“এখানে এসে আমরা যেটা করেছি স্কোয়াডটা ঠিক করেছি…একাদশ কী হতে পারে, কে না খেললে কে খেলবে, এই ব্যাপারটা আমরা মোটামুটি ফাইনাল করেছি। এখানে তো সরাসরি ইনভলমেন্ট আছেই”- বিসিবি প্রধান

দল নির্বাচনে বিসিবি প্রধানের হস্তক্ষেপ বাংলাদেশের ক্রিকেটে একসময় ছিল ওপেন সিক্রেট। এখন ‘সিক্রেট’ বলে কিছু নেই, সবই ‘ওপেন।’ হস্তক্ষেপও নয়, বোর্ড প্রধান গোটা স্কোয়াডই ঠিক করে দেন। এমনকি একাদশ চূড়ান্ত করা, কে না খেললে কে খেলবে, এসবও ঠিক করে ফেলেছেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার, শুধু এসব করছেনই না, প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে সেসব ঘোষণা দিয়ে জানান। গর্ব ভরে নিজের সম্পৃক্ততার কথা বলেন। বাংলাদেশের ক্রিকেট এই জায়গায় চলে এসেছে যে এসব ব্যাপারে এখন চক্ষুলজ্জার ব্যাপারও নেই।

তাহলে নির্বাচক কমিটি রাখার দরকারটা কি?

“আমি নিজে সবকিছু দেখভাল করার জন্য শ্রীলঙ্কায় থাকছি। ওদের সঙ্গে থাকব সারাক্ষণ”- বোর্ড প্রধান

বোর্ড প্রধান নিজেই সবকিছু দেখভাল করবেন। দলের সঙ্গে থাকবেন সবসময়। তিনি দল নির্বাচন করেন। দলের সঙ্গে থাকবেন, সব দেখভাল করবেন। নি:সন্দেহে তিনি ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে কর্মঠ বোর্ড প্রধান। এত কাজ আর কেউ কখনও করেননি। এত কথা বলার তো প্রশ্নই আসে না। উনি একমেবাদ্বিতীয়ম।

কথা হলো, তাহলে এত এত পয়সা খরচ করে কোচ, টিম ম্যানেজমেন্ট, ম্যানেজার, এত এত সাপোর্ট স্টাফ রাখার দরকার কি?

“গত এক বছরে ওর টি-টোয়েন্টি রেকর্ডে দেখবেন, বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রান ওর। সেই হিসেবে, ওর অভিজ্ঞতাও যথেষ্ট”- সাব্বির রহমানকে দলে রাখা নিয়ে প্রধান নির্বাচকের ব্যাখ্যা।

দল ঘোষণার দিন থেকে গত এক বছরে বাংলাদেশের হয়ে টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ রান সৌম্য সরকারের, ৬ ম্যাচে ২০১। ১৪৬ রান করে দুইয়ে মাহমুদউল্লাহ, ১১০ রান করে তিনে মুশফিকুর রহিম। ৫ ম্যাচে ৬০ রান করে সাব্বির রহমান আছে ৬ নম্বরে। ভরা সংবাদ সম্মেলনে ডাহা মিথ্যা বললেন প্রধান নির্বাচক।

সাব্বিরকে দলে রাখা নিয়ে আমার আপত্তি নেই। অন্তত টি-টোয়েন্টিতে আমি তাকে নিয়মিত দলে চাই। প্রধান নির্বাচক হয়ত বলতে পারতেন, “সাব্বিরের মাঝে টি-টোয়েন্টি ম্যাটেরিয়াল আছে, আমাদের সত্যিকারের টি-টোয়েন্টি ব্যাটসম্যান তেমন আর কেউ নেই, খারাপ সময়ে ওকে সমর্থন দিতে চাই, ফর্মে ফেরার সুযোগ দিতে চাই, দীর্ঘমেয়াদের কথা ধরলে সাব্বিরকে টি-টোয়েন্টিতে আমাদের লাগবে”-ইত্যাদি ইত্যাদি। সেসব বললে তবু চিন্তা-ভাবনার স্বচ্ছতা বোঝা যেত। কিন্তু প্রধান নির্বাচক দিলেন পুরো ভুল ও বিভ্রান্তিকর যুক্তি!

“ইমরুল কায়েসের অন্তর্ভুক্তি তৃতীয় ওপেনার হিসেবে। আমরা চাচ্ছি, যারা ফাস্ট বোলিংয়ের বিপক্ষে ভালো ব্যাটিং করতে পারে, এমন একজনকে নিতে। যেহেতু ইমরুল আমাদের টেস্ট ওপেনার। শ্রীলঙ্কার কন্ডিশনে পেসারদের আধিক্য থাকবে। এখানে আপনারা দেখেছেন শ্রীলঙ্কা পেসারদের নিয়ে খেলেছে। ভারতও অনেক পেসার নিয়ে খেলে। ওই সব চিন্তা করেই তৃতীয় ওপেনার হিসেবে ওকে নেয়া”- প্রধান নির্বাচক

শ্রীলঙ্কার কন্ডিশনে পেসারদের আধিক্য থাকবে, ক্রিকেট ইতিহাসে এই কথা আমার মনে হয় প্রথম বললেন কেউ। আমি ঠিক জানি না, উনি কি বোঝাতে চেয়েছেন। হতে পারে, প্রেমাদাসার উইকেট স্পোর্টিং থাকবে এবার। কিংবা হয়ত পুরো ব্যাটিং সহায়ক থাকবে। সেখানে হয়ত স্পিনারদের ভূমিকা তেমন থাকবে না। কিন্তু সেটাও তো বোঝার উপায় নেই আগে থেকে। তার পরও তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, ওভাবে বললে কিছুটা বোঝা যেত। কিন্তু যেভাবে বললেন, তাতে কতটা কি বোঝা গেল?

১৪ টি-টোয়েন্টিতে ৯.১৫ গড়, নব্বইয়ের নিচে স্ট্রাইক রেট। ইমরুলের পক্ষে যুক্তি দেওয়া কঠিনই। হয়ত এবার অপ্রত্যাশিত ভাবে শ্রীলঙ্কায় খুব ভালো করে ফেলতেও পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নির্বাচকরা তাকে নেওয়ার যুক্তিটা কি দেখালেন?

এমনিতে দল নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন সবসময় থাকেই। সবার মন মতো দল গড়া যায় না। কখনোই সম্ভব নয়। কিন্তু আমি যাকে নেব, বা যাকে বাদ দেব, সেটির পেছনে শক্ত যুক্তি থাকতে হবে। চিন্তা-ভাবনা স্বচ্ছ থাকতে হবে। পরিকল্পনার প্রতিফলন পড়তে হবে। সবাই সেই যুক্তিতে একমত হবেন না। সবার পছন্দ হবে না। সেটা খুব জরুরীও নয়। জরুরী হলো নিজের কাছে পরিস্কার থাকা যে অমুককে এই কারণে নিয়েছি, তমুককে এই কারণে বাদ দিয়েছি। অমুকের কাছে এটা চাই, তমুকের কাছে এটা পাইনি। আমাদের নির্বাচকরা কি নিজেদের কাছে পরিস্কার?

টি-টোয়েন্টির প্রস্তুতির জন্য সাব্বিরকে টেস্টে খেলানো হয়। টেস্টের ওপেনার বলে ইমরুলকে টি-টোয়েন্টিতে নেওয়া হলো। প্রধান নির্বাচক যদি এসব হাস্যকর কথা বলেন,দেশের ক্রিকেটই হাস্যকর হয়ে ওঠে। এই ধরণের উল্টোপাল্টা যুক্তি ওই ক্রিকেটারদের প্রতিও এটা অন্যায়। নিজেদের সম্পর্কে তারা ভুল বার্তা পান। তাদের নিয়ে লোকে ভুল বার্তা পায়।

চন্দিকা হাথুরুসিংহে আচমকা বিদায় নেওয়ার পর থেকে দেশের ক্রিকেটে যে অস্থিরতা, বোর্ড কর্তারা সেটি ঠাণ্ডা মাথায় সামাল দেওয়ার বদলে অস্থিরতার আগুণে আরও ঘি ঢেলে চলেছেন। বোর্ড প্রধান, বোর্ড কর্তারা, প্রধান নির্বাচকরা যা করছেন আর যা বলছেন, সেটিকে বলা যায় জগাখিচুড়ি। যে খিচুড়ির স্বাদ অতি জঘন্য।

ভরসা এখন ক্রিকেটাররাই। তারা যদি শ্রীলঙ্কায় অভাবনীয় কিছু করে অস্থিরতা কিছুটা কমাতে পারেন!

Comments
Spread the love