বিসিবির আকস্মিক রুচিবোধ, কাণ্ডজ্ঞান এবং অভিষিক্ত সাব্বিরের বীরত্ব!

Ad

purnamচট্টগ্রাম টেস্টে বাংলাদেশ জিতবে কি জিতবে না তা অনেকটাই এখন নির্ভর করছে সাব্বির রহমানের উপর। সেই সাব্বির রহমান, এই টেস্টেই যার অভিষেক হয়েছে! চতুর্থ দিন শেষ বিকেলে মুশফিকের সাথে দারুণ এক জুটি গড়ে, দুর্দান্ত এক অর্ধশতক তুলে নিয়ে বাংলাদেশকে এখনো ম্যাচে রেখেছেন তিনিই।

অথচ তৃতীয় দিন সকালেই দৃশ্যপট ছিল অন্যরকম। দিনের দ্বিতীয় বলেই সবাইকে হতবাক করে দিয়ে ডাউন দ্যা উইকেটে খেলতে এসে স্ট্যাম্পিং এর ফাঁদে পড়েন অভিজ্ঞ সাকিব আল হাসান। ক্রিজে আসেন অভিষিক্ত সাব্বির। অথচ এক বল পরেই তিনি নিজেও ডাউন দ্যা উইকেটে এসে হাঁকাতে যান!

নিঃসন্দেহে সদ্য অভিষিক্ত একজন ব্যাটসম্যান নার্ভাসনেস থেকে এমনটি করেছেন, এটাই স্বাভাবিক। সেদিন যতক্ষণ ক্রিজে ছিলেন, ততক্ষণই ছটফট করেছেন, মনে হয়েছে আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগছেন! অথচ এই সাব্বিরই ওয়ানডে ও টি২০ অভিষেকে ছিলেন অন্যরকম।

সীমিত ওভারের ক্রিকেটে স্লগ ওভারেও তাকে আমি ব্লক হোলের ইয়র্কারে সলিড ডিফেন্স করতে দেখেছি। সেই সাব্বিরই দলের বিপর্যয়ের সময় টেস্ট অভিষেকে ওভাবে ডাউন দ্যা উইকেটে চলে আসবেন, তাও এক বল আগে একই ভুলে সাকিব আল হাসানকে হারানোর পর, বিষয়টা আমার জন্য প্রচন্ড বিস্ময় হয়েই এসেছে!

তবে সেই বিস্ময়কে ছাড়িয়ে গেছে যখন সেদিন রাতে গণমাধ্যমগুলোর বরাত দিয়ে জানতে পারলাম, সাব্বির রহমান অভিনীত একটি বিজ্ঞাপনের প্রচার বন্ধ করেছে বিসিবি! ঠিক তখনই সাব্বিরের ঐ এলোমেলো ব্যাট চালানোর আরেকটি ব্যাখ্যা চোখের সামনে চলে আসলো! মডেল নায়লা নাইম এর সাথে সাব্বিরের ‘অস্কার’ নামক একটি পানীয়র ঐ বিজ্ঞাপনটি নিষিদ্ধ করার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বিজ্ঞাপনটি শোভন নয়, রুচিশীল নয়!

এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন পড়লাম জাগোনিউজ২৪ সাইটে। সেখানে এ বিষয়ে অস্কার বেভারেজ কোম্পানির চিফ অপারেটিং অফিসার আনিসুর রহমান বলেন,

‘আসলে ক্রিকেটারদের সঙ্গে বিজ্ঞাপন করতে গেলে আমাদের অনেক নিয়ম-কানুন মানতে হয়। এ অনুযায়ী আমরা সব নিয়ম মেনেই সাব্বিরকে বিজ্ঞাপনের জন্য মনোনয়ন করেছিলাম। তাকে বিজ্ঞাপনের স্ক্রিপ্ট, বিপরীতে কে থাকছে সব জানিয়েছিলাম। তখন সাব্বির বিসিবির অনুমতি নিয়েই সবকিছু করতে রাজি হয়। আমাদের এ বিজ্ঞাপন আগস্টের শেষ কি সেপ্টেম্বরের প্রথমে প্রচার শুরু হয়। অথচ এতদিন চলার পর হঠাৎ করেই এটা বন্ধ করতে গতকাল আমাদের একটি ই-মেইল দেয়। তারা সাব্বিরকে ৫ তারিখ জানিয়েছে, তবে আমাদের দিয়েছে গতকালই। আমরা সাব্বিরের ম্যাচ শেষ হওয়া পর্যন্ত সময় চেয়েছিলাম; কিন্তু বিসিবি বলেছে এখনই বন্ধ করে দিতে। আমরা সেটা করেও দিয়েছি।’

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, ‘সব নিয়ম মেনেই’ যদি সাব্বির এই বিজ্ঞানটি করার অনুমতি পেয়ে থাকেন, তবে অনুমতি প্রদানের সময় বিসিবির ‘রুচিবোধ’ কোথায় ছিল? বেশ কিছুদিন প্রচারের পর কেন আকস্মিক বিসিবির রুচিবোধের বিবর্তন ঘটলো?

সাব্বিরের করা ঐ বিজ্ঞাপনটি আমি নিজেও দেখেছি। যে পানীয়র বিজ্ঞাপনে সাব্বির অভিনয় করেছেন, সেটি কোন ‘নিষিদ্ধ’ পানীয় নয়। যেই মডেলের সাথে বিজ্ঞাপনটি করেছেন, সেই নায়লা নাইমও মিডিয়া জগতে নিষিদ্ধ কেউ নন। এমনকি বিজ্ঞাপনটি কতখানি রুচিশীল, কতখানি অরুচিকর সেটা নিয়েও অনেক রকম বিতর্ক হতে পারে। রুচিহীনতার কারণ যদি বিজ্ঞাপনের নারী মডেল নায়লা নাঈম হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রেও প্রশ্ন থেকে যায়। ইতিপূর্বে ‘নয়ের’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের শোরুমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একই সাথে অংশ নিয়েছিলেন মাশরাফি, রিয়াদ, মুশফিকরা। সেখানে ছিলেন মডেল নায়লা নাঈমও, তুলেছিলেন ছবি। তখন কেন ‘রুচি’র প্রশ্ন ওঠেনি?

naila

মজার ব্যাপার হচ্ছে, ২০১৫ সালেই বিসিবি আয়োজিত টুর্নামেন্ট ‘বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নৃত্যশিল্পী হিসেবে বলিউডের শ্রীলিঙ্কান অভিনেত্রী জ্যাকুলিন ফার্নান্দেজ নেঁচে গিয়েছেন। উপস্থাপনা করেছেন শিনা চৌহান, পামেলার মতো ভারতীয় উপস্থাপিকারা। সেসময়ও অনেকে এসব শিল্পীদের আনার কারণে বিসিবি’র রুচিবোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, তবে সেসময় বিসিবি থোড়াই কেয়ার করেছে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, রুচির প্রশ্নে দেশি ও বিদেশি শিল্পীদের ক্ষেত্রে বিসিবির মানদন্ড ভিন্ন ভিন্ন কি না!

যাই হোক, বিসিবি যদি মনে করে এই বিজ্ঞাপনটির প্রচার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত সঠিক, আমি সেটিও মেনে নিতে রাজি আছি। কিন্তু একটি টেস্ট ম্যাচ চলাকালীন সদ্য অভিষিক্ত একজন ক্রিকেটারের উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যে ঐ ক্রিকেটার ও বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যে ক্ষতিকর, সেই স্বাভাবিক কান্ডজ্ঞানটুকু ঐ বিজ্ঞাপন নির্মাতা কোম্পানির থাকলেও বিসিবির কেন হয় নি, সেটি এখনো আমার বোধগোম্য নয়!

জাগোনিউজের ঐ প্রতিবেদনের আরেকটি প্যারায় বলা হয়েছে,

/এ চুক্তি বাতিল করলে বেশ বড় ধরনের ক্ষতিরও সম্মুখীন হবেন সাব্বির। জানা গেছে, বিজ্ঞাপনটি করতে প্রায় ২৫ লাখ টাকা নিয়েছেন তিনি। এমনকি বিজ্ঞাপন তৈরি খরচ ছাড়াও অন্য সব খরচ মিলিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা খরচ করেছে অস্কার। এখন দেখার বিষয়, সাব্বির এ বিষয়টি কীভাবে সামাল দেন।

পুরো বিষয়টি অস্কার থেকে সাব্বিরকে জানানো হয়েছে বলেও জানান আনিসুর। বলেন, ‘আমরা বিষয়টি সাব্বিরকে ই-মেইল করে জানিয়েছি। সে এখন চট্টগ্রামে টেস্ট খেলছে। সে যেদিন আমাদের সঙ্গে বসবে তখন আমরা এ নিয়ে আলোচনা করবো। কারণ এ বিজ্ঞাপনে আমাদের সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এখন এটা কীভাবে কী হবে, সে কীভাবে এ ক্ষতি পুষিয়ে দেবে তা নিয়ে আলোচনা করবো।’/

অস্কার বেভারেজের অনুরোধ উপেক্ষা করে চট্টগ্রাম টেস্টের মাঝপথেই বিসিবি ঐ বিজ্ঞাপনের প্রচার বন্ধ করাকে অত্যাবশ্যকীয় মনে করেছে। তাই, অভিষেক টেস্ট চলাকালীন সময় একজন ক্রিকেটারকে যদি ২৫লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতির ব্যাপারে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার সাথে আলোচনার দুশ্চিন্তা মাথায় ঢোকাতে হয়, তবে সেই ব্যাটসম্যান যদি ক্রিজে নেমে এলোমেলো ব্যাট চালান, সেক্ষেত্রে তাকে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না!

এজন্য অবশ্যই বিসিবির অদ্ভুৎ সময়জ্ঞান ও কান্ডজ্ঞানহীনতাই দায়ী! মাত্র ৩টা দিন অপেক্ষা করে বিজ্ঞাপনটি বন্ধের বিষয়ে ব্যবস্থা নিলে কি খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যেত? সেই বিজ্ঞাপনটি, যেটি গত সপ্তাহ দুয়েক ধরেই হাজারবার টেলিভিশনের পর্দায় প্রচারিত হয়ে গেছে?

বিসিবি বাংলাদেশ ক্রিকেটের অভিভাবক, ক্রিকেটারদের অভিভাবক। সেই সংস্থাই যদি জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের উপর বাড়তি চাপ প্রয়োগ করতে একটুও চিন্তাভাবনা না করে, তবে আমার মতো সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীদের হতাশ ও ক্ষুব্ধ হওয়া ছাড়া আর কি ই বা করার আছে? যেখানে অস্কার দাবি করেছে যে বিসিবিই তাদেরকে অনুমতি দিয়েছিল? অস্কারের এই দাবি যদি সত্য হয়, তবে পূর্বে অনুমতি প্রদানকারী কেউ কি জবাবদিহি করবেন? যদি মিথ্যা হয়, বিসিবি কি গণমাধ্যমের কাছে পুরো ব্যাপারটি পরিষ্কার করবে?

এতোকিছুর পরেও সাব্বির চট্টগ্রাম টেস্টে চতুর্থ ইনিংসে যে বীরত্ব দেখিয়েছেন তা নিঃসন্দেহে অসাধারণের চেয়েও বেশি কিছু। সাব্বির রহমানরা বাংলাদেশ ক্রিকেটের সম্পদ। দয়া করে আমাদের সম্পদগুলোকে নিয়ে ছেলেখেলা করবেন না!

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

Ad