ইতিহাস জানতে আমাদের বড্ড অনীহা যেন! কী হয়েছে আগে, এত কিছু জেনে কী লাভ! বাঁচতে হবে তো বর্তমান নিয়েই! কিন্তু রক্তে ভেজা এই স্বাধীন বাংলাদেশ পেতে যে হারাতে হয়েছে ৩০ লক্ষ প্রাণ! ৪ লক্ষ মা-বোনের আহাজারিতে ভারী হয়েছে এই জনপদের বাতাস। কী করে ভুলি আমরা নিজেদের এই শেকড়কে? আর তাই চলছে অন্যরকম বিজ্ঞানবাক্সের উদ্যোগে পাঁচ পর্বের কুইজ আয়োজন, ‘যেভাবে পূর্ব পাকিস্তান থেকে হলো বাংলাদেশ’। কুইজের মাধ্যমেই হোক ইতিহাসের পাঠ। আজ থাকছে তৃতীয় পর্ব। প্রথম পর্ব এই লিংকে। দ্বিতীয় পর্ব এই লিংকে

১। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সেপ্টেম্বর মাসে গঠিত বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রথম ইউনিটটির নাম কি ছিল?

১৯৭১ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর ভারত সরকারের দেওয়া ১টি পুরানো ডিসি-৩ বিমান, ১টি অটার বিমান ও ১টি অ্যালুয়েট-৩ হেলিকপ্টার নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ৫৮ জন বিমানসেনাকে একত্র করে গঠিত হয় একটি ইউনিট। নাম দেয়া হয় “কিলো ফ্লাইট”। স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ (ইনিও পরবর্তীকালের এয়ার ভাইস মার্শাল ও বিমান বাহিনী প্রধান) এর নেতৃত্ব পান।

২। নীচের তালিকায় থাকা শক্তিমান অভিনেতাদের ভেতর কে ছিলেন একাত্তরের দুর্ধষ আরবান গেরিলা দল ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলা?

বিখ্যাত অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ ছিলেন ক্র্যাক প্লাটুনের অন্যতম দুর্ধষ গেরিলা যোদ্ধা।

৩। রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল নিয়ে গঠিত মুক্তিযুদ্ধের ৬নং সেক্টরের নেতৃত্বে ছিলেন কোন সেক্টর কমান্ডার?

মুক্তিযুদ্ধের ৬ নং সেক্টরের নেতৃত্বে ছিলেন উইং কমান্ডার মোহাম্মদ খাদেমুল বাশার বীর উত্তম। পাকিস্তান বিমান বাহিনীর তিনিই একমাত্র বাঙালি বৈমানিক যিনি পাক ভারত যুদ্ধে ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে বোম্বার স্কোয়াড্রনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন৷ অসামান্য বীরত্ব দেখানোয় স্বয়ং পাকিস্তানীরাও তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছিল। তার নামেই ঢাকার বিমানঘাঁটির নামকরণ করা হয় 'বিএএফ বেস বাশার' । সূত্র: মেজর (অব.) ওয়াকার হাসান বীর প্রতীক, ১৯৭১ উত্তর রণাঙ্গনে বিজয়, আখতারুজ্জামান মণ্ডল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ০৬।

৪। মুজিবনগরে প্রবাসী সরকারের শপথ গ্রহণের পর সর্বপ্রথম গার্ড অফ অনার দেন কে?

প্রবাসী সরকারকে গার্ড অব অনার প্রদানের কথা ছিল সেক্টর কমান্ডার আবু ওসমান চৌধুরীর কিন্তু তিনি সময়মত তার দল নিয়ে পৌঁছতে না পারায় তার পরিবর্তে গার্ড অব অনার প্রদান করেন ক্যাপ্টেন মাহবুব উদ্দিন আহমেদ। পরে আবু ওসমান চৌধুরী অনুষ্ঠানস্থলে পৌছালে তিনি ২য় বার গার্ড অব অনার প্রদান করেন।

৫। মেহেরপুরের মুজিবনগরে ১৭ই মার্চ প্রতিষ্ঠিত অস্থায়ী স্বাধীন প্রবাসী সরকারের সচিবালয় স্থাপিত হয়েছিল কোথায়?

প্রথমে কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ৫৭/৮ বাড়িতে স্থাপিত হয়েছিল প্রবাসী সরকারের সচিবালয়। পরে একাত্তরের ২৫শে মে সার্কুলার রোডে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হলে প্রবাসী সরকারের সচিবালয় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় থিয়েটার রোডের ৮ নং বাড়িতে। বর্তমানে রাস্তাটির নাম শেক্সপিয়র সরণি।

৬। ১১ই মার্চ, ১৯৪৮ গ্রেফতার হওয়া ভাষা আন্দোলনের প্রথম কারাবন্দীদের একজন কে ছিলেন?

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই দাবিতে সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। এটাই ছিল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস তথা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এ দেশে প্রথম সফল হরতাল। হরতাল চলাকালে ঢাকায় সচিবালয়ের সামনে থেকে গ্রেফতার হন শেখ মুজিবুর রহমান, কাজী গোলাম মাহবুব, শামসুল হক, আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী, অলি আহাদ, শওকত আলী, খালেক নওয়াজ খান, নঈমুদ্দিন আহমদ, বায়তুল্লাহ, রণেশ দাস গুপ্তসহ আরো অনেকে।

৭। সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বিমান বাহিনীর দুর্ধর্ষ অভিযান ‘অপারেশন কিলো ফ্লাইট’-এর উপর ভিত্তি করে ‘ঢাকা অ্যাটাক’খ্যাত নির্মাতা দীপংকর দীপন একটি চলচ্চিত্র বানাবার ঘোষণা দিয়েছেন। চলচ্চিত্রটির নাম কি?

দীপন যে চলচ্চিত্রটি বানাতে চাচ্ছেন, তার নাম দেওয়া হয়েছে “ডু অর ডাই”। ‘অপারেশন কিলো ফ্লাইট’-এর বীর নায়কদের অন্যতম DHC3- OTTER বিমানের কমান্ডার ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শামসুল আলমের (বীর উত্তম) চরিত্র অবলম্বনেই সিনেমার প্রধান চরিত্রকে সাজানো হয়েছে। এই মহতী উদ্যোগের সঙ্গে আরো আছেন কিলো ফ্লাইট অপারেশনের অংশগ্রহণকারী চার যোদ্ধা ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ (বীর উত্তম), ফ্লাইং অফিসার বদরুল আলম (বীর উত্তম), ক্যাপ্টেন আব্দুল খালেক (বীর প্রতীক), ‍নূরুল হক (বীর প্রতীক)।

৮। কুষ্টিয়া ও যশোর জেলা, খুলনা জেলা সদর, সাতক্ষীরা মহকুমা এবং ফরিদপুরের উত্তরাংশ নিয়ে গঠিত মুক্তিযুদ্ধের ৮ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কে ছিলেন?

১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে আগস্টের ১৫ তারিখ পর্যন্ত এই বিশাল অঞ্চলে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন বীরযোদ্ধা মেজর আবু ওসমান চৌধুরী। পাকিস্তানের তৎকালীন ১৪তম প্যারা ব্রিগেডের ব্রিগেড মেজর, দুর্ধষ যোদ্ধা মেজর মঞ্জুর পাকিস্তানের শিয়ালকোট সেনানিবাস থেকে স্ত্রী-পরিজন নিয়ে পালিয়ে এলে আগস্টের ১৫ তারিখ থেকে পাকিস্তানীদের উপর আরো ভয়াবহ আক্রমণ চালাবার জন্য রণকৌশলে পরিবর্তনের অংশ হিসেবে সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব মঞ্জুরের উপর অর্পণ করা হয়। মেজর আবু ওসমান মেজর মঞ্জুরকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন।

৯। গোবিন্দ হালদারের রচনায় ও আপেল মাহমুদের সুরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম জনপ্রিয় ও অনুপ্রেরণাদায়ক গান নীচের কোনটি?

“মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি” গানটির রচয়িতা বিখ্যাত গীতিকার গোবিন্দ হালদার এবং সুরকার আপেল মাহমুদ।

১০। রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া এবং দিনাজপুর জেলার দক্ষিণাংশ নিয়ে গঠিত মুক্তিযুদ্ধের ৭ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কে ছিলেন?

৭ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর নাজমুল হক। এই সেক্টরে প্রায় ১৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করেন। নিয়মিত বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় আড়াই হাজার এবং সাড়ে বারো হাজার মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন গণবাহিনীর সদস্য। এই সেক্টরের আটটি সাব–সেক্টর ছিল। প্রতিটি সাব-সেক্টরের অপারেশনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকতেন। অনেক সময় তিনি নিজেই অভিযানে নেতৃত্ব দিতেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর বেঁচে ছিলেন তিনি মাত্র ছয় মাস। এই ছয় মাসে সাত নম্বর সেক্টরের অধীনে সমগ্র রাজশাহী, পাবনা ও বগুড়া জেলা, দিনাজপুর ও রংপুরের কিছু এলাকায় অসংখ্য অভিযান পরিচালনা করেন। ইপিআর সদস্য ও স্থানীয় যুবকদের সঙ্গে নিয়ে নওগাঁ ও বগুড়ার সেনা ক্যাম্পে হামলা করেন তিনি। শত্রুমুক্ত করেন সমগ্র বগুড়া জেলা। এরপর গ্রহণ করেন রাজশাহী ও চাপাইনবাবগঞ্জ মুক্ত করার পরিকল্পনা। কিন্তু তার আগেই ২৭ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পরিকল্পনাসংক্রান্ত শিলিগুড়িতে একটি বৈঠক থেকে ফেরার পথে দুর্গম পাহাড়ি পথে গাড়ি উল্টে মারা যান মেজর নাজমুল।স্বাধীন দেশ আজ পর্যন্ত সামান্য কোন স্বীকৃতিও দেয়নি এই বীরযোদ্ধাকে!

সার্বিক সহযোগিতায়- বিজ্ঞানমনস্ক বাংলাদেশের জন্যে অন্যরকম বিজ্ঞানবাক্স। আরো জানতে যোগাযোগ করুন- 01847103102

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-