খেলা ও ধুলারাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮

এবারের বিশ্বকাপই সর্বকালের সেরা?

ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, স্পেনের মত শীর্ষ ফেবারিট দলগুলো সেমিফাইনালের আগেই বিদায় নেওয়ায় এবারের বিশ্বকাপ অনেকটাই রঙ হারিয়েছে বলে মনে করছেন এসব নির্দিষ্ট দলের সমর্থকদের একাংশ। তবে একদমই নিখাদ ফুটবলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যদি বিচার করা হয়, তাহলে এবারের বিশ্বকাপ নিঃসন্দেহেই ছিল সর্বোচ্চ মানের। অনেকে তো এমনটিও বিশ্বাস করেন যে এবারের বিশ্বকাপই সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ! তবে সাধারণ মানুষ তো আবেগের জোয়ারে ভেসে গিয়ে এমন কত কথাই বলে। কিন্তু এক্ষেত্রে নিউ ইয়র্ক টাইমসের করা পরিসংখ্যান ভিত্তিক বিশ্লেষণও একই কথাই বলছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের বিশ্বকাপ এক নতুন রেকর্ড গড়েছে। আর তা হলো ৮৯তম মিনিটের পর সবচেয়ে বেশি গোলের। সেমিফাইনালের আগ পর্যন্ত ৬০ ম্যাচে মোট ২৩টি গোল এসেছে ম্যাচের ৯০তম মিনিটে, কিংবা দ্বিতীয়ার্ধের অতিরিক্ত সময়ে। অর্থাৎ এই ৬০ ম্যাচে হওয়া মোট গোলের ১৫ শতাংশই এসেছে এ সময়ে।

৮৯তম মিনিটের পর হওয়া সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড এতদিন ছিল ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের দখলে। সেবার গোটা আসরের মোট গোলের ৮ শতাংশ এসেছিল ৮৯তম মিনিটের পর। অর্থাৎ এবারের বিশ্বকাপে শেষ মিনিটের গোলের শতকরা হার গত আসরের চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ!

এবং আরও মজার হলো, এবারের বিশ্বকাপে আসা ২৩টি শেষ মিনিটের গোলের মধ্যে ১৪টিই সরাসরি ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ ওই গোলগুলোর ফলে হয় কোনো দল ন্যূনতম ব্যবধানে ম্যাচ জিতে নিয়েছে, অথবা সমতায় ফিরেছে।

বিশ্বকাপ ফুটবল, জার্মানী, টনি ক্রুস, জোয়াকিম লো

এ প্রতিবেদনে আরও দেখা যাচ্ছে, ২০১৪ বিশ্বকাপে যেখানে দ্বিতীয়ার্ধের অতিরিক্ত সময়ের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ৪.১ মিনিট, এবারের বিশ্বকাপে এসে তা ৫ মিনিট! তবে দ্বিতীয়ার্ধের অতিরিক্ত সময়ের স্থায়িত্বকাল বৃদ্ধিও শেষ মিনিটের গোলের এতটা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাবক নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এছাড়া এবারের বিশ্বকাপে ৮৯তম মিনিটের পর যেমন সর্বোচ্চ ১৩টি গোল এসেছে, ঠিক সমান সংখ্যক গোল এসেছে ৫০ থেকে ৫৫ মিনিটের মধ্যেও।

এছাড়াও এবারের বিশ্বকাপে মাত্রাতিরিক্ত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে ডেড বল (যখন কোন বিরতি দিয়ে খেলা শুরু হয়, যেমন পেনাল্টি, ফ্রিক কিক, কর্নার, থ্রো ইন) থেকে আসা গোলের পরিমাণেও। ৬০ ম্যাচে যে ১৫৭টি গোল হয়েছে, তার মধ্যে ৬৮টিই এসেছে ডেড বল থেকে। অর্থাৎ ডেড বল থেকে আসা গোলের হার ৪৩.৩১ শতাংশ!

তাই এবারের বিশ্বকাপকে অনেকেই বলছেন সেট পিসের বিশ্বকাপ। আর সেট পিসের সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করেছে যে দলটি, সেটি হলো ইংল্যান্ড। গ্যারেথ সাউথগেটের দল টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ পাঁচটি গোল করেছে কর্নার ও ফ্রি কিক থেকে। এর পাশাপাশি তারা পেনাল্টি থেকেও তিনটি গোল করেছে, আর সেই তিনটি গোলই যুক্ত হয়েছে অধিনায়ক হ্যারি কেইনের নামের সাথে। ১৯৬৬ সালে পর্তুগালের পর আর কোন দল সেট পিস থেকে এতগুলো গোল দিতে পারেনি।

একটি পরিসংখ্যান ইংল্যান্ডকে অনেক অনুপ্রেরণা যোগাবে। ২০১৪ বিশ্বকাপে কর্নার থেকে সবচেয়ে বেশি গোল দিয়েছিল জার্মানি। ২০০৬ সালে ইটালি, আর ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স। এবং এই তিন দলই ওই আসরগুলোর চূড়ান্ত বিজয়ী হয়েছিল। ইংল্যান্ডেরও এবার তাই হবার কথা ছিলো। কিন্তু হলো না, কাল ক্রোয়েশিয়ার সাথে সেমিতে হেরে বিদায় নিয়েছে তারা। এই বিশ্বকাপ যেনো আপনি যাকে জয়ী ভাববেন, তারাই হেরে যাবে।

ইংল্যান্ড, রোড টু ফাইনাল, ২০১৮ বিশ্বকাপ

 এটাও এই বিশ্বকাপের রোমাঞ্চ! সবমিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপ যেন পসরা সাজিয়ে বসেছে অভূতপূর্ব উত্তেজনা ও রোমাঞ্চের, বিশেষত ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তগুলোতে। এই বিশ্বকাপ থেকে দর্শকরা নতুন করে একটি শিক্ষা পেয়েছে যে ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই কোন দলকে জয়ী বলে ধরে নেয়া হবে খুবই বোকামি। কারণ ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায়ও পরিবর্তন ঘটতে পারে ফলাফলে, আর উলটে যেতে পারে সকল হিসাব-নিকাশ। তাই রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর আগ পর্যন্ত হতে পারে যেকোনো কিছুই!

অর্থাৎ এবারের বিশ্বকাপ স্মরণকালের সবচেয়ে অনিশ্চয়তায় মোড়া বিশ্বকাপ। এবং তা প্রমাণের জন্য গাণিতিক পরিসংখ্যানেরও প্রয়োজন পড়ে না। খালি চোখেই পরিষ্কার হয়ে যায় অনেককিছুই। আর্জেন্টিনার শেষ ষোলো থেকে বাদ পড়া হয়ত খুব বড় কোন দুর্ঘটনা নয়, কিন্তু কে ভাবতে পেরেছিল যে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন জার্মানি বাদ পড়বে প্রথম রাউন্ড থেকেই! কিংবা দ্বিতীয় রাউন্ডে স্বাগতিক রাশিয়ার কাছে হেরে বসবে ২০১০ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন স্পেন, কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়াম বাঁধা টপকাতে পারবে না পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, কিংবা ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবার ফাইনাল খেলবে ক্রোয়েশিয়া!

ইউরোপ, বিশ্বকাপ ইউরোপ, সেমিফাইনাল ফিক্সচার

এমনকি সেমিফাইনালে যে ফ্রান্সের সঙ্গী হবে বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড ও ক্রোয়েশিয়ার মত দলগুলো, সেটিই বা আসরের শুরুতে ভেবেছিল কয়জন! কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়েছে সেটিই। তার কারণ এবারের বিশ্বকাপে নিশ্চিত ফেবারিট বলে কোনো দল আসলে নেই। নির্দিষ্ট দিনে যে দলটি নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে খেলতে পেরেছে, জয় পেয়েছে তারাই। অর্থাৎ দিন শেষে জয়ী হয়েছে ফুটবলই। তাই তো গুটিকতক দলকানা সমর্থক বাদে সত্যিকারের সকল ফুটবলপ্রেমীই মানছেন, রাশিয়া বিশ্বকাপ সর্বকালের না হোক, স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ বিশ্বকাপ অবশ্যই!

ফিচার্ড ছবি- Bleacher Report Football

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close