গত কিছুদিন ধরেই সৌদি আরবে পালাবদলের একটা ঝোড়ো হাওয়া বইছে। রক্ষণশীল মুসলিম এই দেশটাতে অনেক কিছুই নিষিদ্ধের আবরণে ঢাকা ছিল অনেক বছর। বিশেষ করে নারীদের অধিকার কিংবা বিনোদন সংক্রান্ত ব্যপারগুলোতে বরাবরই পিছিয়ে ছিল সৌদি আরব। কিন্ত এখনকার অবস্থা বেশ ভিন্ন, দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে সবকিছু। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ক্ষমতায় আরোহন করার পর থেকেই শুরু হয়েছে এমন পালাবদলের খেলা।

নারীরা গাড়ি চালানোর অধিকার পেয়েছেন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া নারীরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারছেন, নাগরিকদের বিনোদনের কথা মাথায় রেখে সরকারীভাবে সিনেমা হল নির্মাণের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে সেদেশে। তবে ভিরমি খাওয়ার মতো খবরটা হচ্ছে, ইউরোপিয়ান দেশগুলোর আদলে বিকিনি বিচ তৈরী হচ্ছে সৌদি আরবে, যেটা মোটামুটি অকল্পনীয় বলা চলে! এই বিকিনি বিচে নারীরা বিকিনি পরে সানবাথ উপভোগ করতে পারবেন। যেখানে নারীরা বোরখা বা বড়সড় গাউন ছাড়া রাস্তায় বেরই হতে পারেন না, সেখানে বিকিনি বিচ নির্মাণের খবরটাকে আশ্চর্য্যজনকই বলতে হবে। গতবছর এক তরুণীকে দণ্ডিত করা হয়েছিল মিনিস্কার্ট পরে শুটিং করার অপরাধে, একারণে এই বিকিনি বিচের ঘোষণাটা আরও বিস্ময় হয়ে এসেছিল সবার কাছে।

গত আগস্টে এই ‘রেড সি রিসোর্ট’ পরিকল্পনার খসড়া বানানো হয়েছিল, এখন ডিজাইন আর কাগজ-কলমের হিসাব-নিকাশ চলছে, চলবে আরও কিছুদিন। পুরোদমে কাজ শুরু হবে ২০১৯ সালে। সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিম অংশে লোহিত সাগরের তীরে বড়সড় জায়গা নিয়ে তৈরী করা হচ্ছে এটি। ইউরোপিয়ান পর্যটকদের ঢলটা ধরার চেষ্টা করছে সৌদি আরব সরকার, সেকারণেই দেশকে পর্যটনবান্ধব করার পরিকল্পঞ্জা নেয়া হয়েছে। ইউরোপিয়ান পর্যটকেরা তো নিশ্চয়ই বিচে এসে বোরখা পরে ঘুরবেন না, আর একারণেই এই ‘রেড সি রিসোর্টে’র সৈকতে আইন-কানুনও শিথিল করা হচ্ছে। আবুধাবীর আদলেই একটা আলাদা পর্যটন জোন তৈরী করতে চাইছে সৌদি সরকার, ‘রেড সি রিসোর্ট’ সেই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় অংশ।

সৌদি আরব, বিকিনি বিচ, ক্রাউন প্রিন্স সালমান, রেড সি রিসোর্ট

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইউরোপ-আমেরিকার যেকোন সমুদ্র সৈকতের মতোই পর্যটকেরা এখানে সংক্ষিপ্ত পোষাক পরতে পারবেন। টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, এই রিসোর্টের সৈকতে আন্তর্জাতিক আইন বলবৎ থাকবে, সৌদি আরবের নিজস্ব আইনকানুন আখানকার জন্যে নয়।। তবে এই সুযোগটা শুধু রিসোর্ট সংলগ্ন এলাকার জন্যে প্রযোজ্য হবে বলেই জানা গেছে।

এদিকে বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, প্রতিবছর হজ করতে সারা বিশ্ব থেকে লাখ লাখ মুসলমান সৌদি আরবে যান, মক্কা আর মদীনায় ধর্মীয় আচার আনুষ্ঠানগুলো পালন করেন। সৌদি অর্থনীতির চাকা সচল রাখার একটা বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এই হজ প্রথা। ব্যপারটা সৌদি আরবের মানুষের কাছে এখন অনেকটা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এই দুই শহরের ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশী মুনাফা আয় করেন হজের ওই কয়টা দিনেই। তবে হজের আনুষ্ঠানিকতা শুধুমাত্র দুই-তিনটা শহরে সীমাবদ্ধ থাকায়, আর মাত্র দুই সপ্তাহের স্থায়ীত্ব হওয়ায় সৌদি আরব এখন শুধুই হজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে গেছে, সেটার প্রভাবে বড়সড় ধাক্কা লেগেছে সৌদি অর্থনীতিতে। তরুণেরা চাকুরিবিমুখ হওয়ায় সেই ধাক্কাটা সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে দেশটাকে। এজন্যেই সৌদি আরবকে পর্যটনবান্ধব দেশে পরিণত করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথটা সুগম করতে চায় সেদেশের কর্তৃপক্ষ। একারণে দেশের প্রচলিত আইন-কানুনের সঙ্গে আপোষ করতেও আপত্তি নেই তাদের। দেদারসে টাকাও ঢালা হচ্ছে এই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে।

সৌদি আরব, বিকিনি বিচ, ক্রাউন প্রিন্স সালমান, রেড সি রিসোর্ট

টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০১৯ সালে কাজ শুরু হয়ে সেবছরের মধ্যেই বিলাসবহুল হোটেল আর আবাসনের জায়গাগুলোর কাজ শেষ করা হবে, আধুনিকায়ন করা হবে বিমানবন্দরগুলোর। সৌদি আরবের শহর আমলাজ আর আল-জাওয়াহ এর মাঝখানে লোহিত সাগরে অবস্থিত প্রায় পঞ্চাশটি দ্বীপকে এই প্রজেক্টের জন্যে বাছাই করা হয়েছে, এখানেই বানানো হবে রিসোর্টগুলো। এই দ্বীপগুলো সমুদ্র উপকূলের খুব কাছাকাছিই অবস্থিত। ২০২২ সালের মধ্যে এইসব দ্বীপে রিসোর্টের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে। সৌদি সরকারের মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাদের লক্ষ্যমাত্রা ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতি বছরে এক মিলিয়ন(দশ লক্ষ) পর্যটকের আগমন নিশ্চিত করা।

ক্রাউন প্রিন্স সালমান তার ‘ভিশন-২০৩০’ ঘোষণা করেছিলেন গতবছর। সেই পরিকল্পনার অন্যতম চমক ছিল এই ‘রেড সি রিসোর্ট’। সৌদি অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এটা দারুণ একটা পরিকল্পনা, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্ত অতি রক্ষণশীল মানসিকতার সৌদি ধর্মীয় নেতারা এটাকে মোটেও ভালোভাবে নেননি। তাছাড়া জনসাধারণের সম্পৃক্ততা না থাকলে শুধু বিদেশী পর্যটক দিয়ে এই বিশাল ব্য্যবহুল প্রোজেক্ট চালানো সম্ভবও নয়। সৌদি নারীদের জন্যে সেখানে কি আইন বলবৎ থাকবে, সেটাও জানানো হয়নি এখনও।

তাছাড়া সৌদি আরবে মদ্যপান নিষিদ্ধ, ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকেই এই সিদ্ধান্ত। পর্যটক টানতে হলে ছাড় দিতে হবে এই ব্যপারটিতেও, এতে কোন সন্দেহ নেই। খোদ সৌদি আরবের মানুষজনই মনে করেন, ‘রেড সি রিসোর্ট’ পরিকল্পনাটি সফল হবে না শেষমেশ। তবে ফলাফল জানার জন্যে শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে। চমক দেখাতে তো ক্রাউন প্রিন্স সালমানের জুড়ি নেই।

তথ্যসূত্র- বিবিসি, টেলিগ্রাফ, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

Comments
Spread the love