খেলা ও ধুলা

‘যো লোক কুচ ন্যাহি কারতে, ও লোক কামাল কারতে হ্যায়!’

ভারতীয় ‘কালার্স’ চ্যানেলের মোটামুটি বেশ জনপ্রিয় ‘দ্যা অনুপেম খের শো; কুচ ভি হো সাকতা হ্যায়’-তে অতিথি হিসেবে বলিউডের কিংখান খ্যাত শাহরুখ খানও এসেছিলেন একবার। সেই এপিসোডে, শাহরুখের ব্যক্তি জীবনের উত্থান-পতন, জীবন সংগ্রাম নিয়ে নানান কথা হচ্ছিলো উপমহাদেশের সিনেমা জগতের দুই মহারথীর মধ্যে। শাহরুখের জীবনবোধ এবং সেটির উপস্থাপন যে কাউকে মুগ্ধ করে অনায়াসে, তা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। অনুপেম খের এর প্রশ্ন এবং শাহরুখের সেন্স অফ হিউমার আর নিজ জীবনের কঠিন সত্যের উপস্থানে শো তখন পুরোপুরি জমে উঠেছে।

তো শো-এর একপর্যায়ে নিজের বাবার সম্পর্কে বলতে গিয়ে শাহরুখ খান বলেছিলেন, ‘আমার বাবা আমাকে বলতো কিছুই না করার জন্য। কেননা যারা নাকি কিছুই করে না, তারা চমৎকার করে!’ হিন্দিতে যা এভাবে বলেছিলেন, ‘Jo lok kuch Nahin korte, Woh lok Kamal karte hain!’

হঠাৎ এমন কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে ছিলেন অনুপেম খের, নিশ্চয়ই অবাক হয়েছিল উপস্থিত এবং টিভি পর্দার অপরপাশের সকল দর্শকও। পরে শাহরুখের বাবার এই কথাটা নিয়ে বেশ চর্চা হয় এবং শাহরুখকেও সেটির ব্যাখ্যা দেয়া লাগে বিভিন্ন জায়গায়৷ সেগুলো লেখার মূললক্ষ্য বিষয় না।

চলে যাই সম্পূর্ণ আলাদা ক্ষেত্রে, ফুটবলবিশ্বে। লেখার মূল বিষয়, রিয়াল মাদ্রিদের নাম্বার নাইন ফ্রেঞ্চ তারকা করিম বেঞ্জেমা-তে। যাকে নিয়ে রিয়াল ভক্তকূলের অভিযোগ, অনুযোগ, বিরক্তি কোনোকিছুরই শেষ নেই। তবে একেবারে ভালোবাসা পান না তা নয়, বরং হঠাৎ হঠাৎ এমন কিছু করে ফেলেন যা তাকে প্রশংসার শিখরে উঠিয়ে দেয়। কিন্তু সমস্যা হল, দৃষ্টিকটু ফুটবল খেলে আবারো মাটিতে নেমে আসতে একদমই সময় নেন না তিনি। কাকা ও রোনালদোর সাথে ২০০৯ সালে ইয়াংস্টার হিসেবে তার আগমন ঘটে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে। পেলেগ্রেনি হয়ে, মরিনহো, আনচেলত্তি, জিদান… সব যুগেই তিনি ছিলেন কোচ ফেবারিট’স খেলোয়াড়ের তালিকার শীর্ষে! একদিকে শুনতেন সমর্থকদের দুয়োধ্বনি, অন্যদিকে ম্যানেজাররা যেন তাকে প্রতি ম্যাচে একাদশের টিকিট ধরিয়ে দিতো। সমর্থকদের এমনটাও দেখতে হয়েছে, ম্যাচে বেঞ্জেমা ভীষণ খারাপ খেলছেন অথচ তাকে সাব করা হচ্ছে না। পুরো নব্বই মিনিট খেলেই তিনি উঠেছেন, কি অদ্ভুত! কি বিরক্তি! এভাবেই বেঞ্জেমা মৌসুমের পর মৌসুম পার করেছেন এবং করে যাচ্ছেন। বোর্ড ও ম্যানেজারদের অসংখ্যবার সমর্থকদের দ্বারা মুন্ডুপাত হওয়া সত্ত্বেও, হাজারো সমালোচনার ভীড়ে করিম বেঞ্জেমা টিকে গেছেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্লাবে।

২০০৯ সালে বেঞ্জেমা, রিয়ালের স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত হলেও আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড হিগুয়েনই ছিলেন রিয়ালের মূল স্ট্রাইকার। প্রথম মৌসুমে বেঞ্জেমার নিজেকে মানিয়ে নিতে কষ্ট হলেও, পরের মৌসুম থেকেই তিনি দলের অপরিহার্য সদস্য হয়ে উঠেন। এমনকি ১১-১২ মৌসুমে বেঞ্জেমার গোলসংখ্যা ছিল ৩২! ১৩ সালে বোর্ডের সাথে দ্বন্দ্বে হিগুয়েন যখন মাদ্রিদ ছেড়ে ইতালি পাড়ি জমায়, তখন একদম পাকাপাকিভাবে রিয়ালে নাম্বার নাইন পজিশনটা চলে আসে বেঞ্জেমার দখলে। গঞ্জালো হিগুয়েন বিশ্বমানের স্ট্রাইকার ছিলেন, আজো আছেন। তার গোল স্কোরিং এবিলিটি কখনোই খারাপ ছিল না, তারপরেও হিগুয়েনকে বিশেষত যে কারণে দল ছাড়তে হয়েছিল সেটি হল রিয়াল মাদ্রিদের প্লেয়িং স্টাইলের সাথে তিনি ফিট ছিলেন না। কেননা পাক্কা নাম্বার নাইন হিসেবে খেললেও রিয়াল মাদ্রিদের প্লেয়িং স্টাইলে তাকে ডিস্ট্রিবিউটারের রোল প্লে করতে হয় এবং খেলা বিল্ডআপ এর সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখতে হয়। রিয়াল মাদ্রিদ কাউন্টার অ্যাটাক বেসড ফুটবল খেলে। রিয়াল যখন কাউন্টার আক্রমণে উঠে তখন একজন মিডফিল্ডার বা উইঙ্গারকে যে রোল প্লে করতে হয়, একজন স্ট্রাইকারকেও সেই রোল প্লে করা লাগে। এভাবে ডি বক্সের কাছাকাছি গিয়ে শেষ পাসটা এমন কাউকে দেয়া হয় যে গোলটা করার মতো পজিশনে আছে, এখন সেটা রোনালদো বা বেঞ্জেমা বা বেল বা ইস্কো যে কেউ হতে পারে। এই জায়গাতেই হিগুয়েন মানিয়ে নিতে পারছিলেন না, পেরেছিলেন করিম বেঞ্জেমা। তিনি হয়ে উঠেছিলেন সত্যিকারের ‘টিম প্লেয়ার’, তাই টিকেও গেছেন তিনি।

আনচেলত্তি বা জিদানের মাদ্রিদ স্কোয়াডে বেঞ্জেমা ছিলেন গুরুত্বপূর্ন বা অপরিহার্য সদস্য। স্ট্রাইকার হয়েও মাঠে থাকে অনেকাংশে সেকেন্ড স্ট্রাইকার বা নাম্বার ‘টেন’ রোল প্লে করতে দেখা যেত। স্পেস ক্রিয়েট করায় ছিল বেঞ্জেমার মূল লক্ষ্য। এভাবে মাদ্রিদের দলগত অসধারণ গোলগুলো বের হয়ে আসতো। একজন নাম্বার নাইন হয়েও, একজন উইঙ্গার রোনালদোকে তিনি যেভাবে পুরোদমে গোলস্কোরার হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছেন তা তাকে ম্যানেজারদের বিবেচ্য তালিকায় সবসময় উপরের সারিতে রাখতে সাহায্য করে। রোনালদোকে ডি-বক্সে জায়গা করে দিয়ে, তিনি উঠেছেন উইং এ, খেলা বানিয়ে দিয়েছেন সেখান থেকেই। তাহলে কি এভাবে বলা যায়, বেঞ্জেমা রোনালদোর জন্য নিজের মূল প্লেয়িং স্টাইল স্যাক্রিফাইস করেছেন? আসলে করেছেন, তবে শুধু রোনালদোর জন্য না বরং পুরো মাদ্রিদের জন্য।

জিনেদিন জিদান যুগে গ্যারেথ বেলও উপেক্ষিত বা অনিয়মিত ছিলেন শুধুমাত্র বেঞ্জেমার মতো খেলায় স্পেস ক্রিয়েট করতে পারতেন না বিধায়! জিজু তো বলেই দিয়েছিলেন, ‘বেঞ্জেমা ৫০ গোল করার মতো খেলোয়াড় নয়। কিন্তু তার এমন কিছু গুণ আছে যার জন্য আমার তাকে লাগবে।’ অথচ জিদানের সময়ই নাম্বার নাইন হিসেবে সবচেয়ে বাজে সময় পার করেছেন বেঞ্জেমা, ছিলেন অধারাবাহিক। গোলের দেখা পাননি সেভাবে, মিস করেছেন অনেক সহজ গোল। একের পর এক দৃষ্টিকটু শট নিয়েছেন। আমরা সাধারণ, স্বাভাবিক চিন্তা দিয়ে এসব দেখে বেঞ্জেমা, জিদান দুইজনকেই একহাতে নিয়েছি। সমর্থক হয়েও ‘ফ্রেঞ্চ কোটা’ বলে বিরক্তিমাখা হাস্যরস করেছি। আর জিদান ডাগআউটে দাঁড়িয়ে বেঞ্জেমাকে নিয়ে তার ফরমেশনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আদায় করে নিয়েছেন, এনেছেন একের পর এক সফলতা।

রোনালদো ইতালিয়ান জায়ান্ট জুভেন্টাসে পাড়ি জমিয়েছেন এই মৌসুমের শুরুতে। রিয়ালের ডাগআউতে জিনেদিন জিদানও নেই। তবে বেঞ্জেমা আছেন। অল্প কদিনের লোপেতেগুই যুগ পেরিয়ে রিয়াল সদ্যই প্রবেশ করেছে সোলারি যুগে। অন্তর্বর্তীকালীন কোচ সোলারি দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচেই বেঞ্জেমা গোল করেছেন। বেঞ্জেমার ভূয়সী প্রশংসা করে এটাও জানান দিয়েছেন, বিগত ম্যানেজারদের মতোই করিম বেঞ্জেমার প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি বেশ ইতিবাচক। ব্যাপারটা অনেকটা এমন দাঁড়িয়ে গিয়েছে যে, বেঞ্জেমার ভূমিকা এমনে এমনে বোঝা যাবে না। এটার জন্য ডাগআউটে দাঁড়ানোর মতো রীতিমতো ফুটবল মস্তিষ্কের প্রয়োজন আছে। তবে যদি বোঝা যায় আরকি, করিম বেঞ্জেমার মতো ফুটবলারকে কেন এতটা দরকার একটা দলের!

তারপরেও বলি, একজন সাধারণ সমর্থক হয়ে আমি আজো বুঝলাম না স্পেস ক্রিয়েট করেই কেমনে একজন এতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়, যেখানে তিনি বারবার মিস করেন সহজ সুযোগগুলো। খেই হারিয়ে ফেলেন বিপক্ষ দলের সীমানায়। তাকে ব্যাখ্যা করতে গেলে, নানান ট্যাকটিক্যাল রিপোর্ট পড়ে তারপর গিয়ে আলোচনায় বসা লাগে।

আমি অবশ্য বেঞ্জেমাকে ব্যাখ্যা করি, শাহরুখ খানের শ্রদ্ধেয় পিতার ভাষাতেই। বেঞ্জেমাকে দেখলে সেই কথায় যেন খুঁজে পাই বারবার। ‘বেঞ্জেমা হয়তো সত্যিই মাঠে কিছুই করেন না, তাই হয়তো তিনি চমৎকার করেন!’

Comments

Tags

Related Articles