সিনেমা হলের গলি

বেলাশেষে-প্রাক্তনে বাঙালির মন জয় করেছেন যে জুটি

আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে একটা সময় ছিল যখন পশ্চিমবঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের কোন নতুন সিনেমা মুক্তি পেলেই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের সিংহভাগ মানুষ হলে ছুটত। একজন আরেকজনকে বলত, ‘চলো, মানিকদার/সত্যজিৎ রায়ের নতুন সিনেমা এসেছে, ফ্যামিলির সবাই মিলে কোন এক সন্ধ্যায় সিনেমাটা দেখে আসি।’

তারপর বহুদিন কেটে গেছে। কিন্তু ভারতীয় বাংলা সিনেমায় আর এমন কোন চলচ্চিত্র নির্মাতা আসেনি যার নতুন সিনেমা এলেই সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণী তথা শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মাঝে উৎসবের আমেজ তৈরী হয়।

বর্তমানে অবশ্য এমন ‘একজন’ নির্মাতার আগমন ঘটেছে।

না, আমি সৃজিৎ মুখার্জীর কথা বলছি না। কিংবা কৌশিক গাঙ্গুলী, অরিন্দম শীল, কমলেশ্বর মুখার্জী বা অঞ্জন দত্তও নন। আমি বলছি শিবপ্রসাদ মুখার্জী ও নন্দিতা রায়ের কথা। তারা সব সিনেমা একসাথেই নির্মাণ করেন, এজন্যই তাদের দুজনকে এক করে ‘একজন’ বলা।

পশ্চিমবঙ্গের সিনেমা সম্পর্কে যাদের ঝাপসা ঝাপসা ধারণা আছে, তাদের মনে হতেই পারে সৃজিৎ বা অন্যরা কেন নয়, কেন আমি শিবপ্রসাদ-নন্দিনীর কথাই বলছি। তার কারণ হলো, সৃজিৎ-ই বলুন কিংবা কৌশিক, অরিন্দম, কমলেশ্বর বা অঞ্জন দত্ত, তাদের কারও সিনেমাই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের পুরোটা অংশে পৌঁছায়নি।

শিক্ষিত মধ্যবিত্তকে তো আর শুধু শিক্ষা দিয়েই বিচার করলে চলে না, তাদের নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ আছে, রুচিবোধ আছে, আর তার সাথে লিঙ্গ তো একটা বিশাল বড় ফ্যাক্টর অবশ্যই। যাদের নাম করছি, তাদের সিনেমাগুলোতে ইন্টেলেকচুয়াল ব্যাপার স্যাপারই যে শুধু বেশি থাকে তা নয়। সেক্স, ভায়োলেন্স ইত্যাদিও মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে থাকে, যা পরিবারের সবাই মিলে সিনেমা দেখার ক্ষেত্রে একটা বড় অন্তরায়।

তারপর সিনেমার বিষয়বস্তুও একটা বড় নিয়ামক। গোয়েন্দা বা থ্রিলার টাইপের গল্প যে অধিকাংশ শিক্ষিত বাঙালিই পছন্দ করে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু আবার এই বাঙালিদের মাঝেই একটা বড় অংশ আছে যারা এসব কাল্পনিক, মনগড়া কাহিনীর সাথে রিলেট করতে পারে না। সেই অংশটার কথাও তো ভুলে গেলে চলবে না।

আর তাই সৃজিৎ, কৌশিক, অরিন্দম, কমলেশ্বররা নির্দিষ্ট শ্রেণীর দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও, প্রকৃত অর্থে ‘সার্বজনীন’ হয়ে উঠতে পারেননি। আর এই সার্বজনীন হয়ে ওঠার ক্ষেত্রেই শিবপ্রসাদ-নন্দিতার সার্থকতা।

হ্যাঁ, পুরস্কার কমবেশি এই জুটিও পান, তবে পূর্বোল্লিখিত পরিচালকদের মত অত বেশি না। তাই মিডিয়ার আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দুতেও তারা সবসময় থাকেন না। কিন্তু মিডিয়া পাত্তা দিক বা না দিক, দর্শকমনে শিবপ্রসাদ-নন্দিতা ঠিকই জায়গা করে নিয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘চাঁদের পাহাড়’ বাদে প্রায় সব ব্যবসাসফল সিনেমাই তো তাদের।

কারণ, সেই সত্যজিৎ রায়ের আমলের মত, বর্তমানে আবারও বাঙালির একটা রীতি গড়ে উঠেছে। ছুটির দিন ফ্যামিলির সাথে কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করা মানেই দুপুরে কোন আত্মীয়ের বাসায় যাওয়া, বিকেলে পার্ক কিংবা গঙ্গার পাড়ে হাঁটতে যাওয়া, আর সন্ধ্যায় আইনক্সে শিবপ্রসাদ-নন্দিতার লেটেস্ট রিলিজ পাওয়া সিনেমাটা দেখে, পাশের ফুড কোর্ট থেকে ডিনার সেরে বাড়ি ফেরা।

এমন অনেক বাঙালি পরিবার আছে যারা হয়ত প্রতি বছর একবারই সিনেমা দেখতে যায়। গরমের ছুটিতে, পুজোর ছুটিতে নয়ত স্কুল এক্সামের পর। সেই সিনেমাটা যদি ফেলুদা বা ব্যোমকেশ না হয়, তাহলে অবশ্যই শিবপ্রসাদ-নন্দিতার সিনেমাই হয়।

এর কারণ কী? কারণটা খুবই সহজ। শিবপ্রসাদ-নন্দিতা জুটি মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালির পালসটা ঠিকমতো ধরতে পেরেছেন। উদাহরণস্বরূপ ‘বেলাশেষে’র কথাই ধরুন। এ সিনেমায় সেক্স সিন বা ভালগার ডায়লগ যেমন আছে, তেমনি ফ্যামিলি ড্রামা আর ইমোশনও আছে। তাই দিনশেষে ‘বেলাশেষে’ কেবল নির্দিষ্ট শ্রেণীরই কুক্ষিগত থাকে না। যাকে বলে ‘পরিবারের সবাই মিলে দেখার মত সিনেমা’, ঠিক তাই হয়ে ওঠে।

একই কথা এখন পর্যন্ত এ জুটির মুক্তিপ্রাপ্ত প্রায় সব সিনেমার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ‘ইচ্ছে’, ‘মুক্তধারা’, ‘এক্সিডেন্ট’, ‘অলীক সুখ’, ‘বেলাশেষে’, ‘রামধনু’, ‘প্রাক্তন’ বা ‘পোস্ত’, প্রতিটা সিনেমাই প্রায় একই ফর্মুলায় নির্মিত – সিনেমায় বিনোদনের সব উপাদানই থাকবে, কাহিনীতে ইমোশনাল টাচ থাকবে, মানবিক সম্পর্কের গল্প হবে, আর সেট-আপ বা প্রেক্ষাপট হবে একদমই মধ্যবিত্ত বাঙালির জীবনঘেঁষা।

‘ইচ্ছে’র কাহিনী যেমন সন্তানের জীবনে বাবা-মায়ের মাত্রাতিরিক্ত হস্তক্ষেপ, কিংবা ‘রামধনু’র কাহিনী যেমন ছোট ছোট বাচ্চাদের উপর ভালো স্কুলে এডমিশন পাওয়ার জন্য যেরকম চাপ দেয়া হয় তা নিয়ে, অথবা ‘পোস্ত’র কাহিনী যেমন ওয়ার্কিং প্যারেন্টসদের সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারা নিয়ে।

এই ইস্যুগুলো শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের নিত্যদিনের অংশ, তাই বড়পর্দায় এগুলোকে প্রদর্শিত হতে দেখে তারা খুব সহজেই রিলেট করতে পারে, এবং বোধগম্য সম্মোহনীশক্তির টানে বারবার সিনেমাটা দেখতে যায়। আর তাই শিবপ্রসাদ-নন্দিতার সিনেমা যে সুপার ডুপার হিট হয় এতে আর আশ্চর্যের কী আছে!

তবে ইদানিং সমস্যাটা হচ্ছে অন্য জায়গায়। অনেকেরই অভিযোগ এই পরিচালক জুটি ন্যাকা ন্যাকা আবেগ দেখিয়ে বাঙালির মানসিকতায় ভুল চিন্তাচেতনা বা মূল্যবোধ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এবং যারা খুব মন দিয়ে ‘বেলাশেষে’ বা ‘প্রাক্তন’ দেখেছেন তারা এই অভিযোগগুলোকে একেবারে উড়িয়েও দিতে পারবেন না।

এই পরিচালক জুটির প্রথম সিনেমা ‘ইচ্ছে’তে একটা লাইন ছিল এরকম, ‘লাইফে কখনো কখনো কম্প্রোমাইজ হয়ত করা যায়, কিন্তু স্যাক্রিফাইস না। কম্প্রোমাইজ মানে তুমিও কিছুটা দিলে, আমিও কিছুটা দিলাম। কিন্তু স্যাক্রিফাইস মানে তো একজন শুধু দিয়েই গেল, আর অন্যজন শুধু নিয়েই গেল।’

অর্থাৎ কম্প্রোমাইজ ও স্যাক্রিফাইস যে পারস্পরিক সাংঘর্ষিক, সেটা পরিচালকদ্বয়ের অজানা নয়। অথচ ‘প্রাক্তন’-এ এরই বিপরীত আইডিওলোজি জোর করে দর্শকমনে ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা দেখা যায়।

‘বেলাশেষে’র মত ইতিহাস গড়া সিনেমাও বিতর্কের উর্ধ্বে নয়। পরিচালকদ্বয় হয়ত ভিন্ন কিছু বোঝাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সাধারণ দর্শক যা বুঝেছে তা হলো – নারীর স্বাবলম্বী হয়ে কাজ নেই। সে বরং ঘরে বসে স্বামীর সেবাই করুক। তাহলে সংসার সুখের হবে, জীবনও হবে স্বস্তির (আনন্দের নয় কিন্তু)।

আবার তাই বলে কেউ যেন শিবপ্রসাদ-নন্দিতাকে বাতিলের খাতায়ও ফেলে না দেয়। ‘মুক্তধারা’, ‘রামধনু’র মত মাস্টারপিস তো এসেছে তাদেরই হাত ধরে। প্রশ্নবিদ্ধ সমাপ্তি না থাকলে ‘ইচ্ছে’কেও সেই তালিকায় রাখা যেত। তাই নতুন ধরণের, চিন্তা উদ্রেককারী, ব্যবসাসফল বাংলা সিনেমা নির্মানে এই পরিচালক জুটির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।

শুধু একটাই আশা থাকবে, অধিকাংশের মনরক্ষার তাগিদে তারা যেন ভুল আদর্শ প্রচার না করেন।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close