স্পেনের ফুটবল ইতিহাসের সফলতম ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের সাথে নয় বছরের সম্পর্কের ইতি টেনে ইটালির জুভেন্টাসে নাম লেখালেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। কিন্তু বিদায় নেয়ার আগে গত নয় বছরে রয়্যাল ক্লাবের সাদা জার্সিতে এত এত অর্জন তার যে অনেক ভক্ত-সমর্থকই আবেগের বশবর্তী হয়ে জানিয়ে দিচ্ছেন, রোনালদোই নাকি লস ব্লাংকোসদের হয়ে খেলা সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়! এ দাবি কতটুকু গ্রহণযোগ্য? চলুন খতিয়ে দেখা যাক!

প্রথমেই একটি কথা সোজাসুজি বলে নেয়া ভালো। আমরা এমন একজন খেলোয়াড়কে নিয়ে আলোচনা করছি যিনি শুধু নির্দিষ্ট কোন ক্লাবের কেন, গোটা ফুটবল ইতিহাসেরই সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের একজন। এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করবার মত লোক বোধহয় খুব কমই পাওয়া যাবে।

এবং যদি শুধু রিয়াল মাদ্রিদের কথাও ধরি, সেখানেও কিন্তু এই পর্তুগিজ সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ৪৫০টি গোল রয়েছে তার নামের পাশে। নিজের জেতা পাঁচটি ব্যালন ডি’অরের মধ্যে চারটিই জিতেছেন এই ক্লাবে খেলার সময়। অর্থাৎ নিজের ক্যারিয়ারের তুঙ্গস্পর্শী সময়টুকু তিনি কাটিয়ে গেছেন সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতেই। এবং সেই সুবাদে পাঁচ বছরে চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগও জিতেছেন। কিন্তু তারপরও কি রোনালদোকে রিয়ালের সর্বকালের সেরা বলা যাবে?

যেকোনো বার্সেলোনা ভক্তকে জিজ্ঞাসা করুন, তারা সকলেই একবাক্যে মেনে নেবে যে লিওনেল মেসিই তাদের ক্লাবের সর্বকালের সেরা। এর পেছনে যথেষ্ট কারণও রয়েছে। মেসিই যে ব্লগরানাদের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল যুগের অংশীদার ও অগ্রাধিনায়ক। তিনি বার্সেলোনাকে জিতিয়েছেন দুইটি ট্রেবলসহ (২০০৮-০৯, ২০১৪-১৫) মোট আটটি লা লিগা, এবং বার্সেলোনার এখন পর্যন্ত জেতা পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপার মধ্যে চারটিতেই ছিল তার অবদান। বার্সেলোনার জার্সি গায়ে পাঁচশোর বেশি গোল করেছেন তিনি, এবং খুব শীঘ্রই তা ছয়শো অতিক্রম করবে। তাই মেসিই যে বার্সেলোনার সর্বকালের সেরা, এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ খুব কমই রয়েছে।

এদিকে রোনালদোও কিন্তু বার্নাব্যুতে তার কাটানো নয় বছরে ছিলেন এক কথায় অসাধারণ। ২০১৫ সালেই এই পর্তুগিজ ছাড়িয়ে যান মাদ্রিদের হয়ে রাউলের করা সর্বোচ্চ ৩২৩ গোলের রেকর্ড, এবং গড়ে প্রতি ম্যাচেই তিনি করেছেন একের সামান্য বেশি গোল।

কিন্তু বার্সা ইতিহাসের সেরা সময় যেমন এসেছে সাম্প্রতিক কালে, প্রথমে পেপ গার্দিওলার হাত ধরে আর তারপর লুইস এনরিকের অধীনে, রিয়াল মাদ্রিদের বেলায় কিন্তু তা হয়নি- এমনকি টানা তিনটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার পরও নয়। ক্লাবটি এরচেয়েও ভালো সময় কাটিয়ে এসেছে অতীতে।

গতবছর যখন সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর বাইরে দাঁড়িয়ে ভক্তদের কাছে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তাদের ক্লাবের ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় কে, খুব বেশি মানুষ কিন্তু রোনালদোকে বেছে নেননি। অবশ্য তারা এটি ঠিকই স্বীকার করেছিলেন যে রোনালদো রিয়ালের জার্সি গায়ে খেলা ‘অন্যতম’ সেরা ফুটবলার অবশ্যই।

ক্লাবটির সাবেক গোলরক্ষক পাকো বুয়ো বলেন, “রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে অনেক গ্রেট খেলোয়াড়ই খেলেছেন। খুবই খারাপ হবে যদি আমরা ভুলে যাই আলফ্রেদো ডি স্টেফানোর কথা, যিনি শুধু রিয়াল মাদ্রিদেরই নন, ফুটবল খেলাটিরই সবচেয়ে সেরাদের একজন ছিলেন।”

“আমি মনে করি সে যা কিছু অর্জন করেছে, তাতে ক্রিস্টিয়ানো একজন সত্যিকারের রিয়াল মাদ্রিদ কিংবদন্তী। কিন্তু আমার মনে হয় তাকে ক্লাবের শ্রেষ্ঠতম বলাটা খুবই কঠিন কাজ হবে। তবে নিশ্চিতভাবেই তিনি সেরা তিনে থাকবেন।”

বাস্তবিকই যুগে যুগে অসংখ্য কিংবদন্তী খেলোয়াড়ের পদচারণায় মুখরিত হয়েছে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর মাটি। তাদের মধ্য থেকে সেরাদের সেরা বেছে নেয়া সহজ কাজ নয়। ব্যক্তিগত পছন্দ ও বয়সের ভিত্তিতে একেকজন মানুষ একেকজনকে বেছে নেবে। যেমন বর্তমান সময়ের, কমবয়েসী ভক্তরা সর্বকালের সেরা হিসেবে হয়ত রোনালদোকেই নির্বাচন করবে। কিন্তু বয়স ও অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থকেরা তাদের পঞ্চাশ কিংবা ষাটের দশকের কাউকেই পছন্দের তালিকায় সবার উপরে রাখবে।

“অনেক খেলোয়াড়ই তো রয়েছেন”- বলেন মাদ্রিদের হয়ে আশি ও নব্বইয়ের দশকে ছয়টি লা লিগা শিরোপা জেতা বুয়ো। “পুসকাস ছিলেন, গেন্তো ছিলেন। গেন্তো তো ছয়টি ইউরোপিয়ান কাপ জিতেছিলেন! এরকম আরও অনেকেই আছেন। খুবই অবিচার করা হবে তাদের সাথে যদি আমরা তাদের কথা স্মৃতি থেকে ঝেড়ে ফেলি, অতীতে কী হয়েছে সব ভুলে যাই। শুধু বর্তমানকে প্রাধান্য দিলেই তো চলবে না।”

তাহলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর রিয়াল মাদ্রিদকে মনে রাখবে, যেভাবে আমরা বর্তমান প্রজন্ম এখনও স্মরণ করি পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ডি স্টেফানোর অধীনে খেলা মাদ্রিদ দলটিকে?

“সকল দৃষ্টিকোণ থেকেই ক্রিস্টিয়ানো একজন তারকা”- বলেন বুয়ো। “রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে সে সম্ভাব্য সম্ভাব্য সবকিছুই জিতেছে। এমনকি নিজের জাতীয় দলকেও সে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জিতিয়েছে। এটিই প্রমাণ করে যে সে আসলে কোন লেভেলের খেলোয়াড়। কিন্তু আসলেই সে সর্বকালের সেরা কিনা, সেটা অনাগত সময়ই বলে দেবে। ডি স্টেফানো, গেন্তো, কোপা, পুসকাসদের সময়কার রিয়াল মাদ্রিদ একটানা পাঁচটি ইউরোপিয়ান কাপ জিতেছিল, যা রীতিমত অবিশ্বাস্য একটি অর্জন।

বোকা জুনিয়র্স, রিভার প্লেটে খেলা আর্জেন্টিনার সাবেক গোলরক্ষক হুগো গাত্তিও এ বিতর্কে সামিল হয়েছেন নিজের অভিমত জানিয়ে। তিনি বলেন, “ডি স্টেফানো ঠিক কতটা ‘স্পেশাল’ ছিলেন, এবং কেন তার সাথে রোনালদোর তুলনা করা সাজে না।”

“১৯৬৫ সালে গেন্তোর স্মরণে আয়োজিত একটি ট্রিবিউট ম্যাচে আমি আলফ্রেদোর বিপক্ষে খেলেছিলাম (বার্নাব্যুতে, রিভার প্লেটের হয়ে)। এবং সম্ভবত ১৯৮৪ বা ‘৮৫ সালে বোকাতে তিনি আমার কোচ ছিলেন। (কোচ থাকাকালীন) প্রায়ই তিনি আমাদের সাথে খেলায় সামিল হতেন। বল পায়ে যেভাবে তিনি দৌড় লাগাতেন, ওই সত্তর বছর বয়সেও তার গতি আমাদের সবার চেয়ে বেশি ছিল!”

“আমার কাছে তিনিই সেরা। পেলের পরে, যিনি পুরো বিশ্বেরই সেরা, পুরো ইতিহাসেরই সেরা। তাঁর পরেই আসবে আলফ্রেদোর নাম। ক্রিস্টিয়ানোর সাথে তাঁর তুলনা আমি করব না।”

এই মুহুর্তে গাত্তি বছরের অর্ধেক সময়ই মাদ্রিদে কাটান, সেখানে কাজ করেন একজন টেলিভিশন পন্ডিত হিসেবে। বার্নাব্যুতে তিনি নিয়মিত হাজির হন রিয়াল মাদ্রিদের খেলা দেখতে, এবং রোনালদোর অনেক বড় একজন ভক্তও তিনি।

“আমি রোনালদোর খেলার ভক্ত। খেলার মাঠে সে এক নম্বর। আমার কাছে মনে হয় মাঠের বাইরেও আপনাকে সেরা হতে হবে। এবং আমার কাছে মাঠের বাইরেও সে-ই সেরা। সে-ই এক নম্বর। সে বিশেষ একজন। আমি ক্রিস্টিয়ানোকে ভালোবাসি। সে একজন প্রকৃত নেতা।”

আজকের দিনে মাঠে খেলোয়াড়দের প্রতিটি নড়াচড়াই অতি সূক্ষ্মভাবে ক্যামেরায় বন্দি হয়, যা থেকে তাদের সম্পর্কে আগাগোড়া সবটাই বিচার-বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়। কিন্তু ডি স্টেফানোর সময় প্রযুক্তি এতটা উৎকর্ষতা লাভ করেনি। তাই তার অধিকাংশ খেলারই কোন ভিডিও ফুটেজ নেই যা ইন্টারনেটে দেখা যাবে। তাহলে খেলোয়াড় হিসেবে ঠিক কেমন ছিলেন তিনি?

“আমি যখন তাঁর সাথে খেলেছিলাম, তার বয়স তখন ৩৯ বা ৪০। তখন তিনি এস্পানিওলে খেলতেন, কিন্তু গেন্তোর ট্রিবিউটের জন্য ফিরে এসেছিলেন। কোপা, আমানসিও, পুসকাসরাও সবাই এসেছিলেন। কিন্তু সবার মাঝে তিনি ছিলেন স্রেফ অসাধারণ। তখনও তিনি সেই একইভাবে খেলতেন। তিনি গোলরক্ষককে বলতেন তাঁর কাছে বল দিতে। তারপর নিচ থেকে বল নিয়ে উঠে আসতেন, আক্রমণে যেতেন। আবার সেই তিনিই আবার ডিফেন্স করতেও যেতেন।”

“আলফ্রেদো ছিলেন একজন ফেনোমেনন। তাঁর মত খেলতে পরবর্তীতে আমি দেখেছি একজনকেই। তিনি ক্রুইফ। কিন্তু আমার কাছে আলফ্রেদোই সেরা। মাদ্রিদের ইতিহাসে, এবং ইউরোপেও। আমার মনে হয় যিনি ইউরোপীয় ফুটবলে নতুন দিনের সূচনা করেছেন, তিনি হলেন আলফ্রেদো ডি স্টেফানো।”

“আলফ্রেদোর পরে আপনার আছে ক্রিস্টিয়ানো। কিন্তু তার খেলার ধরণ একদমই আলাদা। আলফ্রেদো ছিলেন এমন একজন খেলোয়াড় যিনি এগিয়ে যেতে চাইতেন। আর ক্রিস্টিয়ানো এমন একজন যে কখনও শেখা থামায় না। সে সবকিছুই জিততে চায়, আর সবসময় উন্নতি করতে চায়। আমার কাছে ক্রিস্টিয়ানো হলো টেনিসের রাফা নাদাল, যে সবকিছুই আরও আরও চায়।”

রোনালদো ২০০৯ সালে রিয়াল মাদ্রিদে আসার আগে হুয়ান্দে রামোস ছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের কোচ। বর্তমানে ৬৩ বছর বয়সী রামোস স্বীকার করেন যে রোনালদোকে দলে পেলে দারুণ হতো তার জন্য।

তিনি বলেন, “যখন আপনার দলে থাকবে এমন কোন খেলোয়াড়, মেসি বা রোনালদো, আপনি জানবেন যে তারা যেকোন সময় একটি গোল দিয়ে দলকে ম্যাচ জিতিয়ে দিতে পারবে। যদি ম্যাচের পরিস্থিতি আপনার অনুকুলে না-ও থাকে, এই খেলোয়াড়রা আপনাকে তিনটি পয়েন্ট এনে দিতে পারবে, সব সমস্যার সমাধান করে দিতে পারবে।”

২০০৪ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে রিয়াল মাদ্রিদ একবারও চ্যাম্পিয়নস লিগে শেষ ষোলোর বেশি এগোতে পারেনি। এমনকি রামোস যে মৌসুমে দলের দায়িত্বে ছিলেন, সেবারও না। কিন্তু রোনালদো আসার পর গত পাঁচ মৌসুমে লস ব্লাংকোসরা চারবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছে। আর দলের হয়ে মোট ৪৫০ গোল করেছে এই পর্তুগিজ।

“তার আসাতেই বদলে গিয়েছিল সবকিছু”- বলেন রামোস। তবে তিনিও বিশ্বাস করেন যে, মাদ্রিদের ইতিহাসে এত এত কিংবদন্তী খেলোয়াড় রয়েছেন যে, তাদের সাথে রোনালদোর তুলনা করতে যাওয়াটা খুবই দুরূহ।

“আমি বলব এই ধরণের তুলনা করতে যাওয়াটা খুবই কঠিন। কারণ ফুটবলের ক্রমাগত পরিবর্তন হয়। সময়ের সাথে সাথে সবকিছু বদলে যায়। আমি রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ডি স্টেফানোকে খেলতে দেখিনি। কিন্তু মানুষ তাঁর ব্যাপারে অনেক কথা বলে। তাঁর পাঁচটি ইউরোপিয়ান কাপ জয়ের ব্যাপারে কথা বলে। কিন্তু আমি যেহেতু সেগুলো নিজের চোখে দেখিনি, তাই আমি সে ব্যাপারে কোনো কথা বলব না। তবে তাঁরা দুইজনেই অবশ্যই খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার।”

“রাউলও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে দীর্ঘদিন খেলেছে। সে-ও দলের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তারপরও আমাকে যদি তুলনা করে বলতে হলা হয় যে সে রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসের সেরা কি না, আমি তা পারব না। কারণ দুইটি যুগ একেবারেই আলাদা। গেন্তো এতগুলো ইউরোপিয়ান কাপ জিতেছেন, কিন্তু সেটিও একেবারে আলাদা পরিস্থিতিতে।”

পরিশেষে তাই বলতেই হয়, মেসি নাকি ম্যারাডোনা বা পেলে, এ বিতর্কের যেমন অবসান হওয়ার নয়, ঠিক তেমনই রোনালদো নাকি ডি স্টেফানো, এই বিতর্কও অমীমাংসিতই থেকে যাবে। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে গত নয় বছরে অবিসংবাদিত নায়ক ছিলেন রোনালদো। কিন্তু দল হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদ আরও বড়, তার ঐতিহ্যও অনেক বিস্তৃত। তরুণ প্রজন্ম হয়ত রোনালদোর প্রতিই তাদের পক্ষপাতিত্ব দেখাবে, কিন্তু যারা দুই প্রজন্মের ফুটবলই দেখেছে, তাদের বেশিরভাগের কাছেই রোনালদো রিয়াল মাদ্রিদ ইতিহাসের দ্বিতীয় সেরা খেলোয়াড় হয়েই থাকবেন। প্রথম স্থানটি থেকে যাবে ডি স্টেফানোর দখলেই।

(গোল ডট কম অবলম্বনে)

Comments
Spread the love