খেলা ও ধুলারাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮

দ্য ব্যাটল অফ সান্তিয়াগো- ফুটবল মাঠের সেই অবিশ্বাস্য যুদ্ধ!

“শুভ সন্ধ্যা। এখন আপনারা দেখতে চলেছেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বোধবুদ্ধিহীন, ভীতিপ্রদ, ন্যাক্কারজনক ও মর্যাদাহানিকর মাচটি। এই প্রথমবারের মত দল দুইটি একে অপরের মুখোমুখি হতে চলেছে, এবং আমরা আশা করব এটিই যেন শেষবারের মত হয়। চিলির জাতীয় নীতিতে বলা হয়েছে, ‘বাই রিজন ওর বাই ফোর্স।’ কিন্তু আজকে তাদের খেলায় যুক্তি-বুদ্ধির ধার ধারতে দেখা যায়নি। ঠিক তেমনই ইটালি কেবল তাদের শক্তিই প্রদর্শন করে গেছে। আর সবমিলিয়ে এর ফলাফল ছিল বিশ্বকাপের জন্য বিশাল বড় একটি বিপর্যয়। বিশ্বকাপ যদি তার বর্তমান অবস্থায় টিকে থাকতে চায়, তাহলে এরকম ফুটবল খেলা দলগুলোর বিরুদ্ধে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। বস্তুতই, আজকে ঘরে বসে এই ম্যাচ দেখার পর আপনাদের মধ্যে অনেকেই হয়ত দাবি তুলবেন যেন ফিফা অতিসত্ত্বর এই দুইটি দলকে প্রতিযোগিতা থেকে বহিষ্কার করে দেয়।”

ঠিক এই কথাগুলোই বলেছিলেন বিবিসির উপস্থাপক ডেভিড কোলম্যান, ১৯৬২ ফুটবল বিশ্বকাপের স্বাগতিক চিলি ও ইটালির মধ্যকার ধারণকৃত ম্যাচটি প্রথমবারের মত যুক্তরাজ্যের টিভিতে সম্প্রচারিত হবার আগে। কারণ এই ম্যাচটিকে নেহাতই একটি ফুটবল ম্যাচ বললে ভুল হবে। অনেকের মতেই এটি বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ম্যাচ। এবং এর একটি গালভরা নামও আছে, যা শুনে এটিকে কোন ফুটবল ম্যাচ বলে মনেই হবে না। মনে হবে এটি যেন ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা ঢাল-তলোয়ার নিয়ে লড়াই করা কোন যুদ্ধ। নামটি হলো, ‘দ্য ব্যাটল অফ সান্তিয়াগো’!

এই ম্যাচে ঠিক কী হয়েছিল সে সম্পর্কে বিস্তারিত বলার আগে চলুন জেনে নেয়া যাক এই ম্যাচের আগেই গণমাধ্যম কীরকম ঠিক ঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করতে সক্ষম হয়েছিল এই ম্যাচটির ব্যাপারে। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই, চিলিয়ান সংবাদপত্র ‘ক্ল্যারিন’ সেবারের পুরো আসরটিকেই আখ্যা দিয়েছিল ‘বিশ্বকাপ কম, বিশ্বযুদ্ধ বেশি’ নামে। অন্যদিকে ম্যাচের দিন সকালে ‘এক্সপ্রেস’ পত্রিকা লিখেছিল, ‘এবারের বিশ্বকাপে রক্তগঙ্গা বয়ে যাবার প্রায় সকল পূর্বাভাসই পাওয়া গেছে।’

এবং এই সকল কথার একটিও অত্যুক্তি ছিল না। সেবারের বিশ্বকাপের প্রথম দুই দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল মোট আটটি ম্যাচ, এবং সেই আটটি খেলায়ই দেখা মিলেছিল চারটি লাল কার্ডের। পা ভেঙেছিল তিনজন খেলোয়াড়ের। অ্যাংকেলে ফ্র্যাকচার হয়েছিল একজনের। পাঁজর ভেঙেছিল আরও বেশ কয়েকজনের। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা বনাম বুলগেরিয়ার ম্যাচে, যেটিতে জয় পেয়েছিল দক্ষিণ আমেরিকার দলটি, স্প্যানিশ রেফারি হুয়ান গারদিয়াজাবাল গড়ে প্রতি ৭৮ সেকেন্ডে একটি করে মোট ৬৯ বার ফ্রি-কিকের বাঁশি বাজিয়েছিলেন। অপরদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম যুগোস্লাভিয়ার ম্যাচে মুহামেদ মুজিক এমন বাজে একটি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এডওয়ার্ড ডুবিনস্কির উপর যে পা ভেঙে গিয়েছিল তার। যদিও সেই অপরাধে ম্যাচ চলাকালীন লাল কার্ড দেখতে হয়নি মুজিককে, কিন্তু পরে ঠিকই এক বছরের জন্য আন্তর্জাতিক ফুটবল হতে নিষিদ্ধ হতে হয় তাকে।

এভাবেই বিশ্বকাপের সপ্তম আসরটি শুরুর মাত্র দুইদিনের মাথায়ই এতটা সহিংস হয়ে উঠেছিল যে সকলেই বুঝতে পারছিলেন সামনের ম্যাচগুলোতে আরও খারাপ কিছু হতে পারে। এবং সেটিই হয়েছিল চিলি ও ইটালির মধ্যকার ম্যাচটিতে। অবশ্য সেক্ষেত্রে শুধু বিশ্বকাপের প্রথম কয়েকটি ম্যাচের ঘটনাই ভূমিকা রাখেনি। একটি বড় প্রভাব ছিল চিলির তৎকালীন অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে ইটালির পত্রপত্রিকায় কটাক্ষ করে প্রকাশিত কিছু সংবাদও।

মাত্রই কিছুদিন আগে ভূমিকম্পের আঘাতে জর্জরিত চিলি তখনও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে আসতে পারেনি। এমতাবস্থায় বিশ্বকাপের মত বড় একটি আয়োজন করা তাদের জন্য ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ নেয়ায় অনেকেই সাধুবাদ জানিয়েছিল তাদের। কিন্তু সে পথে হাঁটেননি ইটালির ‘লা নাজোইনে’ ও ‘কোরিয়েরে দেল্লো সেরা’ নামের পত্রিকার দুই সাংবাদিক। তারা ক্রমাগত সান্তিয়াগো শহরকে ছোট করে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশ করতে থাকে। এর মধ্যে ছিল সান্তিয়াগোতে ফোন কাজ করে না, এখানে ট্যাক্সি পাওয়াটা বিশ্বাসযোগ্য স্বামী পাওয়ার মতই দুষ্কর, দারিদ্র্যতা, মূর্খতা এবং অ্যাকোহলের শহর সান্তিয়াগো, ভয়ংকর সান্তিয়াগো প্রভৃতি শিরোনামের কিছু সংবাদ, যা ছিল চিলিয়ানদের নিকট খুবই মানহানিকর। এবং এজন্য ক্ষোভ দানা বাঁধে তাদের মনে। দুই ইটালিয়ান সাংবাদিককে দেশে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা হলেও, ততদিনে সান্তিয়াগোর বার, রেস্টুরেন্ট, সুপার-মার্কেট থেকে শুরু করে জনসমাগম হবার উপযোগী সকল স্থানেই অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয় ইটালির নাগরিকদের।

খেলার মাঠেও যে সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে, আগ্নেয়গিরির লাভা জ্বালামুখ ছেড়ে বাইরে বাইরে আসবে, তাতে আর অস্বাভাবিক কী! এসব ব্যাপার আঁচ করতে পেরে আগেই নির্ধারিত স্প্যানিশ রেফারি সরিয়ে এই ম্যাচের দায়িত্ব দেয়া হয় ইংলিশ রেফারি কেন অ্যাস্টোনকে। বিশ্বকাপে চিলির প্রথম ম্যাচেও তিনিই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু রেফারি হিসেবে তাকে নিয়োগের মাধ্যমেও শেষ রক্ষা হয়নি।

ম্যাচ শুরুর মাত্র ১২ সেকেন্ডের মধ্যেই হলো প্রথম ফাউল। এবং তা উত্তরোত্তর এতটাই বৃদ্ধি পেতে লাগল যে চতুর্থ মিনিটেই কেন অ্যাস্টোনের পকেট থেকে বেরোল ম্যাচের প্রথম লাল কার্ড। এবং তিনি সেটা দেখালেন জর্জিও ফেরারিকে। কিন্তু ফেরারি মাঠ ছেড়ে যেতে নারাজ। তাই নিয়ে বাঁধল বিশাল বড় গন্ডগোল। সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেল ম্যাচ। প্রায় দশ মিনিট ধরে পরিস্থিতি সামাল দিতে হলো। এরপর ফেরারি মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে গেলে আবারও শুরু হলো ম্যাচ।

ফেরারি মাঠ ত্যাগ করলে কী হবে, তাতে ম্যাচের উত্তেজনা প্রশমিত হয়নি এতটুকুও। লাথি, ঘুষি, হাতাহাতি, কারণে-অকারণে ফাউল, আঘাত করে প্রতিপক্ষের নাক ভেঙে দেয়া – সবই চলতে লাগল। পাশাপাশি পরস্পরের প্রতি অবিরাম গালিবর্ষণ তো রয়েছেই। সময় যতই এগোতে লাগল, পরিস্থিতি যেন ততই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে লাগল।

এক পর্যায়ে খেলা আর নেহাত খেলায় সীমাবদ্ধ থাকল না। এটি যেন পরিণত হলো সম্মুখ-সমরে। আর খেলার মাঠটি রণক্ষেত্রে। খেলার ফলাফল যাই হোক, তাতে এখন আর কিছুই যায় আসে না। একে অপরকে আঘাত করে আহত করার মাধ্যমেই যেন পাওয়া যাবে প্রকৃত আত্মতৃপ্তি। এরই মধ্যে চিলির লিওনেল সানচেজ পরপর দুইটি মারাত্মক অফেন্স করে বসেন। প্রথমে তিনি নাক ভেঙে দেন ইটালির অধিনায়ক হুমবারতো মাসচিওর। আর এরপরে তিনি আহত করেন মারিও ডেভিডকেও। কিন্তু দুইটি অফেন্সই নজর এড়িয়ে যায় রেফারির। ফলে নিশ্চিত লাল কার্ড দেখা থেকে বেঁচে যান সানচেজ। অথচ ডেভিড যখন দ্বিতীয় অফেন্সটির জন্য প্রতিবাদ করতে শুরু করেন, তখন তিনি নিজেই বহিষ্কৃত হন মাঠ থেকে।

এরকম ম্যাচের প্রতিটি ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বাঁধতে থাকে যুদ্ধ, আর সেজন্য প্রয়োজন হতে থাকে পুলিশি হস্তক্ষেপের। এভাবে তিনবার পুলিশের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সেদিন সম্পন্ন হয় ম্যাচটি। স্বাগতিকদের পক্ষে ৭৩ মিনিটে রামিরেজ আর ৮৭ মিনিটে তোরো গোল দিলে, ২-০ ব্যবধানে জয়ী চিলি।

সব মিলিয়ে গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচের দুইটিতে জয় ও একটিতে হারের সুবাদে গ্রুপ বি থেকে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে (প্রথম পশ্চিম জার্মানী) কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে চিলি। আর ইটালি বাদ পড়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই। কোয়ার্টার ফাইনালে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে চিলি। কিন্তু সেমিফাইনালে আসরে চূড়ান্ত বিজয়ী ব্রাজিলের কাছে ৪-২ গোলে হেরে বসে তারা। যুগোস্লাভিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে আসরের তৃতীয় স্থান পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাদেরকে।

*

এখন ঘরে বসেই অনলাইনে কিনুন ক্যাসপারস্কি ল্যাবের সব পণ্য, খুব সহজে। অনলাইনে পেমেন্ট, অনলাইনেই ডেলিভারি!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close