একটা প্রশ্নের সাথে আমরা অনেকেই পরিচিত, বিশেষ করে যারা বিসিএস পরীক্ষা দিচ্ছেন বা দেবেন। প্রশ্নটা হল- ‘চর্যাপদের কোন কবি নিজেকে বাঙালি বলে পরিচয় দিয়েছেন?’ উত্তর হচ্ছে- ভুসুক পা। এটা শুনে আসলে আমোদিত হবার কিছু নেই। সেই পদটা আসলে কী ছিল দেখা যাক-

“আজি ভুসুক বাঙ্গালী ভইলি
নিঅ ঘরিণী চণ্ডালে লেলি- “

সুকুমার সেন অনুবাদ করেছেন-

“আজিকে ভুসুক হলি বাঙ্গাল
আপন গৃহিণী তোর লইল চণ্ডাল।”

এখানে ভুসুক পা যে নিজেকে বাংলার অধিবাসী অর্থে বা বাংলার প্রতি ভালোবাসা থেকে নিজেকে ‘বাঙ্গাল’ বলেছিলেন,ব্যাপারটা এমন নয়। তখনো বঙ্গের অধিবাসী হিসেবে বাঙ্গাল বা বাঙালী শব্দের ব্যবহার শুরুই হয়নি। তখনো এই অঞ্চল পরিচিত ছিল ‘গৌড়’ নামে। ভুসুক পা নিজেকে বাঙাল বলেছেন ‘অধঃপতিত’ অর্থে! তিনি কেন নিজেকে অধ:পতিত ভাবছেন- সেটাও উল্লেখ করেছেন- ‘নিঅ ঘরিণী চণ্ডালে লেলি-‘ অর্থাৎ তার স্ত্রীকে চণ্ডাল গ্রহণ করায় তিনি আজ বাঙ্গালি হলেন! অর্থাৎ জাত খোয়ালেন বা অধঃপতিত হলেন।

জাত খোয়ানো বা অধঃপতিত অর্থে ‘বাঙ্গাল’ শব্দটি তিনি ব্যবহার করেছেন! সেসময়ের সংস্কৃত শাস্ত্রেও বলা হয়েছে, “বঙ্গে যেওনা, কারণ সেটা হল ব্রাত্যদের দেশ।” কাজেই যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘চর্যাপদের বাঙালি কবি কে?’- তবে প্রশ্নটা ভুল। ‘কোন কবি নিজেকে বাঙালি বলেছেন?’- এই প্রশ্নটা মোটামুটি সঠিক, তবে এই বাঙালি ‘জাতি’ অর্থে বাঙালি নয়, অধঃপতিত নেতিবাচক অর্থে!

আমার প্রশ্ন হলো, সেই প্রাচীন চর্যাপদের সময়কার কবি ‘অধঃপতিত’-এর সমার্থক হিসেবে ‘বাঙ্গাল’ শব্দটি ব্যবহার করলেন কেন? তবে কি সেই প্রাচীনকাল থেকেই এখানকার মানুষের এমন কোন নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য ছিল, যার জন্য এই অঞ্চলের মানুষদের বিরূপ দৃষ্টিতে দেখা হতো? আবার বাঙালিদের দুর্নীতির প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায় মুঘল আমলে। এ থেকে বলা চলে, ‘ধারাবাহিতা’ অক্ষুণ্ণ ছিল বৈকি!

বাঙালির বৈশিষ্ট্য গুলো সুন্দর করে বর্ণনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বিদ্যাসাগর সম্পর্কে রচিত এক প্রবন্ধে তিনি বলেন-

“আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না; আড়ম্বর করি, কাজ করি না; যাহা অনুষ্ঠান করি তাহা বিশ্বাস করি না; যাহা বিশ্বাস করি তাহা পালন করি না; ভূরি পরিমাণ বাক্যরচনা করিতে পারি, তিলপরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারি না; আমরা অহংকার দেখাইয়া পরিতৃপ্ত থাকি, যোগ্যতা লাভের চেষ্টা করি না; আমরা সকল কাজেই পরের প্রত্যাশা করি, অথচ পরের ত্রুটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ করিতে থাকি; পরের অনুকরণে আমাদের গর্ব, পরের অনুগ্রহে আমাদের সম্মান, পরের চক্ষে ধূলিনিক্ষেপ করিয়া আমাদের পলিটিকস্‌, এবং নিজের বাক্‌চাতুর্যে নিজের প্রতি ভক্তিবিহ্বল হইয়া উঠাই আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য।”

বাঙালিরা আজ যাদের নিয়ে গর্ব করে, সেই মহান ব্যক্তিদেরকেও কিন্তু স্বজাতির বিরোধীতা মোকাবিলা করতে হয়েছিল প্রতি পদে পদে। রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ – এঁরা কেউ এর ব্যতিক্রম নয়। সত্যি কথা বলতে, এনারা নিজেদের ‘বাঙালিত্ব’ অতিক্রম করতে পেরেছিলেন বলেই এনারা মহান, এনারা অসাধারণ কিছু কাজ করে যেতে পেরেছিলেন, এনারা ‘বাঙালি’ থেকে ‘মানুষ’ এ পরিণত হয়েছিলেন! তবে দুঃখের ব্যাপার এটাই যে, এরকম বিশ্বনাগরিক ‘মানুষ’ আমাদের বাঙালিদের মধ্যে খুব বেশি আসেনা, কালেভদ্রে দু-একজন আসেন। অসম্ভব বাধার মধ্য দিয়ে স্বজাতির উন্নয়নে কাজ করে যান এবং এই বাধা আসে আমাদের থেকেই। আর পরবর্তীতে এদেরকেই ‘আদর্শ বাঙালি’ উপাধি দিয়ে আমরা নিজেদের জাতে উঠানোর চেষ্টা করি। ঠিক যেমন সেই সময়ে ‘মুরতাদ’ ঘোষিত ইবনে সিনা আজ ‘মুসলিম মণীষী’!

সেই চর্যাপদের সময় থেকেই আমরা অধ:পতিত। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘রেখেছো বাঙালি করে, মানুষ করোনি’। (খেয়াল করুন- রবীন্দ্রনাথও কিন্তু ভুসুক পা’র মতো নেতিবাচক অর্থেই ‘বাঙালি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন!)

কিন্তু আমরা ‘মানুষ’ হব কবে? আরো কত শতাব্দী পর? বর্তমানে এই অঞ্চলের সমস্যা তো আরো জটিল। ‘মুসলিম বাঙালি’ নামের এই জটিল মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা আমাদের করেছে আরো অধ:পতিত। এখান থেকে উত্তরণের সহজ কোন রাস্তা আছে বলে মনে হয় না!

তথ্যসূত্র : হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি – গোলাম মুরশীদ, বিদ্যাসাগর চরিত- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Comments
Spread the love