একটু বিরতি দিয়ে কাল থেকে শুরু হচ্ছে নিউজিল্যান্ড বনাম বাংলাদেশ টেস্ট সিরিজ।

টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির ১৭ বছর পরেও প্রতিবার টেস্ট সিরিজ আমাদের শুরু করতে হয় শুন্য থেকে। শেষ কবে দেশের বাইরে টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ? সেই ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে! তাই স্বাভাবিকভাবেই নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে দুটি ম্যাচ শেষে আবারও টেস্ট উন্নয়নের রোডম্যাপ আঁকতে বসে যাবে সবাই! এবং বলাইবাহুল্য- মাঠের সবুজ উইকেট, ওয়ানডে ও টি২০ সিরিজে একটিতেও জয়ের মুখ না দেখা, মুস্তাফিজের ইনজুরি এবং মাঠের ভেতরে-বাইরে নানান মন খারাপ করা ঘটনায় অধিকাংশের মানসিকতাই এই মুহূর্তে এই সিরিজ নিয়ে ব্যাকফুটে!   

তবু আমাদের যে আশায় বসতি! তাই এত সব প্রতিকুলতার মধ্যেও আমরা তুলে আনার চেষ্টা করেছি যে, প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের অনুকূলে কি কি এক্স-ফ্যাক্টর থাকতে পারে! অর্থাৎ কোন কোন “ইতিবাচক” বিষয় দ্বারা আমরা অনুপ্রানিত হতে পারি, কারা কারা আমাদের দিকে খেলা ঘুরিয়ে দিতে পারে, কাদের জন্য বা কোন কোন বিষয়ের জন্য জয় না হলেও, অন্তত ভালো পারফর্ম করার আশা দেখতে পারি! আর সব ঠিকঠাক হলে কে জানে, জয় পাওয়াটাও হয়তো অসাধ্য কিছু হবে না! 

সর্বশেষ টেস্ট ম্যাচে জয়

নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সবচাইতে বড় অনুপ্রেরণা হবে গত অক্টোবরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ ড্র করার সুখময় স্মৃতি! ইংল্যান্ড বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষসারির টেস্ট প্লেয়িং নেশনদের একটি, হোক হোম কন্ডিশন, তবুও ১৫ মাস পর টেস্ট খেলতে নেমে তাদের বিরুদ্ধে জয় দূরে থাক, ড্র আশা করাটাই এক প্রকার বিলাসিতা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ যেভাবে তুমুল লড়াই করে প্রথম টেস্টে জয়ের একেবারে দ্বারপ্রান্তে গিয়ে হেরেছিল এবং দ্বিতীয় টেস্ট ভোজবাজি দেখিয়ে জিতেছিল, তা থেকে আত্মবিশ্বাসের জ্বালানী পেতেই পারে সাকিব-তামিমরা!

এছাড়াও লক্ষ্য করেছেন নিশ্চয়ই, টেস্টে গত তিন বছর ধরে একটা নির্দিষ্ট ধারা কিন্তু গড়ে উঠছে বাংলাদেশে! হ্যাঁ, হয়তো ম্যাচসংখ্যা বাড়ছে না কিন্তু এখন বাংলাদেশ টেস্টে আর হারার আগে হেরে যায় না! তাছাড়া গত ১০ টেস্টে ৪ জয়, ৪ ড্র, ২ হার; এই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেই সর্বশেষ দুই টেস্ট দাপটের সাথে খেলে ড্র, বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসের ইঞ্জিনে জ্বালানীর পরিমাণ বৃদ্ধি করতে এই পরিসংখ্যানগুলো যথেষ্ট সমৃদ্ধশালীই!

টেস্টে তামিম ইকবালের চওড়া ব্যাট 

তিনি বাংলাদেশের অবিসংবাদিত সেরা ব্যাটসম্যান এবং মমিনুলের পর একমাত্র বাংলাদেশী ব্যাটসম্যান হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে ৪০+ গড়ের অধিকারী। সর্বশেষ ১০ টেস্টে রয়েছে তাঁর চারটি সেঞ্চুরি (যার একটি ডাবল) এবং তিনটি ফিফটি- টেস্টে তামিম ইকবাল খানের কাছে ব্যাট বরাবরই চওড়া হয়ে উঠেছে! দেশে তামিমের ব্যাটিং গড় ৩৯.৪১, বিদেশে সেটা হয়ে দাঁড়ায় ৪২.২৯! বাংলাদেশের ব্যাটসম্যান হিসেবে এটা বিরল। ১৪ টেস্ট বিদেশের মাটিতে খেলে ১১৪২ রান, তিনটি সেঞ্চুরি ও সাতটি ফিফটি করেছেন তামিম! নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশনের সাথেও আছে তামিমের সুখস্মৃতি। এই নিউজিল্যান্ডের মাটিতেই তাদের বিপক্ষে ডানেডিনে ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট খেলতে নেমেছিলেন ১৮ বছর বয়সী কিশোর তামিম। টানা দুই ইনিংসে করেছিলেন ৫৩ ও ৮৪ রান! এরপর সব মিলিয়ে তিনটি টেস্ট এখানে খেলে করেন ৫০ গড়ে ২৫০ রান ও তিনটি ফিফটি! তামিমের গড়ে দেওয়া ভিতকে যদি কাজে লাগাতে পারেন বাকী ব্যাটসম্যানরা, বাংলাদেশের ব্যাটিং স্কোরকার্ড তো হাসবেই!

লুকিয়ে রাখা গোপন অস্ত্রমিরাজ!

বাংলাদেশের সবচে বড় অনুপ্রেরণা যদি হয় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ- তবে সেই সিরিজে বাংলাদেশের সবচে বড় মারণাস্ত্রটিকে ঘিরেও বাংলাদেশ দলের প্রত্যাশা অবশ্যই থাকবে! এবং মেহেদী হাসান মিরাজ নিউজিল্যান্ড থিংক ট্যাঙ্কেরও মাথায় থাকছেন, তা একপ্রকার নিশ্চিত করেই বলা যায়।

মিরাজের জন্য দেশের বাইরে প্রথম টেস্ট সিরিজ। মাত্র দুই টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতাতেই মিরাজের বোলিং তোপে যে গুটিয়ে যাবে না নিউজিল্যান্ড, তা হয়তো সত্যিই। কিন্তু বোলার হিসেবে মিরাজ খুবই এগ্রেসিভ। গোটা সিরিজে তাঁকে পড়তে ব্যর্থ হয়েছিলেন ইংল্যান্ডের কুক-রুট-বেয়ারস্টোরা। যতই স্পিনিং কন্ডিশন থাকুক, শুধু কন্ডিশন কাজে লাগিয়ে ২ টেস্টেই ১৯ উইকেট শিকার করা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়! মিরাজ সেই ক্ল্যাসিক ওল্ড ফ্যাশন অফস্পিনারদের মতন যিনি ফ্লাইট লুপ দিতে যেমন ভয় পান না, তেমনি সময়মত সোজা বল ফেলে ব্যাটসম্যানকে ধাঁধায় ফেলতেও ভালোবাসেন। 

বিশেষ করে এই মাঠে সবশেষ টেস্টেই দুই ইনিংস মিলিয়ে ৭ উইকেট নিয়েছিলেন নাথান লায়ন। তার আগের টেস্টে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন কিউই অফ স্পিনার মার্ক ক্রেগ। ২১ ম্যাচে ৫৭ উইকেট নিয়ে এই মাঠে উইকেটশিকারীদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছেন ড্যানিয়েল ভেট্টোরী, এটা জানার পরে হয়তো আর কোন সন্দেহই থাকার কথা না যে বেসিন রিজার্ভের মাঠ স্পিনারদের জন্যও বাড়িয়ে দেয় বন্ধুত্বের হাত! 

সাদা পোশাকের তাসকি

তাসকিন সাদা পোশাকে গতির ঝড় তুলতে যাচ্ছেন- এই দেশের সকল ক্রিকেটানুরাগীই এই দৃশ্যের জন্য অপেক্ষা করেছে এত দিন। পেস বোলিং পেনিট্রেশন বাড়াতে তাসকিনের মুখাপেক্ষী হওয়া ছাড়া উপায়ও ছিল না ম্যানেজমেন্টের। গতি আছে, এগ্রেশন আছে। শুধু লম্বা স্পেলে লাইন-লেংথ মেপে বল করতে পারলে তাসকিনই হয়ে উঠবেন বাংলাদেশের টেস্ট সাফল্যের এক্স-ফ্যাক্টর! ওয়ানডেতে যিনি বাংলাদেশের জন্য ম্যাচ উইনারদের একজন হয়ে উঠছেন, টেস্টেও তাঁর ১৪০+ কিমির আগুনের গোলাসমুহ কিউই ব্যাটসম্যানদের ভালোই চাপে ফেলবে তা আশা করা স্বাভাবিক! তাসকিনের একাদশে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে উচ্ছ্বাসিত খোদ কিউই গ্রেট স্কট স্টাইরিস বিডিনিউজ ২৪.কম-কে বলেছেন,

“আই লাইক দ্য লুক অব তাসকিন। ওর উচ্চতা ও শারীরিক গঠন, যে রকম বাউন্স পায়, তাতে অনেকটাই নিউ জিল্যান্ড ঘরানার ফাস্ট বোলার। ওকে অবশ্যই খেলাতে হবে। ওয়ানডেতে উইলিয়ামসনের মত ব্যাটসম্যানকে দুবার আউট করেছে। বাংলাদেশের জন্য সেই হবে মূল অস্ত্র। আমি নিশ্চিতভাবে জানি, কিউই ব্যাটসম্যানদের ভোগাবে সে!!”

মুশফিকের ফিরে আসা

এক মুশফিকুর রহিমের অভাব টের পাওয়া গেছে ওয়ানডে ও টি-২০ সিরিজজুড়েই। মুশফিকের মানের একজন ব্যাটসম্যান দলের মিডলঅর্ডারের থাকা মানে দলের ব্যাটিং স্ট্রেন্থ দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া। দলের সার্বিক পরিস্থিতিতে মুশফিকের ফেরাটা তাই অনেকটাই স্বস্তিদায়ক।

*

দুজন ব্যাটসম্যান আর দুজন বোলারকে এক্স-ফ্যাক্টর বলছি হয়তো। তবে মাঠে লড়াই করতে হলে ‘টিম বাংলাদেশ’ হয়েই খেলতে হবে দলকে, অবদান রাখতে হবে সবাইকেই। হয়তো বুমেরাং হয়ে আসবে এই আর্টিকেলের লেখা, হয়তো এঁদের কেউই পারফর্ম করতে পারবেন না, পারফর্ম করবেন বাকি সবাই! তবে দিনশেষে আমাদের চাওয়া তো একটাই, জয়-পরাজয়ের কথা না ভেবে স্বাভাবিক খেলা খেলুক বাংলাদেশ, সাহসী খেলা খেলুক। লাল-সবুজ পতাকা উড়ুক ঊর্ধ্ব গগণে!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-