বিপুল চাকমা: এক সন্তানের দৃঢ় সংকল্প

dewanপুরো বাংলাদেশের অংশ হওয়া সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন বিচ্ছিন্ন এক জনপদ। ১৯৯০ এর গণঅভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র শাসনে প্রবেশ ঘটলেও এটি যেন পড়ে আছে এখনো ৮০ দশকের সময়ে, যেন জলপাই উর্দিপড়া কিছু শাসনের হাতেই সব কিছু বন্দী। মিডিয়া-স্থানীয় প্রশাসন-জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে হত্যা-ধর্ষণ, সাধারণ পাহাড়িদের জমি বেদখল সবকিছুতেই প্রভাবশালী পক্ষ স্পষ্ট-অস্পষ্টভাবে মদদ দিয়ে থাকে।

পাহাড়ের সামরিকতন্ত্র এ রাষ্ট্রের কাছে আজ এক ওপেন সিক্রেট ইস্যু। পর্যটন খাত, ক্যান্টনমেন্ট থেকে শুরু করে আরো বিভিন্নভাবে জমি দখল অব্যাহত রয়েছে পাহাড়ে। পাহাড়ি নারী ধর্ষণ এখন সবচেয়ে সহজলভ্য একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সে সাথে গণহত্যা-কল্পনা চাকমার অপহরণের ঘটনাগুলো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের জ্বলন্ত সাক্ষী হিসেবে পাহাড়ের ইতিহাসে লেখা রয়েছে। আর যদি এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠেন, এর বিরুদ্ধে মাঠে দাঁড়িয়ে যান, বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে স্লোগান দেন, তবে আপনি হয়ে পড়েন দেশদ্রোহী।

bipul-1এইরকম দেশদ্রোহীতার একটি ধোঁয়া পুরো বাংলাদেশের মানুষের সামনে তুলে রাখা হয়েছে। দেশের একটি বড় অংশ মনে করে, পাহাড়িরা ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশটাকে কেটে আবার রক্তাক্ত বানাতে চায়। কিন্তু পাহাড়ি সংগঠনগুলো এবং জনসাধারণরা কখনোই পাহাড়কে বাংলাদেশের বাইরে মনে করেনি, বরং বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে বারবার। কিন্তু পাহাড়ের উপর চাপিয়ে দেয়া অন্যায় তারা মেনে নেয়নি। তাই পাহাড়ের জনগণ আজো বারবার মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় এবং যতদিন তাদের সত্যিকার মুক্তি না আসবে, নিজেদের অধিকার না পাবে ততদিনই তারা দাঁড়াবে বন্দুকের সামনে।

শাসকগোষ্ঠী তা জানে আর তাই পাহাড়ের প্রতিবাদী সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীদের নামে দিয়ে রেখেছে মামলার বিশাল সারি। এমন একটি মামলায় (যা আবার কুখ্যাত ৫৭ ধারা) গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ইউপিডিএফ নেতা মিথুন চাকমা। সম্প্রতি তাকে জামিনে মুক্তি দেয়া হয়। এরপরেই গ্রেপ্তার করা হয় পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বিপুল চাকমাকে।

bipul-2২০১৩ সাল থেকে আজ অবধি তার নামে মোট ১৭টি মামলা দায়ের করা হয়। খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা শাখার পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পুলিশ, আর্মির ব্রিগেড কমান্ডারদের কাছে তার পরিচয় ঘটে। ফলে ব্যক্তিগতভাবে সৎ, সংঘর্ষবিরোধী, নম্র এবং সাংগঠনিকভাবে সুষ্ঠু রাজনীতির একজন ছাত্রনেতা হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন মামলায় তার নাম জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে তিনি বাংলা কলেজের একজন ছাত্র। পড়াশোনা এবং সাংগঠনিক কর্মকান্ডের কারণে তিনি প্রায় দেড় বছর ঢাকায় অবস্থান করেছেন। কিন্তু তখনও খাগড়াছড়িতে ঘটমান বিভিন্ন ঘটনায় তার নাম মামলায় দেয়া হতো। এভাবে প্রায় ১৭টি মামলায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

গত ২৩ অক্টোবর বিপুল চাকমা তার ক্যান্সারে আক্রান্ত অসুস্থ মাকে নিয়ে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন ভাড়া করা গাড়িতে করে। সকালের দিকে বিপুল তার মা-বাবার সাথে রওনা দেন নিজ বাড়ি খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার লোগাং হতে, যে লোগাং ১৯৯২ সালে পাহাড়ের সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনাস্থল হিসেবে খুবই পরিচিত। পথে তার অসুস্থ মা রক্তবমিও করছিলেন। পথে পানছড়ি পুলিশ থানার সামনে তাদের গাড়ি আটকানো হয়। এরপর পানছড়ি থানার ওসি জব্বার বিপুলকে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ করতে শুরু করে। তখন বিপুল তাকে অনুরোধ করেন যেন অসুস্থ মায়ের সামনে তাকে এভাবে অপদস্থ করা না হয়।  কিন্তু পুলিশ তার অনুরোধ উপেক্ষা করে তাকে টেনে-হিঁচড়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে থানায় আটক করে। এরপর আধাঘন্টা পর খাগড়াছড়ি সদর থানায় তাকে হস্তান্তর করা হয়। এদিকে অসুস্থ মা তার একমাত্র ছেলে সন্তানের প্রতি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর আচরণ দেখে আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাই চট্টগ্রাম যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে তাকে ভর্তি করানো হয়।

bipul-3এদিকে বিপুল চাকমার আটকের খবর পেয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ওসির সাথে দেখা করতে গেলে বিপুল দৃঢ়কণ্ঠে তাদের বলেন, গ্রেপ্তার যখন করা হয়েছে তখন জেলে নিয়ে যাক। আপনারা শুধু আমার মাকে একটু দেখবেন।  কিন্তু তাঁর মা নীরুদেবী চাকমা  তার অসুস্থতার পাশাপাশি ছেলের প্রতি এমন আচরণকে সহ্য করতে পারেননি। আর তাই সেদিনই রাতে তিনি মারা যান।

২৫ তারিখ নিরুদেবী চাকমার শেষকৃত্য সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত হলে পুলিশ মানবিক কারণে বিপুল চাকমাকে ৭ ঘন্টার প্যারোলে মুক্তি দেয়। কিন্তু তাঁকে এমনভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যেন কোন এক ফাসিঁর আসামিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হাতকড়া বাঁধা, তার সাথে লম্বা একটা দড়ি। দড়ির এক প্রান্তে পুলিশ দাঁড়িয়ে। পায়ে দান্ডাবেরি ও গায়ে বুলেটপ্রুপ জ্যাকেট পরিহিত অবস্থায় বিপুলকে তার মায়ের মুখ শেষ বারের মতো দেখার সুযোগ করে দেয় পুলিশ। সেই সাথে তিনগাড়ি পুলিশ, দুই গাড়ি বিজিবি সশস্ত্রভাবে তারঁ বাড়ির আশেপাশে অবস্থান নেয়। একই সাথে খাগড়াছড়ি সদরের উপজেলা এলাকা, খবংপুড়িয়া, স্বনির্ভর বাজার (পাহাড়ি গ্রাম) এলাকায় সেনাবাহিনী সশস্ত্র টহল দিতে শুরু করে।

কী অমানবিক! কী নিষ্ঠুরতা! কী বর্বরতা!

অসুস্থ মায়ের সামনে থেকে সন্তানকে তুলে নিয়ে এরপরে মায়ের মৃতদেহকে শেষ দেখার সুযোগ করে দেয়া, এ যেন এক দুঃস্বপ্ন। কিন্তু বিপুল চাকমা দমেননি, মৃত মায়ের দেহের সামনে দাঁড়িয়ে চোখে অশ্রু ও বুকে আগুন নিয়ে তিনি বলেন,

‘আমি জেলে আছি। পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছে। তা নিয়ে আমার কোন আফসোস নেই। নির্যাযিতনিপীড়িত মানুষের পাশে থাকার প্রত্যয়ে রাজপথে থাকার সংগ্রামে যদি আমাকে ভোগান্তির শিকার হতে হয়, যদি সারা জীবনও আমাকে জেলের অন্ধ প্রকোষ্ঠে কাটাতে হয়, যদি আমার জীবনকেও উৎসর্গ করতে হয় তাকে আমি বরণ করে নেবো। নিয়ে আমার কোন আফসোস নেই। কিন্তু আফসোস একটাই, আমি আমার শেষ আশীর্বাদ নিতে পারলাম না। তার শেষ কথা আমি শুনতে পারলাম না। আমার মায়ের জন্যও আফসোস হয়, আমার মা শেষ বারের জন্য মা ডাকটি শুনতে পেলো না। আমার মা নেই, কিন্তু আমি মনে করি আমি যে পথের অনুসারী, আমি যে সংগঠনের হয়ে কাজ করে যাচ্ছি, এই আদর্শবাদী সংগঠনের একজন হিসেবে আমি রাজনীতিতে যুক্ত আছি, এই রাজনীতির পথে যদি আমি অবিচল থাকতে পারি তবে শুধু আমার মা কেন, পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি মা আমার পাশে থাকবে। আমার বা আমার পরিবারের যে কোন বিপদে তারা পাশে এসে দাঁড়াবে আশা আমি ব্যক্ত করছি’

বিপুল চাকমা প্রায় মাসখানেক ধরেই পাহাড়ে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাকেঁ খুঁজে পায়নি! প্রতিদিন খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে মা’কে নিয়ে আসা-যাওয়া করেছেন (বি.দ্র: খাগড়াছড়ি সদর থানা হাসপাতাল সড়কের পাশে অবস্থিত) কিন্তু তাঁকে কোথাও দেখা যায়নি! যখন গুরুতর অসুস্থ মাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখনই গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হঠাৎ করে তৎপর হয়ে যায়। এরপর পুলিশ অসুস্থ মায়ের সামনে তাকে গ্রেপ্তার করে এবং সবশেষে মায়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে প্যারোলে মুক্তি দেয়!

রাষ্ট্রের এই ঘৃণ্য কর্মকান্ড গোটা পাহাড়কে যেমন নিরুদেবী চাকমার জন্য কাঁদিয়েছে, আবার তেমনি প্রতিটি মানুষের বুকে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে যে ক্ষত কখনো শুকোবার নয়, যে ক্ষত সারবার নয়। বিপুল চাকমার চোখের অশ্রু আজ শুধু তাঁর একার নয়, সে অশ্রু পাহাড়ের প্রতিটি জনগণের। এভাবেই আজ পাহাড় নতুন এক নেতার জন্ম দেখলো। যে নেতা জনগণের, যে নেতা শুধু এক মায়ের নন, তিনি পাহাড়ের প্রতিটি মায়ের। যে নেতা মায়ের মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে জনগণকে মুক্তির স্বপ্ন দেখান! জনগণের পাশে থাকার কথা বলেন!

শুধু তিনি নন, তাঁর সাথে সাথে আজ পুরো পাহাড়ের প্রতিটি সংগ্রামী মানুষ দৃঢ় প্রত্যয়ে নিজেদের সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প করছে, নিজেদের অধিকার আদায়ের কথা বলছে, ১৩ টি জাতিসত্তার মুক্তির দাবি করছে। পাহাড়ের দীর্ঘ রাজনীতির সংগ্রামে এটি আরেক শুরু মাত্র, যার শেষ ঠিকানা একদিন ইতিহাসই ঠিক করবে।

 

(এই সাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। egiye-cholo.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে egiye-cholo.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।)

 

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-