খেলা ও ধুলা

বুক চিতিয়ে বলে কয়ে পাকিস্তানকে হারালো বাংলাদেশের কিশোরেরা!

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর আনফা কমপ্লেক্সে সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনালে টাইব্রেকারে অসামান্য ক্ষিপ্রতায় দুটো শট ঠেকিয়ে দিয়ে ভারতকে মোটামুটি একলাই হারিয়ে দিয়েছিল কিশোর গোলরক্ষক মেহেদী হাসান। ম্যাচের পর বুক ফুলিয়ে সাংবাদিকদের বলেছিল, “ট্রফি জিতেই দেশে ফিরবো। পাকিস্তানকে হারিয়ে ফাইনালে জেতার জন্য দরকার হলে জীবন দিয়ে দেবো!”

অথচ মেহেদীর এমন অসাধারণ আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণের তেমন কোন জায়গাই রাখেনি বাফুফে। মাত্র আড়াই মাসের অনুশীলন করে এবার নেপালে সাফ অনূর্ধ্ব ১৫ চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে গিয়েছিল বাংলাদেশের কিশোরেরা। ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, ভুটান ও স্বাগতিক নেপালের সাথে এই টুর্নামেন্ট খেলতে যাওয়া বাংলাদেশের অবস্থাই ছিল সবচেয়ে করুণ। কারণ ৩২ সদস্যের এই দলে ফুটবলার এবং কোচ ছাড়াও বাফুফের তালিকার বাইরে বহিরাগত বেশ কয়েকজন গেছে। অথচ দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ফিজিও বা নিদেনপক্ষে একজন ডাক্তারকে পাঠায়নি বাফুফে। কি বিচিত্র নির্লজ্জ উদাসীনতা, তাই না? টুর্নামেন্টের মাঝখানেই মাথায় আঘাত পায় এক ফুটবলার, কোন ফিজিও না থাকায় শেষ পর্যন্ত স্থানীয় এক ডাক্তারকে দিয়ে কোনক্রমে মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে দেওয়া হয় তার। কিন্তু অসামান্য আত্মবিশ্বাস আর ডেডিকেশনের স্ফুরণে থাকা সেই ছেলেটা মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধেই নেমে পড়ে পরের ম্যাচে।

তো, এমন বিচিত্র এবং উদ্ভট অবস্থার বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়েনি বাংলাদেশের কিশোরদের খেলায়! মালদ্বীপকে ৯-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করা বাংলাদেশ নেপালকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই সেমিফাইনালে ওঠে বাংলাদেশ। আর সেমিতে ভারতের সাথে অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহুর্তে গোল করে ১-১ এ সমতা এনে এরপর টাইব্রেকারে অসামান্য বীরত্ব দেখিয়ে ফাইনালে ওঠে বাংলাদেশ। সেদিন এই গোলরক্ষক মেহেদিই অসাধারণ দুটো সেইভ করে টাইব্রেকার জিতিয়েছিল বাংলাদেশকে। তারপরেই সে রীতিমত ঘোষণা দিয়েছিল যে পাকিস্তানকে হারিয়ে ট্রফি জিতেই দেশে ফিরবে। পাকিস্তানকে হারিয়ে শিরোপা জিতে দেশবাসীকে গর্বিত করার জন্য আমরা জীবন দিয়ে দেবে। এমন দুঃসাহসী উচ্চারণ শুনে যারা ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিলেন, তাদের বলছি, মেহেদি তার কথা রেখেছে! বুক চিতিয়ে লড়াই করে পাকিস্তানের বিপক্ষে টাইব্রেকারে ৩-২ গোলে জয় ছিনিয়ে এনেছে বাংলাদেশের কিশোর টাইগারেরা!

ম্যাচের ২৫ মিনিটের মধ্যেই গোল পায় বাংলাদেশ, ১-১ গোলে সমতায় থেকে প্রথমার্ধ শেষ করেছিল তরুণ বাঘেরা। এরপর নির্ধারিত সময়ে কোন দলই আর গোল করতে না পারায় খেলা শেষ হয় অমীমাংসিতভাবে ১-১ ব্যবধানে!

টাইব্রেকারে শুরুতেই গোলমাল বাঁধিয়ে ফেলে বাংলাদেশের স্ট্রাইকার রাজন, বলটা বারের অনেক উপর দিয়ে বাইরে পাঠায় সে। পাকিস্তানের স্ট্রাইকারও প্রথম শটটা মিস করলে অবশ্য সমতা ফেরে আবার। এরপরেই এগিয়ে যাওয়া পালা বাংলাদেশের! স্পটকিক থেকে টানা তিনটি গোল করে হৃদয়, রাজা আনসারি ও রুস্তম। কিন্তু শেষ শটটা মিস করে রবিউল। ওদিকে বদলি হিসেবে খেলতে নামা মেহেদির অপরিসীম বীরত্বে ১ম , ২য় ও শেষ শটটা ঠেকিয়ে দিয়ে বাংলাদেশকে এনে দেয় সাফ অনুর্ধ্ব ১৫ শিরোপা!

শেষ শটে পাকিস্তানের মোদাসসের গোল করতে পারলে ৩-৩ সমতায় ফিরতে পারত পাকিস্তান। কিন্তু মেহেদী যে ধনুকভাঙ্গা পণ করেছিল ম্যাচের আগে, দর্শকদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে রীতিমত জীবন দিয়ে দেবে পাকিস্তানকে হারিয়ে ট্রফিটা জিততে! অকুতোভয় কিশোর মেহেদি হাসান তার কথা রেখেছে। আক্ষরিক অর্থেই জীবন দিয়ে খেলেছে আজ তারা, বুক চিতিয়ে লড়ে যাওয়া তার অসামান্য এই পারফরম্যান্সই হারিয়ে দিয়েছে পাকিস্তানকে, বাংলাদেশকে এনে দিয়েছে শিরোপা! ২০১৫ সালে অনূর্ধ্ব ১৬ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের চ্যাম্পিয়ন ছিল বাংলাদেশ। সেই টুর্নামেন্টটাই ফরম্যাট পাল্টে এখন সাফ-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপ! তিন বছর যে শিরোপাটা আবার জিতলো বাংলাদেশ!

সেই একাত্তরে এক রয়েল বেঙ্গল টাইগার ব্যাট ফেলে স্টেনগান তুলে নিয়েছিল হাতে, ব্রাশফায়ারে আঙ্গুলগুলো ঝাজরা হয়ে যাওয়ার পরেও স্বাধীন বাংলাদেশের হয়ে ব্যাটিং করার স্বপ্ন দেখতো, ডাক্তারকে অনুনয় করে বলেছিল যে, দেশ স্বাধীন হইলে আমি ন্যাশনাল টিমের হয়ে ওপেনিংয়ে নামুম, ক্যাপ্টেন হমু, আঙ্গুল তিনটা রাইখেন স্যার প্লিজ। একটা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ এনে দিতে গিয়ে যে টাইগারের স্বপ্নটা পূরণ হয়নি, বুকের ভেতর স্বপ্নটা নিয়ে চলে গিয়েছিল চিরতরে, বিনিময়ে মেহেদীর মত নতুন প্রজন্মের তরুণেরা পেয়েছে বুক চিতিয়ে লড়াই করার মত একটা পরিচয়, একটা দেশ! ক্র্যাকপ্লাটুনের শহীদ আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েলের রক্তে ভেজা এই জমিনে ৪৭ বছর পর অবশেষে সেই প্রজন্ম এলো, যারা পাকিস্তানকে রীতিমত ঘোষণা দিয়ে বুক চিতিয়ে লড়াই করে হারিয়ে দেয়! ৪৭ বছর পর সেই প্রজন্মটা অবশেষে আমরা পেলাম!

টাইগার মেহেদী জন্য স্যালুট, বাংলাদেশের কিশোর বাঘেদের জন্য ভালোবাসা!

Comments

Tags

Related Articles