৫০০ টাকায় কিভাবে কলকাতায় ঘুরে আসবেন আমি এমন কিছু লিখবো না। আমি যা করেছি-দেখেছি-খেয়েছি, তা নিয়েই লিখবো।

প্রথমত, স্বাভাবিকভাবেই বেনাপোল পার হয়ে একটা ক্যাব ভাড়া নিলাম যা নিয়ে যাবে হোটেল পর্যন্ত (মারকুইস স্ট্রিটে)। ঢাকায় থাকা এক ফ্রেন্ডের কাছ থেকে ইন্ডিয়ান সিম আগেই নিয়ে নিয়েছিলাম। বনগাঁও এর পাঁশটায় আসতেই দেখা যাচ্ছে সব মেয়েরা সাইকেল চালিয়ে বাজারে যাচ্ছে ,এদিকে সেদিকে যাচ্ছে, এমনকি শাড়ি পরেও। (কিন্তু একজন লেখক বলেছিলেন শাড়ি পরে শুধু শুয়ে থাকা যায়)। রাস্তার এখানে ওখানে পূজা মণ্ডপের প্রস্তুতি। পূজার দু’তিনদিন আগের কথা হবে। চলতে চলতে এক ফাকে আমি সিমে ১৫০ রুপী দিয়ে ৩ জিবি ঢুকিয়ে নিলাম।দোকানদার দাদা বলল টক টাইমটাও ভরে নাও না। নেইনি। কার সাথে কথা বলব?

২ ঘণ্টা জার্নির পর একটা রেস্টুরেন্টে যাত্রা বিরতি নিলাম সেখানে কারিশমা কাপুরের ছবি দিয়ে ঐ ছবিতে লেখা লেডিস টয়লেট আর অভিষেক বচ্চনের ছবি দিয়ে লেখা জেন্টস টয়লেট। সেখানে সামান্য চা নাস্তা করে আবার যাত্রা শুরু করতে গিয়ে দেখি ড্রাইভার তার আরেক ড্রাইভার ফ্রেন্ডকে পাঠাবে আমাদের শহরে দিয়ে আসতে, সে যেতে পারবে না। আচমকা কারণে তার মন খারাপ। যার আচমকা কারণে মন খারাপ হয় তাকে জিগ্যেস করা ঠিক না যে তার কি হয়েছে। পরের ড্রাইভার স্বাস্থ্যবান মানুষ (মোটা না)। কাইউম খান। তিনি উত্তর প্রদেশের লোক। মজার মানুষ। পান মাসালা খাচ্ছেন, পিক ফেলছেন আর উল্টা সিদা জোকস বলে মজা দিচ্ছেন। এরও প্রায় দুই ঘণ্টা পর আমরা শহরে ঢুকে যাচ্ছি।

ঐ হলুদ ট্যাক্সি ক্যাব, পানি পুরির দোকান দেখা যাচ্ছে। দেখতে দেখতে হোটেলে চলে এলাম। হোটেল আগে থেকে বুক করা ছিল। কিন্তু আমার হাতে সময় কম ছিল। আমার দেশে ফিরে আসার? না।সে দিন ইডেন গার্ডেনে খেলা ছিল ইন্ডিয়া অস্ট্রেলিয়ার। প্রথম ইনিংস শেষ। ইনিংস সব শেষ হয়ে যাক, আমার একটু খেলা দেখতে পারলেই হয়। সত্যি কথা বলতে একবার ঢুকতে পারলে আর একটা ছবি তুলতে পারলেই হয়। গুগল ম্যাপ ওপেন করে হোটেল থেকে হাঁটা দিলাম ইডেনের উদ্দেশ্যে। হাঁটতে হাঁটতে মেইন রোডে এসে এক বাসকে জিজ্ঞেস করতেই বলল উটুন দাদা, নামিয়ে দোবো।

তাকে ৬ রুপী দিয়ে এক হাত বাসের হ্যান্ডেলে আর অন্য হাত দিয়ে গুগল ম্যাপের নির্দেশনা ফলো করে যাচ্ছি। বাসের সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হাফ প্যান্ট পরা ঘর্মান্ত এক যুবক। গরম খুব বেশি ছিল। তাদের বেশিক্ষণ দেখতে দেইনি আমাকে, স্টেডিয়ামের লাইট দেখতেই নেমে গেলাম। কিন্তু নামলে কি হবে? এত আবেগ উত্তেজনা থাকলে কি হবে? টিকেট তো লাগবে। তাই না? তো পকেট থেকে ৫০০ রুপী বের করে হাতে রাখলাম আর মনে মনে দুই নাম্বার লোক খুজে যাচ্ছিলাম। কিছু কিছু সময় ভালো মানুষ এর কোন দরকার পরে না, দরকার পরে দুই নাম্বার মানুষের। অবশেষে পেলাম একজন। সে আমাকে সাইডে নিলো। আমিও রুপীটা শক্ত করে ধরলাম। সে হিন্দি বলে, টিকেট মিলেগা লেকিন রুপী লাগেগা

একটু ইতস্থত হয়ে গেলাম। ভাবলাম এই না ২০০০ রুপী চেয়ে বসে। সে একটু আকাশপানে তাকিয়ে অতঃপর আমার দিকে তাকিয়ে বলে দাদা ২০০ রুপী লাগেগা। মনে মনে হাসলাম, দ্রুত রুপী দিয়ে দৌড় দিলাম স্টেডিয়ামে। স্টেডিয়ামে খেলা দেখার আগে কিছু ছবি তুলে নিলাম। বাইরে গিয়ে ২০ রূপীর নুডলস নিলাম আর ৫০ টাকার পেপসি। নুডলসে ডিম সবজি কিছু নেই শুধু নুডলস। এটা আর কতক্ষণ চাবান যায়?

এই গরমে খেলায় মন বসছিল না। মন বসছিল গোসলে। হোটেলের দিকে রওনা হচ্ছি। গুগল ম্যাপ আর কলকাতার সাদা পুলিশকে ভরশা করে।সাদা পুলিশ খুব সাহায্য করে। সাদা বলা ঠিক হয়নি, ওরা পুলিশ শুধু সাদা ড্রেস পরা এই যা। হেঁটে হেঁটে আশপাশ দেখতে দেখতে চলে এলাম হোটেল। আসার পথে সদর স্ট্রিটটা নেড়েচেড়ে দেখে ভোজ রেস্টুরেন্টে খেয়ে রুমে ফিরলাম।

প্রথম দিনের সমাপ্তি ঘটে এভাবেই। প্রথম দিনের সমাপ্তি ঘটতে ঘটতে সামনে আসে দ্বিতীয় দিন। কিন্তু সেই রাতে সব জেনে নিলাম। কেন আমাকে উবারে চড়তে হবে কেন ওলা(উবার এর মতোই)-তে চড়তে হবে। উবের বলতে হয় সেখানে, আর উবারের একটা অপশন উবার পুল।না কোন সুইমিং পুল এর অংশ না, উবার পুল মানে শেয়ার করে উবার নেয়া। ৩ জনের মতো এক গাড়িতে, যেটা খুব সাশ্রয়ী। পর দিন বিকেলে উবারে গেলাম ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। ৬০ রূপীর মতো ভাড়া আসে। ভিক্টোরিয়া একটু দেখেই খিদে লেগে গেলো। তাড়াহুড়া করে বের হয়ে পাপড়ি চাট, ফল খেয়ে নিলাম আর সামনে থাকে ময়দানে একটু হাঁটাহাঁটি করে পার্ক সার্কাসের দিকে অবস্থিত আরসালান নামের বিখ্যাত রেস্টুরেন্টে চলে গেলাম। কী আছে না আছে পরে, আগে বিরিয়ানি অর্ডার করলাম। কোকের অন্য এক ভার্শন থাম্বস আপ তো আছেই (৩৫০ml) এর। এক কথায় দারুণ। ওদের খাসির মাংসটা একদম তুলতলে নরম হয় নরম বালিশের মতো। শুধু খেলেই হবে না, আরেকটু দেখতে হবে, রাত এখনো যৌবনে আছে। Metro নামের একটা এপস আছে, যেখানে চাপ দিলেই জানা যায় কাছাকাছি কোথায় মেট্রো আছে। আমি জেনে নিলাম কাছের রবীন্দ্রসদনে মেট্রো আছে। আছে ঠিক আছে, কিন্তু আমি এখন কোন দিকে যাব? তাও ঘেঁটে দেখলাম পার্ক স্ট্রিটে যাব। সেখান থেকে হেঁটে হেঁটে হোটেল। ৫ রুপী দিয়ে মেট্রোর টিকেট কাটলাম। স্টেশনে নেমেই দেখছি ১০ মিনিট পর পর ট্রেন আসছে। আমি আমারটায় উঠে গেলাম। চুপচাপ হেডফোন কানে নিয়ে দাড়িয়ে আছি। ৫ মিনিটেই নেমে গেলাম পার্ক স্ট্রিট। পার্ক স্ট্রিট অনেকটা প্রাণবন্ত। যাকে জিগ্যেস করছি দাদা মারকুইস স্ট্রিট কোন দিকে? সে বলছে “হাম তো দাদা টাল হে আভি,কেসে পাতা?”পার্ক স্ট্রিটের মতো আনন্দময় জায়গা থেকে হেঁটে হেঁটে চলে এলাম মির্জাগালিবে। যেখানে দেখি মাটির কাপে দুধ বিক্রি হচ্ছে। হ্যাঁ, ১৬ রূপীর দুধ খেয়ে দ্বিতীয় দিনও শেষ।

তৃতীয় দিনের প্ল্যানিং করতে গিয়ে প্রথমেই রাখলাম টেরেটি বাজার। যেখানে চাইনিজরা ফুটপাথে সকালে নাস্তা বিক্রি করে সকাল সকাল। আমি সকাল ৮ টায় গিয়ে ভাবলাম তাদের চমকে দিবো, কিন্তু তারা উল্টো আমাদের চমকে দিয়ে বলে নাস্তা তো সেই সকাল ৬টাতেই শেষ, এখন কিছু আছে,দিব? যা কিছু ছিল তাই নিলাম। চাইনিজ/তিব্বতিয়ান মানুষরা রান্না করে বিক্রি করে। নাস্তাটায় টান পরে গেলো। দিনের সকালে অন্তত খাবারের অভাব সহ্য করা যায় না। তবু যা হয়েছে হয়েছে ভেবেই চলে গেলাম জাদবপুর। জাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। যে শহরে আসব সে শহরের একটা বিশ্ববিদ্যালয় দেখবো না, তা তো হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ৬০ টাকার এক প্লেট মাটন বিরিয়ানি খেয়েই সকালের আফসোস মিটে গেলো। আবারো দেখা হয়ে গেলো নরম বালিশের মত খাসীর মাংসের সাথে আর বাসমতি চালের সাথে। জাদবপুর এর গেটে ঢুকেই বুঝে যাচ্ছি আমি আরেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে যাচ্ছি। খেলার মাঠ, স্টুডেন্টদের আনাগোনা, রাজনৈতিক নেতাদের দল বেধে হেটে যাওয়ায় আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়। লাঞ্চ করার প্ল্যান ছিল তপসিয়া চায়না টাউনে। উবারকে সেই মতেই কল দিলাম। কিন্তু উবার ড্রাইভার আমাকে সাউথ সিটি মলে নামিয়ে দেয়। বলে এটাই। আমি ক্ষুব্ধ যে আমার সাথে প্রতারনা করা হয়েছে। কিন্তু কিছু সময় পরেই ভুল ভাঙ্গে, চায়না টাউন তপসিয়াতে, যেখানে অনেক অনেক চাইনিজ রেস্টুরেন্ট আর সাউথ সিটি মলের ভিতরেও আরেক চায়না টাউন আছে। মাঝে মাঝে আসলেই গুগল ম্যাপকে সিরিয়াসলি নিতে নেই!

রাগে মোবাইল পকেটে ঢুকিয়ে ফেলব ভেবেছিলাম কিন্তু ভাবলাম থাক। ওর সাথে রাগ করে আর কী হবে! সাউথ সিটি মলটা হেঁটে দেখলাম।কথা আছে না যে, ভুল ট্রেনও অনেক সময় ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেয়, আমার বেলাতেও তাই। সুন্দর শপিং মল এবং যথেষ্ট বড়। শপিং মল থেকে বের হয়ে আমার প্ল্যান হয় যে, কলেজ স্ট্রিটে যাব, কলকাতা এসে বই কিনবো না তা তো হয় না! বই না পড়লেও বই কিনে নিয়ে যাব। যাই হোক অতঃপর আর উবার নেইনি। আশেপাশে মেট্রো রেলের স্টেশন ছিল টলিগঞ্জের দিকে। সিনেমা দেখার প্রতি আগ্রহ আছে, কিন্তু সিনেমাপাড়ার প্রতি এত আগ্রহ নেই। তবু যেহেতু কাছে এসেই গেলাম, তবে কেন যাব না? ৫/১০ মিনিটেই লাইট ক্যামেরা একশান দেখলাম।আমাদের এফডিসির মতপ? হ্যাঁ অনেকটা। কিন্তু এফডিসির দারোয়ান যেমন ১০০/১৫০ টাকা দিয়ে ঢুকিয়ে দেয় ভিতরে, ওখানে অমন না। গেইট একদম ওপেন। যদি আপনি অবাক হয়ে আশপাশ দেখেন তবে ভিতরের মানুষও আপনাকে অবাক হয়েই দেখবে। আমার টার্গেট যেহেতু ছিল কলেজ স্ট্রিট, তাই আমি আমার দিকেই ফেরত যাই। আমি চলচিত্র থেকে সাহিত্যের দিকে যাবার আগে জিগ্যেস করে নিলাম কিভাবে যাওয়া যায়, কিন্তু তার আগে আমি জেনে ছিলাম এখানে মেট্রো স্টেশন আছে। তো মেট্রোতে উঠে চলে গেলাম মহাত্মা গান্ধী স্টেশন। যেখান থেকে ৫ মিনিটে হেটেই চলে যেতে পারব কলেজ স্ট্রিট। হাঁটতে হাঁটতে আজান হয়। খিদে পেট নিয়ে চোখে পরে ঘোষ কেবিন। ঢুকে যাই ঘোষ কেবিনে। সিঙ্গারা আর মাটির কাপে চা। আহ কলকাতা!

১০ টাকার মত বিল দিয়েই বই এর দোকানে দোকানে হাঁটা। কী আর হাঁটা! পারলে দাদাবাবুরা কোলে করেই তাদের দোকানে নিয়ে যায়। দাদা কি বই দাদা, বলুন না কি চাচ্চিলেন। কিন্তু নীলক্ষেতেে বইয়ের দাম যথেষ্ট কম। ওখানের মানুষ এখনো বই জমায়। এমনও আছে যে বই সারাজীবন রেখে দেয়, অথচ আমার গত বছরের পড়া সব বই এখনো নীলক্ষেতের ফুটপাথে দেখা যাবে কেউ ৫০/৬০ টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে যাচ্ছি। অতঃপর একটা বই কিনে আশেপাশে তাকিয়ে দেখি ট্রাম, ট্রেন, মেট্রো উবার, ওলা, হলুদ ট্যাক্সি, লোকাল বাস, এসি বাস সব কাছাকাছি।কলকাতার এই জিনিষটা খুব সুন্দর। যেদিকে হাত বাড়াবেন শুধু যানবাহন। না,হাত বাড়াতে হবে না, এমনি চলে আসবে যানবাহন। কিন্তু সেই সময়টায় পূজা প্রায় শুরু হয়ে যাচ্ছিল। আমি এক উবার কল করি কিন্তু দাদা একটু দূরে। আর তিনিও হিন্দি ছাড়া বলছেন না আর আমিও হিন্দি পারি না।তিনি ফোনে বলছেন কাহা কাহা”, আমি বলছি আহা আহা! সব মিলিয়ে তাকে পেতে বেশ কষ্ট পেতে হয়। আমি এমন জায়গায় দাঁড়ানো ছিলাম যেখানে গাড়ি থামে না। তো তিনি একটু থামাতেই পুলিশ তাকে দৌড়ানো দিল, শুধু তাই না,পুলিশ ও তার পিছু দৌড়াচ্ছে।আমাকে ফোন দিয়ে বলল দাদা আপকো থোরা সা দৌড় দেনা পারেগা!

কী আর করা! থোরাসা দৌড়েই তাকে ধরলাম। ফ্রেশ হয়ে মাঝরাতে নিউমার্কেট এরিয়ার দিকে খেয়ে নিলাম আর হেঁটে হেঁটে দেখলাম সবগুলা স্ট্রিট, এসপ্ল্যানেড, ধর্মতলা, সদর স্ট্রিট, পার্ক স্ট্রিট। কথা বললাম টানা রিকশাওয়ালাদের সাথে। পান মাসালা কিনে পুরাটা মুখে দিয়ে দিলাম। ২ মিনিটেই মাথা ঘুরানো শুরু। তাদের সিগারেটের দোকানে যত সব মসলা দেখবেন, সবগুলাতেই তামাক আছে। তাই এগুলা না খাওয়াই ঠিকমাথা ঘুরানো নিয়ে তো আর শহর দেখা যায় না। কেউ যদি বলে আপনি বাঁ দিকে যাবেন, তো আমি যাচ্ছি ডান দিকে। অগত্যা টানা রিকশা নিয়ে চলে এলাম হোটেলে।

চতুর্থ দিনটা সারাদিন কাটে শান্তিনিকেতনে। সে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা, এক লেখায় শেষ করা যাবে না, তাই এভয়েড করলাম। পঞ্চম দিনে আমি অনেকটা লোমছাড়া ভেড়ার মত হয়ে যাই। শরীরে কোনমতেই চার্জ নিচ্ছে না। কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ নামের জায়গার দিকে হলদিরামে দারুণ একটা লাঞ্চ করি আগে। যা ছিল সবজির আইটেম। সবজির বাইরে পনির ছিল। পনিরকে আমি মাছ ভেবেছিলাম। খাওয়ার দুই ঘণ্টা পর বুঝতে পারি এ তো পনির ছিল। তারপর গন্তব্য সাইন্স সিটি আর প্রিন্সেপ ঘাট। সাইন্স সিটি ছোটদের জন্য ভালো, আমার মতো মানুষদের জন্য না। জানা অজানা কারণে আমার মন শুধু পার্ক স্ট্রিটে চলে যেতে চায়। সাইন্স সিটির পর প্রিন্সেপ ঘাট দেখলাম। বিদ্যাসাগর সেতুর নিচে যে ঘাট, সেটাই প্রিন্সেপ ঘাট। বিদ্যাসাগর অনেক সুন্দর একটা সেতু, কিন্তু আমাকে হাওড় ব্রিজটাই টানে। এই ব্রিজটার দিকে তাকালেই মনে হয় কলকাতাকে দেখছি। হোটেলে ফেরার পথে অনেক মাল্টিপ্লেক্স আর টকিজ চোখে পরে। একটা না একটা মুভি তো দেখতে হয়। রাত ৯ টার শো দেখতে চলে যাই প্যারাডাইজ মুভিতে। সঞ্জয় দত্তের ভুমি মুভি চলছে। ১১০ রূপীর টিকেট কেটে যখন বসি তখন দেখি ৪/৫ জন ছাড়া কেউ নেই(সঞ্জয় দত্ত সহ গুনলাম)। সালমান খান যেমন ৫ হাজার গাড়ি ও ৬ হাজার নারী নিয়ে ফিল্মে এন্ট্রি নেয় সেখানে সঞ্জয় দত্ত এন্ট্রি নেয় মাত্র এক গ্লাস মদ নিয়ে। মুভির ভিতরের গল্পে যাব না। ভাল লাগেনি দেখে বেরিয়ে গেলাম। বেরিয়েই চলে গেলাম পার্ক স্ট্রিটে। আগেই বলেছি পার্ক স্ট্রিট আমাকে টানে বেশি। কিন্তু হলুদ ট্যাক্সিতে যাব বলেই শপথ করেছিলাম। কারণ একদিন উবার খুজতে গিয়ে দেখি সামনে এক হলুদ ট্যাক্সি আসে। বলল দাদা চলুন। ভাড়া জিগ্যেস করতে সে উবারের মতই দাম চাইলো। আর বলল, চলুন এই দামে কেউ যাবেনা। আমি বললাম উবার যাব, উবারে তো এসি আছে। সে মন খারাপ করে চলে গেলো। এভাবে বলা ঠিক হয়নি আমার। তারা ভালো ফোন, গুগল ম্যাপ চালাতে পারে না। শেষ বয়সে আছে। তো সেই রাতে হলুদ ক্যাবেই চলে গেলাম পার্ক স্ট্রিট। ঘড়ির কাঁটা তাকাতে তাকাতে আমার পঞ্চম দিনটাও শেষ।

ষষ্ট দিনটায় পুজার ষষ্ঠী। উৎসব উৎসব ভাব। পাঞ্জাবী পরে বেরিয়ে পরলাম দূরের দক্ষিণেশ্বর মন্দির। একটু দূরে। সুন্দর জিনিস তো দূরেই থাকে।সে দূরেই চলে গেলাম। অনেক অনেক মানুষ। এত মানুষের ভিড়ে যদি হারিয়ে যাই অবাক হবো না। জুতা আর মোবাইল জমা দিতে হয়। গরম ফ্লোরে জুতা ছাড়া হেঁটে দেখি আমার জন্ডিস টায়ফয়েড এখনই হয়ে যাবে, ভাবতেই বের হলাম! উবার খুজতে গিয়ে দেখি নেই। এক এসি বাস আসছে দেখে উঠে পরলাম। ভাবলাম এইবারও যাতে ভুল বাস ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেয়। বাসের রোড দেখতে গিয়ে দেখি নামিয়ে দিবে ইকো পার্ক, মাদার ওয়াক্স মিউজিয়ামের সামনে। নেমে দেখে নিলাম পার্ক। একটা আইফেল টাওয়ার বসানো আছে। প্যারিস প্যারিস একটা আবহাওয়া। কিন্তু এই কলকাতার প্যারিসে যে গরম তাতে বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। চলে গেলাম চায়না টাউন তপসিয়ার দিকে। যেটা অন্য দিন খুজতে গিয়ে পাইনি। সেটা আজ না খুজতেই পেয়ে গেলাম। স্পেশালিটি কি? সারি সারি চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। সেদিন নিউমার্কেটটাতেও যেতে হবে দ্রুত চলে গেলাম। কিছু কেনাকাটা করে রেস্ট নিয়ে আমার পরবর্তী গন্তব্য মাদার হাউজ। যেখানে সমাহিত মাদার তেরেসা। ওখানে অনেক দেশের কিছু ভলান্টিয়ার পাওয়া যায় যারা সারাদিন থেকে মানুষকে হেল্প করে দেখাতে। আমাকে বলল যদি হতেই চাই ভলান্টিয়ার, তবে যাতে সকাল সকাল চলে আসি।(নাস্তা ফ্রি)

সপ্তম দিন আমার শেষ দিন। দুপুরের দিকে রওনা হবো। কিন্তু সকাল তো আছে। ভোর সকালে হাঁটতে বের হলাম। শুধু হাঁটা। এই সেই ট্যাক্সির জানালা দিয়ে আর কতটুকু দেখা যায় এই শহর? প্রথমে চলে গেলাম মল্লিক ঘাট। হাওড়া ব্রিজের নিচে এক ফুলের মার্কেট। আমাদের শাহবাগের মতো, শুধু আমাদের ঘাট নেই। ফেরার পথে রাইটার্স বিল্ডিং, চার্চ থেকে শুরু করে নানা বিল্ডিং। সবাই আমার ঘামে ভেজা গেঞ্জি দেখে বলেছে, ‘ওমা এ কি অবস্থা’! হোটেলে ফিরছি আর ৭ দিনের সফর শেষ হচ্ছে। আস্তে আস্তে হাঁটছি তাই। দ্রুত হাঁটলেই তো আরও দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।ব্যাগ গুছাতে গিয়ে খারাপ লেগেছে। এই শহরের প্রতি অন্যরকম একটা মায়া জন্মে গিয়েছে। এই শহরের মাথা থেকে পা পর্যন্ত আমি একা একাই ঘুরেছি। আমার সঙ্গীহীন শহরের একমাত্র আপন ছিল এই শহর। এই শহরের প্রেমিকাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাসতে দেখেছি তার প্রেমিকের মুখের দিকে তাকিয়ে। হলুদ ট্যাক্সির ড্রাইভারকে দেখেছি পানের পিক ফেলতে এখানে সেখানে। আবার দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় এই আচমকা হুট করে ট্রাম এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেও দেখেছি। পার্ক স্ট্রিটে এক মাতালকে দেখেছি নাচতে নাচতে শুয়ে পরতে। কলেজ স্ট্রিটে বই দামাদামি করছিল এক দিদি, বলছিল ” বড্ড বেশি চাইছো গো,আমি সেটিও দেখেছি।

এই মানুষগুলার ভাষা বুঝিআবেগ বুঝি। কিন্তু বাঙালী হয়েও এই এক বাঙালীর শহরে আমি অন্য দেশের বাসিন্দা। আমার তাই ফিরে যেতে হয়। আবার আসবো প্রত্যয় নিয়ে ফিরে যেতে হয়। 

লিখেছেন- তানভীর মাহমুদুল হাসান

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-