আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাচের কোন বিশেষ মুহূর্তে কোন ক্রিকেটারকে একেবারে মৌলিক কিংবা হাস্যকর কোন ভুল করতে দেখলে কমেন্টেটররা বলে ওঠেন, ‘স্কুলবয় মিসটেক!’ এর অর্থ হচ্ছে স্কুলে পড়া কোন ছাত্রের কাছ থেকে এমন ভুল মেনে নেওয়া যায়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তা অকল্পনীয়। 

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে বাংলাদেশ দলের ‘ব্যাটিং’ দেখলে আপনাকে দ্বিধায় পড়ে যেতে হবে। কেউ যদি দাবি করে একদল স্কুলপড়ুয়া ছেলেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, তবে তাকে খুব একটা দোষ হয়তো দেওয়া যাবে না!

শুরুটা করলেন তামিম ইকবাল। গত কিছুদিন দায়িত্বশীল ব্যাটিং ও পরিসংখ্যান বিবেচনায় যিনি বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান হবার দাবি রাখেন। ৫০ ওভারে ২৫২ রানের লক্ষ্যে যেখানে শুরু থেকে আস্তে ধীরে খেলে ইনিংস গড়ে তোলার কথা, সেখানে ওভাবে ডাউন দ্যা উইকেটে এসে উইকেট বিলিয়ে দিলে মানতেই হবে, এখনো ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের মাথাটা ঠান্ডা রাখতে মাঝেমধ্যেই ব্যর্থ হন তিনি। তামিমের ভুলটাকে ভুলিয়ে দেয়ার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন ইমরুল আর সাব্বির। দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে দারুণ আস্থার সাথে খেলে ব্যাটিংটাকে একেবারেই সহজ মনে করাচ্ছিলেন দুজন। কিন্তু হঠাৎই সেই ছেলেবেলায় স্কুলে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল তাদের!

রানিং বিটুইন দ্যা উইকেটের একেবারে বেসিক দুটো বিষয়- 

এক. ‘কলিং’

দুই. ‘ট্রাস্টিং ইওর পার্টনার’;

দুটোই বেমালুম ভুলে গিয়ে তারা দুজনে একই প্রান্তে ছুট লাগালেন! যেন ১০০ মিটার রেস শেষে দুজনে টাচলাইন ছোঁয়ার চেষ্টা করছেন! আবার, প্রথমে ক্রিজে ঢুকেছেন জেনেও প্যাভিলিয়নের দিকে হাঁটা শুরু করলেন ইমরুল! পরে থার্ড আম্পায়ার জানালেন তিনি নন, আউট হয়েছেন সাব্বির! অবশ্য ইমরুলের এমন ‘স্কুলবয় মিসটেক’ এই সিরিজে এবারই প্রথম নয়। প্রথম ওয়ানডেতে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়েও রিভিউ নিয়ে ধারাভাষ্যকারদের বিস্ময় ও হাস্যরস উপহার দিয়েছেন! পুরো মাঠে একমাত্র তিনি ছাড়া বোলার, উইকেটকিপার, আম্পায়ারসহ বাকি সবাইই নিশ্চিত ছিলেন যে বল তার ব্যাট ছুঁয়েছে!

নিউজিল্যান্ডের পিচে, কিছুটা সিমিং কন্ডিশনে যেখানে পেসাররাই হবেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের দুর্ভাবনার কারণ, সেখানে পার্টটাইম অফ স্পিনার ক্যান উইলিয়ামসনকে সাকলাইন-মুরলিধরন বানিয়ে ফেলার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন দলের অন্যতম সিনিয়র ক্রিকেটার সাকিব থেকে শুরু করে, অন্যতম জুনিয়র মোসাদ্দেকসহ এই ম্যাচেই অভিষিক্ত তানবীরও! স্কুলবয়দের মতো একের পর এক দায়িত্বহীন শটে উইকেট বিলিয়ে দিলেন তারা! তখনও সবাই তাকিয়ে ছিলেন ‘সেট’ ব্যাটসম্যান ইমরুলের দিকে। কিন্তু ইমরুলের ইনিংসটা শেষ হলো অনেকটা সেই বাস ড্রাইভারের মতো।

প্রথমে একটা বাস পড়লো সামনে, বিপদজনকভাবে পাশ কাটিয়ে বের হয়ে গেলেন তিনি… এরপর একটা কঠিন বাঁক আসলো, স্পিড না কমিয়ে টার্ন নিতে গিয়ে আরেকটু হলেই উলটে যেত গাড়ি, কোনমতে পার পেলেন… এরপর একটা ট্রাককে ওভারটেক করতে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ থেকে কোনমতে বাঁচলেন। কিন্তু তাকে বাঁচাতে গিয়ে খাদে পড়লো একটি ট্রাক… সবশেষে সামনে একটা লোহার ব্রিজ পেয়ে নিরাপদে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন তিনি!

দুই-তিনবার ‘জীবন’ পেয়েও একজন ওপেনিং ব্যাটসম্যান এমন ম্যাচে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়তে না পারলে সেটিকে আর কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

তবে এতো সব স্কুলবয়ের ভিড়েও উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হিসেবে ছিলেন একজন ক্লাস ক্যাপ্টেন, একজন মাশরাফি। সত্যি কথা বলতে কি, আজ মাশরাফিকে দেখে নবম কিংবা দশম শ্রেণীতে পড়া সেই প্রাণচাঞ্চল্ল্যে ভরপুর স্কুলবয় মাশরাফিকে মনে পড়ে গেছে! ম্যাচের প্রথম ওভারেই ব্রেক থ্রু এনে দিয়েছেন, দুর্দান্ত সুইং এ বোল্ড করেছেন, বাউন্সারে পরাস্ত করে উইকেট নিয়েছেন, নিয়েছেন গুরুত্বপুর্ণ ক্যাচও! কভারে দাঁড়িয়ে এমনভাবে ঝাপিয়ে পড়ে ফিল্ডিং করেছেন, যাতে সংশয় হতে বাধ্য, ইনিই কি দলের সবচেয়ে সিনিয়র ক্রিকেটার? নাকি সবচেয়ে কমবয়সী, সবচেয়ে ক্ষিপ্র, সবচেয়ে চঞ্চল সেই স্কুলবালক!

মাশরাফির জীবনে নিউজিল্যান্ড এক চুড়ান্ত আক্ষেপের নাম। এই নিউজিল্যান্ড কেড়ে নিয়েছে তার বলের গতি, এই নিউজিল্যান্ড কেড়ে নিয়েছে তার সবসময়ের প্রিয় টেস্ট ক্রিকেট, এই নিউজিল্যান্ড কেড়ে নিয়েছে তার জীবন থেকে অনেক অনেক আন্তর্জাতিক ম্যাচ, অনেক অনেক উইকেট! সেই নিউজিল্যান্ডের মাটিতেই মাশরাফির জন্য কিছু একটা অর্জনের দারুণ একটা সুযোগ হেলায় হারালেন এক ঝাঁক স্কুলবালক!

ওহ মাশরাফি, ওহ মাই ক্লাস ক্যাপ্টেন!  

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-