তারুণ্যপিংক এন্ড ব্লু

‘বিউটি’র সাথে ‘ব্রেইন’ থাকাটা কি অবিশ্বাস্য ঘটনা?

‘রূপবতী’ মেয়েদের নিয়ে একটা ইংরেজি শব্দ খুব প্রচলিত। শব্দটা হচ্ছে ‘বিউটি উইথ ব্রেইন’! এই শব্দ শুনে অনেকেই আনন্দিত হন, আমি হই দ্বিধান্বিত। ‘হিউম্যান উইথ ব্রেইন’, কিংবা হিউম্যান উইথ আইজ, লেগস, হ্যান্ডস, নৌজ, এই কথাগুলো বললে সেটি যেমন মুহূর্তেই সেই পার্টিকুলার হিউম্যানবিইং- এর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে একটা সন্দেহজনক, এক্সোটিক ধারণা দেয়। অর্থাৎ স্পেশালাইজেশন করায় যে সেই মানুষটির ব্রেইন, হাত, পা, মাথা, নাক চোখ, থাকাটা অস্বাভাবিক, কিন্তু ঘটনাচক্রে, বিশেষ কারণে সেগুলো থেকে গেছে বলে সেটিকে আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হয়েছে!

বিউটি উইথ ব্রেইন বিষয়টিও আমার কাছে তেমনই মনে হয়। এ যেন এমন যে, রূপবতীদের ব্রেইন থাকতে নেই, থাকলে সেটি বিশেষ কোন ঘটনা! কিংবা বিউটি ও ব্রেইন রীতিমতো বিপরীতমুখী, সাংঘর্ষিক দুটি আলাদা বিষয়, তাই আলাদা করে সেটি উল্লেখ করতে হয়।

আমার এই ধারণার সত্য মিথ্যা জানিনা। আমি সাধারণীকরণ বা জেনারেলাইজেশনে বিশ্বাসী না। তবে তারপরও ব্যক্তিগত কিছু অবজার্ভেশন আমাকে একটি ভাবনা ভাবায় যে, একজন তথাকথিত রূপবতী মেয়ের এই বিউটি উইথ ব্রেইন ভাবনায় তার স্পেশাল হয়ে ওঠার যে প্রচলিত প্রতিষ্ঠিত কনসেপ্ট, তা তৈরিতে আমাদের দায়ও কম নয়!

বিউটি উইথ ব্রেইন, মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ, সুন্দরী প্রতিযোগিতা, সাদাত হোসাইন

আমি নিজে আমার ফেসবুক প্রোফাইলে, বন্ধু তালিকায় কিছু ‘রূপবতী’ মেয়েকে দেখি, যারা প্রতিদিন গড়ে সম্ভবত, ডজনখানেক ছবি আপলোড করে থাকেন। নানান রঙে, নানান ঢঙে, নানান সঙে। এবং এছাড়া সম্ভবত ফেসবুকে তাদের আর কোন কাজ নেই! আমিও অতি আগ্রহ নিয়ে তাদের সেসকল ছবিতে লাভ, বা ওয়াও রিয়েক্ট দেই। এতে নিঃসন্দেহে তিনি আপ্লুত, অনুপ্রাণিত হন, যেমন আমি হই আমার লেখায় কেউ ওরকম রিয়েক্ট দিলে!

ফলে, তিনি এমন আরও অসংখ্য রিয়েক্ট পাওয়ার আনন্দে ক্রমাগত তার আলোকজ্জল, হাস্যোজ্জ্বল, সুইট, কিউট, হট, হন্টনের, বন্টনের, খাদ্যগ্রহণের, বর্জনের, অর্জনের, গর্জনের ছবি আপলোডের সংখ্যা বাড়িয়ে দেন। বাড়াতেই থাকেন।

এবং ক্রমাগত প্রশংসায় আশংকা দূরীভূত হতে থাকে। তিনি আত্মবিশ্বাসী হতে থাকেন। এই প্রশংসা, আলাদা ট্রিটমেন্ট তিনি তার ঘর থেকে বাহির, বাহির থেকে পর, পর থেকে আপন, বাসে, ট্রেনে, হাটে, বাজারে, স্কুলে কলেজে, শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক, রক্ষক থেকে ভক্ষক, সকল তরফ থেকেই পেতে থাকেন। যা তাকে ক্রমাগত কনফিডেন্ট করে তোলে। তার এই বিশ্বাস জন্মায় যে রূপ বা সৌন্দর্য্যই তার আল্টিমেট পাওয়ার, নলেজ নহে।

মিস ওয়ার্ল্ড, মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ, অন্তর শোবিজ, স্বপন চৌধুরী, অব্যবস্থাপনা

অথচ জ্ঞান আহরণ এক দীর্ঘ কষ্টকর প্রক্রিয়া, অধ্যবসায়, চেষ্টা, পরিশ্রমের ফসল। অন্যদিকে, ‘সৌন্দর্য্য’ জন্মগত, সহজাতভাবে প্রাপ্ত। এটি আহরণে তার পরিশ্রম, মেধা, অধ্যবসায়ের দরকার নেই। অথচ তা তাকে ঘরে বাইরে, সকল পরিসরে আলাদা সুবিধা, সম্মান, গ্রহণযোগ্যতা, ঠু সাম এএক্সটেন্ড সফলতাও দিয়েছে। সুতরাং, অত পরিশ্রম অন্যদিকে না দিয়ে, তার কিয়দাংশও যদি রূপ বা ‘শ্রীবৃদ্ধি’তে দেয়া যায় তবে তা অনেকটা ‘অল্প বিনিয়োগে অধিক মুনাফা অর্জন’- এর মতো বিষয়। তো, সেটিই কী তার জন্য অধিক গ্রহণযোগ্য কাজ নয়?

নিশ্চয়ই।

তো এই অনুশীলনতো চলছেই, চলবেই। এ নিয়ে আঁতকে ওঠার কী দরকার! ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট আসলেই জায়গা ফাঁকা না থাকলেও আপাতদৃষ্টিতে অতিব রূপবতি তরুণীর ছবিওয়ালা প্রোফাইলটিকে এড করতে মন আনচান করে। মনে হয় কাউকে রিমুভ করে হলেও করি, তা যতই ফটোশপের কারিকুরি বা ভেল্কিবাজি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকি, জানাশোনা থাকুক। কিংবা যতই ক্যান্ডিক্যাম, ড্যান্ডিক্যামের ক্যারিশমা থাকুক। এ এক আজব সম্মোহন। এই সম্মোহনে সম্মোহিতদের যারা দু চার ঘা কষে লাগাতে চান, তারাও আসলে একই দোষে দুষ্টু, কিংবা গুণে গুণান্বিত।

বিউটি উইথ ব্রেইন, মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ, সুন্দরী প্রতিযোগিতা, সাদাত হোসাইন

ফলে ওইসকল বিউটি বা রূপবতীরা তাদের ফেসবুক প্রোফাইলেও দিনে অন্তত কুড়িবার ছবি পোস্ট করাকে তাদের দায়িত্ব কিংবা অবশ্য কর্তব্য মনে করেন। ক্ষণে ক্ষণে আয়না দেখেন, মেকাপ মাখেন, কাপড় কেনেন, পরেন, ছবি তোলেন, পোস্ট করেন, প্রশংসা শোনেন। এই প্রশংসা শোনার লোভ আমাদের সকলেরই। তা আপনি যদি তাতে ‘বিউটি উইথ ব্রেইন’ যুক্ত করে তাদের ব্রেইন থাকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেও করেন, তাতে আর এমন কী বোধ জাগ্রত হবে? প্রশংসা পাওয়ার নেশা বড় নেশা!

তারা নিজেরাও তাই মেনে নেন, বিউটির সাথে ব্রেইন থাকা কী বিরাট, কী অবিশ্বাস্য, কী বিস্ময়কর এক ঘটনা! আর শেষ অবধি তাতো প্রশংসাই বটে!

সুতরাং, সুন্দরী প্রতিযোগিতায় যদি ওসব ঘটে, এতো আঁতকে উঠবেন না, জনাব/জনাবা!

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close