এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ডহেঁশেলের খোঁজ-খবরাদি

বাঙালী মুরগির ঝোলের জাপান জয়!

জাপানের রাজধানী টোকিওর শিনজুকু এলাকায় নাকামুরায়া নামের একটি রেস্টুরেন্ট আছে। রেস্টুরেন্টটিতে প্রায় নয় দশকেরও বেশি সময় ধরে অন্য আরও কিছু রেসিপির সাথে কিছুটা ভারতীয় স্বাদের, সুস্বাদু একধরণের মুরগির ঝোল বা চিকেন কারির রেসিপি খুবই জনপ্রিয়। জাপানী এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল, যারা কারি পছন্দ করেন কিন্তু এই নাকামুরায়া চিকেন কারির নাম শোনেননি।

এই চিকেন কারির সাথে জড়িয়ে আছে এক ভারতীয় বাঙালী বিপ্লবীর জীবনকাহীনি। প্রেমকাহীনিও বলা যেতে পারে এটাকে। বাঙালী বিপ্লবীটির নাম রাসবিহারী বসু।

পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার সুবলদহ গ্রামে ১৮৮৬ সালের দিকে জন্মগ্রহণ করেন রাসবিহারী বসু। ১৫ বছর বয়সে তিনি ভারতীয় মিলিটারিতে যোগ দেবার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু তিনি বাঙালী বলে তার আবেদন নাকচ করা হয়। বলা হয়, বাঙালীদের ভগ্ন শারীরিক গঠনের কারণে তারা সেনাবাহীনিতে কাজ করার যোগ্য নয়। ভেঙে পড়েন রাসবিহারী বসু, মনে প্রচন্ড ক্ষোভ সৃষ্টি হয় তৎকালীন বিট্রিশ শাসিত ভারতীয় সরকারের প্রতি। এরপর, তিনি পিতার জোড়াজুড়িতে বন গবেষণা কেন্দ্রের রসায়ন বিভাগে একটা চাকরিতে যোগদান করেন। কেমেস্ট্রি বিভাগে কাজ করার ফলে তিনি বোমা কি করে বানাতে হয় তা শিখে ফেলেন, যা তাকে পরবর্তীতে বিট্রিশ বিরোধী আন্দোলনে সক্রীয় হতে সহায়তা করে।

১৯১২ সালে ভারতের বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জের গাড়িতে বোমা হামলা হয়। হামলায় লর্ড হার্ডিঞ্জ মারাত্মকভাবে আহত হন। ঘটনাস্থলেই মারা যান তার গাড়ির মাহুত। এই বোমা হামলার তদন্ত চলতে থাকলে ১৯১৪ সালে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উঠে আসে রাসবিহারী বসু সহ আরও কজনের নাম।

গ্রেপ্তার হলেন বেশ কয়েকজন, কিন্তু রাসবিহারীকে খুঁজে পেল না পুলিশ। গা ঢাকা দিলেন তিনি, আর তলে তলে চলতে থাকল দেশব্যাপী এক সর্বাত্মক আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশদের ভারত ছাড়া করার পরিকল্পনা। ১৯১৫ সালে লাহোরে হামলা করার পরিকল্পনা হলো, কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে সে পরিকল্পনাও ফাঁস হয়ে গেল।। শুরু হলো লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা।

পুলিশ এবার হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করল রাসবিহারী বসুকে। তিনি যখন দেশ ছাড়ার সুযোগ খুঁজছেন জানতে পারলেন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাপান ভ্রমণে যাবেন, এ সুযোগ গ্রহণ করলেন বোস। রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়ের ছদ্মবেশে দেশ ছাড়লেন তিনি। পাড়ি জমালেন জাপানে। আশ্রয় নিলেন সেখানকার প্রভাবশালী এশীয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ তোওমা মিৎসুরুর বাড়িতে। সেখানেও ব্রিটিশরা খোঁজ পেয়ে গেল তার। বিপদ আঁচ করতে পেরে তোওমা মিৎসুরু রাসবিহারী বসুকে সরিয়ে দিলেন বন্ধু সোওমা আইজোর বাড়িতে। সেখানেই প্রায় স্থায়ীভাবে নিরাপদে বসবাস শুরু করলেন বসু।

সোওমা আইজোর বাড়িটা ছিল টোকিওর শিনজুকু এলাকায়। বাড়ির নিচতলায় “নাকামুরায়া” নামের একটি বেকারী ছিল। সুস্বাদু রুটি তৈরি হত সেখানে। ১৯০১ সালে তৈরী ওই দোকানটি বেশ নামডাকও করেছিল। তারই উপরতলার একটি ঘরে থাকতে শুরু করেন বসু। সেখানকার সবার কাছে তিনি পরিচিত হলেন শুধু বিহারী বোস নামে।

ধীরে ধীরে রাসবিহারীর পলাতক নিঃসঙ্গ প্রবাসজীবনের সঙ্গী হয়ে ওঠেন নাকামুরায়া পরিবার। সোওমা আইজোর কন্যা তোশিকো তাকে মানসিকভাবে সে সময় অনেক সাপোর্ট দেন। ফলে একপর্যায়ে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তারা, বিয়ে করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ১৯১৮ সালের দিকে সাজা মওকুফ করা হয় রাসবিহারী বসুর। দেশে ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু বেশিদিন থাকতে পারেন না। তোশিকোর ভালবাসার টানে আবার জাপান ফিরে যান তিনি। কিন্তু সেখানেও দূর্ভাগ্য তাড়া করে ফেরে তাকে। বেশিদিন টেকেনি তার বিবাহিত জীবন। মাত্র ২৬ বছর বয়সে ১৯২৫ সালে যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান রাসবিহারীর স্ত্রী তোশিকো।

স্ত্রীবিয়োগের পরেও শ্বশুর-শ্বাশুরীর সাথে অনেকদিন জাপানেই থেকে যান বিহারী বোস। সন্তানহারা শ্বশুর-শ্বাশুরীকে সাহায্য করতেন বেকারীর কাজে। বছর দুয়েক বাদে, বিহারী বোস তাদেরকে তাদের বেকারীতে রুটির পাশাপাশি মুরগির ঝোল বা কারি এবং ভাত পরিবেশনের প্রস্তাব দিলেন। জামাইয়ের প্রস্তাব লুফে নিলেন আইজো। ১৯২৭ সালে শুরু হলো নাকামুরায়া  রেস্টুরেন্টের যাত্রা। ভারতীয় ভাত আর মুরগীর ঝোল বিক্রি শুরু হলো সেখানে। দোকানের নামেই সেই মুরগির ঝোলের নাম দেওয়া হলো, নাকামুরায়া চিকেন কারি।

এর আগেও অবশ্য মুরগির একরকম কারি বিক্রি হত জাপানে। ১৯১০ সাল নাগাদ প্রচলিত সে কারির নাম ছিল রাইসু কারি বা কারি রাইসু, যা মূলত ব্রিটিশ পদ্ধতিতে তৈরি হতো। রান্না করা সহজ বলে বেশ জনপ্রিয়ও ছিল সেটি।

তবে, রাসবিহারী বসুর যে রেসিপি নাকামুরায়া রেস্টুরেন্টে প্রচলিত আছে তার স্বাদ রাইসু কারির থেকে অনেকটাই আলাদা। জাপানীদের স্বাদ বুঝেছিলেন রাসবিহারী বসু। একারণে তার রেসিপি ভারতীয়দের থেকেও কিছুটা আলাদা। সেজন্যই এত বছর পরেও জাপানে অতি জনপ্রিয় এই নাকামুরায়া চিকেন কারি।

টোকিওতে গিয়ে যারা নাকামুরায়া চিকেন কারি খেয়েছেন তাদের মতে, কড়া রং নেই এ তরকারিতে, পাতলা ঝোলও থাকে না, বেশ ঘন। তবু খুব সুস্বাদু আর সুগন্ধী এই ভারতীয় মুরগীর ঝোল।

নাকামুরায়া রেস্টুরেন্টের শেফ তাকেশি একটি সাক্ষাতকারে জানিয়েছিলেন, “আমরা ময়দা মিশিয়ে ঝোলটা গাঢ় করি না। সবজি সেদ্ধ হতে হতেই ঝোল ঘন হয়ে যায়। হাল্কা স্বাদের এই কারিতে এমন সব মশলা মেশানো হয়, যেগুলোর ভেষজ গুণও রয়েছে, তাই নিয়মিত খেলেও স্বাস্থ্যহানির কোনও আশঙ্কা থাকে না।”

এখনও জাপানের টেলিভিশন অনুষ্ঠানে নাকামুরায়া চিকেন কারির প্রসঙ্গ এলে রাসবিহারী বসুর কথাও উঠে আসে। যদিও রেস্তোঁরার মালিকানা বদল হয়েছে, নতুন সাজে সেজেছে সেটি, কিন্তু এখনও সেখানে রাখা আছে রাসবিহারী বসু আর তাঁর স্ত্রীর ছবি। রয়েছে একটি পুরনো পোস্টার, যাতে লেখা আছে, “ আমরা ভারতীয় কারি পরিবেশন করি, যেটা জাপানে নিয়ে এসেছিলেন এক ভারতীয় বিপ্লবী”।

শেষ কথা: একদিকে যখন দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে রাসবিহারী বসুর তৈরী ভারতীয় কারি, অন্যদিকে আবার আজাদ হিন্দ ফৌজ সংগঠিত করার কাজও কিন্তু চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। স্বপ্ন দেখতেন একদিন ভারত স্বাধীন হবে। ভারত ঠিকই স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু তা দেখে যেতে পারেন নি রাসবিহারী বোস। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার কয়েকদিন আগেই যক্ষায় ভুগে মৃত্যু হয় তাঁর।

মৃত্যুর এত বছর পরও এই বাঙালি বিপ্লবীর তৈরী মুরগির ঝোল ভাত অনেক জাপানীদের কাছেই অনেক জনপ্রিয়। তাইতো কিছুদিন আগেই নাকামুরায়া চিকেন রেসিপির নব্বই বছর পূর্তি উৎসব পালন করল টোকিওর প্রসিদ্ধ নাকামুরায়া রেস্টুরেন্ট।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close