ভারতের মধ্যপ্রদেশের শহর ভোপাল, রাত গভীর হচ্ছে, সুনসান প্রকৃতির বুকে নিশাচর প্রাণীদের আনাগোনা। শহরের মানুষজন বেশীরভাগই ঘুমিয়ে পড়েছে, যারা জেগে আছে তারাও ঘুমানোর প্রস্ততি নিচ্ছে। জেগে আছে শুধু রাস্তার কুকুর আর নৈশপ্রহরীদের দল, দু-চারজন ছিচকে চোর বা মদ খেয়ে মাতাল হয়ে থাকা মানুষও হয়তো জেগে ছিল সেই সময়টায়। রাত তখন প্রায় দুইটা, শহরের পুরনো অংশে বড় জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা ইউনিয়ন কার্বাইড কারখানার ঘন্টিটা প্রচণ্ড আওয়াজে বাজতে শুরু করলো তখন।

অনিল মেহতা চাকুরী করেন একটা ছাপাখানায়। অল্প বেতন, পরিবার নিয়ে থাকেন কারখানার সীমানাপ্রাচীর লাগোয়া বস্তিমতোন একটা জায়গায়। ঘুমিয়ে ছিলেন ভদ্রলোক, নিঃশ্বাস আটকে আসায় ঘুমটা ভেঙে গেল। ধড়মড় করে উঠে বসলেন তিনি, মনে হচ্ছিল, বুকের ওপর যেন দশমণি একটা বোঝা চেপে বসেছে, বুক ভরে শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করলেন, পারলেন না। তার স্ত্রী আর ছোট ছেলেটারও ঘুম ভেঙে গেছে ততক্ষণে, দুজনেরই একই অবস্থা। কি হয়েছে বুঝে উঠতে পারলেন না দুজনের কেউই, ছেলেটা কান্না শুরু করেছে তখন, চোখমুখ লাল হয়ে গেছে ওর। কারখানার ঘন্টির আওয়াজ আরও খানিক পরে কানে এল অনিলের, তখনও তিনি জানেন না, মৃত্যুদুত হানা দিয়েছে শহরে, শ্মশ্মান বানিয়ে ছাড়বে সে আজ ভোপালকে!

১৯৮৪ সালের কথা, নয় লক্ষ মানুষের বাস তখন ভোপাল শহরে। মধ্যপ্রদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন শহরগুলোর একটি ভোপাল, সেখানেই ১৯৬৯ সালে স্থাপিত হয়েছিল মার্কিন মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন কার্বাইডের কীটনাশক তৈরীর কারখানা। শহরের একপ্রান্তে বিশাল জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে সেই কারখানা, সারাদিন সেখানে চলে রাজ্যের দজ্ঞযজ্ঞ। ভোপালের মানুষ আশাবাদী হয়েছিল সেই কারখানা স্থাপিত হওয়ায়, শহরের অনেকের কাজের সুযোগ হয়েছে সেখানে। সেই আশীর্বাদই যে মরণ ফাঁদ হয়ে জীবন কেড়ে নেবে তাদের, সেটা হয়তো কারো কল্পনাতেও ছিল না তখন।

গ্যাস দুর্ঘটনা, ভোপাল বিপর্যয়, ভোপাল ডিজাস্টার, ভোপাল ট্র্যাজেডি, ইউনিয়ন কার্বাইড, ভোপাল ভারত

কীটনাশক কারখানায় চরম বিপজ্জনক রাসায়নিক মিথাইল আইসো-সায়ানেট ব্যবহার করে কীটনাশক তৈরী করা হতো। কারখানার বাইরের খুব কম মানুষই জানতো এই ভয়ঙ্কর তথ্য। সেই অভিশপ্ত রাতে একটি এমআইসি ট্যাঙ্কে পানি ঢুকে প্রচণ্ড চাপের কারণে ফেটে যায়, সেই ফাটা স্থান দিয়ে এই গ্যাস এবং অন্যান্য কমবেশি বিষাক্ত রাসায়নিক গ্যাস প্রায় এক ঘণ্টা ধরে নির্গত হয়ে কারখানার কাছের বস্তিগুলিতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে; বিষাক্ত গ্যাসের প্রকোপে পড়েন পাঁচ থেকে সাত লাখের বেশি মানুষ৷

সেই রাতে গ্যাসের তীব্রতায় টিকতে না পেরে ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিলেন ভোপালের প্রতিটি মানুষ। সবার শরীরজুড়ে তীব্র জ্বলুনি, পানি ঢেলেও কোন কাজ হচ্ছে না। রাস্তা ধরে ছুটে পালাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ, কিন্ত যাবেনটা কোথায়? শহরের আকাশজুড়ে বিষাক্ত গ্যাসের মেঘ। ততক্ষণে সবাই বুঝে গেছেন, কারখানার গ্যাস লিক হয়েছে, কারখানা থেকে যতো দূরে সম্ভব ছুটে পালাতে চাইছিলেন সবাই। নারী-শিশু-বৃদ্ধ সবাই ছুটছিলেন প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে, পায়ের নীচে চাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন কতজন! নিঃশ্বাস নিতে না পেরে অজ্ঞান হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ, তাদের জ্ঞান আর ফিরে আসেনি কোনদিন। বাবা জানেন না, তার সন্তানকে আর কোনদিন জীবিত অবস্থায় দেখতে পারবেন না, প্রাণ বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকা নববিবাহিত তরুণী জানতো না, আজ থেকে সাদা রঙের শাড়ীতে হবে তার বৈধব্যের সাজ, কপালের সিঁদুর মুছে যাবে অদৃষ্টের অভিশাপে!

গ্যাস দুর্ঘটনা, ভোপাল বিপর্যয়, ভোপাল ডিজাস্টার, ভোপাল ট্র্যাজেডি, ইউনিয়ন কার্বাইড, ভোপাল ভারত

কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে ভোপাল পরিণত হয়েছিল মৃত্যুপুরীতে। ভোররাত চারটার দিকে শহরে জারী করা হয় জরুরী অবস্থা, গ্যাস মাস্ক পরে পুলিশ কাজে নামে। ততক্ষণে কয়েক হাজার নিরীহ মানুষ ঢলে পড়েছে মৃত্যুর কোলে, পরপারে যাত্রার প্রতীক্ষায় যন্ত্রণাকর মৃত্যুর প্রহর গুনছে আরও কয়েক হাজার ভোপালবাসী। হাসপাতালের মর্গে লাশ রাখার জায়গা নেই, ওয়ার্ডের এখানে সেখানে, বারান্দায় মেঝেতে পড়ে আছে লাশ। কেউ কেউ হয়তো নিজের ঘরেই মরে পড়ে ছিলেন, তার মৃতদেহ আবিষ্কার করা হয়েছে এক সপ্তাহ পরে!

রাস্তায় জমে ছিল কুকুর বিড়ালের অগুনতি মৃতদেহ, পচে দুর্গন্ধ চড়াচ্ছে, সেগুলো সরানোর কেউ নেই। থাকবে কি করে! নিহতদের স্বজনেরা যে আহাজারি করবেন সেই উপায়টাও ছিল না, নিজের জান বাঁচাতেই তখন ব্যস্ত সবাই। এতগুলো মৃতদেহের সৎকারের কি ব্যবস্থা হবে কিছুই ঠিক নেই। পরে একসঙ্গে পোড়ানো হয়েছিল বেশীভাগ লাশ। সেই পোড়া মাংসের গন্ধ, বিষাক্ত গ্যাসের গন্ধ আর পচা-গলা মৃতদেহের গন্ধ মিলিয়ে বাতাস হয়ে উঠেছিল অদ্ভুত রকমের ভারী, যেন এই নগরীতে কোনদিন প্রাণের সঞ্চার হয়নি কোথাও!

গ্যাস দুর্ঘটনা, ভোপাল বিপর্যয়, ভোপাল ডিজাস্টার, ভোপাল ট্র্যাজেডি, ইউনিয়ন কার্বাইড, ভোপাল ভারত

দুর্ঘটনার প্রথম তিন দিনেই প্রায় আট হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। পরের কয়েকদিনে আরও বেড়েছিল মৃতের সংখ্যা, বিষাক্ত এই গ্যাসের তীব্রতা সহ্য করার ক্ষমতা ছিল না মানবশরীরের। বেসরকারী অনেকগুলো সংস্থার তথ্যমতে, ভোপাল ট্র্যাজেডিতে মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে বিশ হাজার! কিন্ত ভারতীয় সরকার অস্বীকার করেছে সেই তথ্য, তারা জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা কোনভাবেই পাঁচ হাজারের বেশী নয়। অথচ ভোপাল ট্র্যাজেডির দুই যুগ পরেও আক্রান্ত মানুষজন ভুগে ভুগে মারা গিয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন কত হাজার মানুষ! এখনও ভোপালে পঙ্গু হয়ে জন্ম নেয় শিশুরা, কেউ আকৃতগতভাবেই বিকলাঙ্গ, কেউবা চোখে দেখতে পায় না, কেউ বধির হয়েই জন্ম নেয়! সেসবের দায় কেউ স্বীকার করে না।

ঘটনার তদন্তকারী অফিসার এবং স্থানীয় এনজিও’দের দাবি, কারখানা কর্তৃপক্ষের অক্ষমতা এবং বাজে মেরামতির কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছিল। অন্যদিকে ইউনিয়ন কার্বাইড কর্তৃপক্ষ পুরো ব্যপারটাকেই স্যাবোটাজ বলে দাবী করেছিল। গণমাধ্যমে তারা বিবৃতি পাঠিয়েছিল, এটা একটা পরিকল্পিত দুর্ঘটনা এবং কারখানার এক কর্মী এই অন্তর্ঘাতের জন্য দায়ী। সেই কর্মী নাকি হোসপাইপ দিয়ে ৬১০ নম্বর এমআইসি ট্যাঙ্কে পানি ঢুকিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটিয়েছিলেন! যদিও এর সপক্ষে কোন প্রমাণ আজ পর্যন্ত হাজির করতে পারেনি তারা।

গ্যাস দুর্ঘটনা, ভোপাল বিপর্যয়, ভোপাল ডিজাস্টার, ভোপাল ট্র্যাজেডি, ইউনিয়ন কার্বাইড, ভোপাল ভারত

ভোপাল ট্র্যাজেডির পরে রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা ছিল অদ্ভুত রকমের প্রশ্নবিদ্ধ। ইউনিয়ন কার্বাইডের সেই সময়কার চেয়ারম্যান, ওয়ারেন অ্যান্ডারসন দুর্ঘটনার কয়েকদিন পর কারখানা দেখতে ভোপালে গেলে ভারতীয় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছিল, কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই আবার তাকে জামিন দেয়া হয়, এমনকি ভারত ত্যাগে সাহায্যও করা হয়েছিল। একারনে আদালতে যখন মামলা হয়েছিল, তখন অভিযুক্তদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কাউকে হাজির করা যায়নি। ভোপাল দুর্ঘটনায় জীবিতদের আইনগত প্রতিনিধি হিসাবে ভারত সরকার প্রথমে ৩.৩ বিলিয়ন ক্ষতিপূরণের আবেদন করেছিল। কিন্তু আদালতের বাইরে এক সমঝোতার মাধ্যমে ইউনিয়ন কার্বাইড ১৯৮৯ সালে ৪৭ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দিয়ে দায়মুক্ত হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, সেই সাতচল্লিশ কোটি ডলারের সিকিভাগও পায়নি ক্ষতগ্রস্থ পরিবারগুলো। এই ঘটনায় বিচারের দাবীতে আন্দোলন হয়েছে, মানববন্ধন হয়েছে, কাজের কাজ কিছুই হয়নি, বিচার আর মেলেনি। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা বা অন্যান্য মানবাধিকার ফোরামগুলোও অদ্ভুত এক নীরবতা পালন করেছিল ভোপাল ট্র্যাজেডির ব্যপারে। এই ঘটনায় দায়ী প্রতিষ্ঠানটি আমেরিকান হওয়ার কারণেই কিনা কে জানে!

ভোপালের সেই মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনার জের এখনও টানছে সেখানকার বাসিন্দারা। মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করে যারা চলে গেছেন, তারা তো একরকম বেঁচেই গেছেন। পঙ্গুত্ব বরণ করে যারা বেঁচে আছেন, কিংবা নতুন জন্ম নেয়া যে শিশুগুলোকে জন্ম নিতে হচ্ছে বিকলাঙ্গ হয়ে, তাদের কষ্টটা তো দীর্ঘমেয়াদী। ইউনিয়ন কার্বাইডের সেই কারখানা এখন পরিত্যক্ত। আদালতের নির্দেশে মধ্যপ্রদেশের সরকার ১৯৯৮ সালে এই কারখানার জায়গাটা দখলে নিয়ে সীলগালা করে দিয়েছে, সর্বসাধারণের প্রবেশ সেখানে নিষিদ্ধ। কিন্ত এসবে তো সেই ভয়াল রাতের স্মৃতি মুছে যাবে না, বিনা অপরাধে মৃত্যুকে বরণ করে নেয়া নিরীহ মানুষগুলো আর ফিরে আসবেন না। শুধু কারখানার বিশাল দেয়াল আর যন্ত্রপাতিগুলো মহাকালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, এতগুলো মানুষের মৃত্যুর কারণ হওয়ায় খানিকটা অপরাধবোধেও ভুগবে হয়তো।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-