই “কই সেই লোক, বলো তো ?” পাবের ভেতর সমবেত চিৎকার ।

এইবার সে চেয়ার থেকে নেমে টেবিলের কাছে এসে আবারোও সেই নাটুকে ভংগীতে আমাকে দেখিয়ে বলল “এই যে সে !”

আমার তো তখন রীতিমত চরম বিব্রত হবার পালা ! সারা পাবের লোক তাকিয়ে আছে আমার দিকে ! সার্কাস না কি !

তারপর আর কি ! সবাই মিলে গ্লাস উঁচু করে সমস্বরে রীতিমত চিৎকার করে আমাকে ‘হ্যাপি বার্থ ডে’ জানানো হলো, সাথে বেহালা আর গিটারে ‘হ্যাপি বার্থ ডে’ সুর ! বার টেন্ডার আমার জন্য ঘোষণা দিল কমপ্লিমেন্টারী বার্থ-ডে ড্রিংক্স ! অপ্রত্যাশিত পুরো ব্যপারে আমি কিছুটা হতভম্ব এবং সাথে অদ্ভুৎ এক আনন্দে মনটা সত্যিই ভিজে উঠল !

পরে আলাপ করে জানলাম পাগলাটে এই আফ্রিকান লোকটার নাম ‘রেগান ওদৌর নেয়াচিয়েংগা’ – ছবিতে যাকে গলাগলি ধরে দেখতে পাচ্ছেন। কেনিয়ার মানুষ। পড়াশোনা শেষ করে দিব্যি ভাল জায়গায় চাকরী করছিল। বিয়ে থা করেনি। শখের বসে আফ্রিকার একধরণের বাদ্যযন্ত্র বাজায়; অনেকটা আমাদের দেশের ঢোলের মতো। হঠাৎ একদিন মাথায় বেগবাই চাপল চাকরী-বাকরী তো সারাজীবন করা যাবে, আগে একটু দুনিয়াটা ঘুরে দেখা যাক। ব্যাস, জমানো টাকাপয়সা আর গলার সেই ঢোলখানা ঝুলিয়ে বের হয়ে পড়েছে। গ্রীস-ইতালী-জার্মানি-পর্তুগাল- হয়ে এখন দুমাস ধরে আছে ডেনমার্কে; এরপর যাবে নরওয়ে, সেখান থেকে ফিনল্যান্ড হয়ে রাশিয়া, তারপর চায়না হয়ে ভারতে! বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন মিউজিশিয়ান আর গানের দলের সাথে ঘুরে বেড়ায়! মনে মনে বললাম “বেঁচে থাকো বাবা, যদিও কিন্তু দারুণ হিংসা হচ্ছে তোমাকে!”

মানুষই মনে হয় একমাত্র প্রাণী যে কিনা সম্পূর্ণ অজানা-অচেনা কাউকে এমন ভাবে অপ্রত্যাশিত আনন্দ উপহার দিতে পারে! সৃষ্ঠিকর্তাও কি অদ্ভুৎভাবেই না আমাদের জন্য জীবনের আঁনাচে-কানাচে খুশীর ব্যবস্থা করে রাখেন! কে জানতো বিদেশ-বিভুইয়ে এভাবে আমার এবারের জন্মদিনের প্রথম প্রহরটা উদযাপন হবে এভাবে – সম্পূর্ণ অচেনা এক দংগল মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়ে ! জীবনের গল্পগুলো মাঝে মাঝে কি অদ্ভুতই আর অপ্রত্যাশিতই না হয়!

 

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (3 votes, average: 4.33 out of 5)
Loading...
Ad

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

Ad