ফুটবল শুধুই একটি খেলা নয়। এটি কখনও জীবনের চেয়েও বড়। তাই তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোর মত ফ্রান্সেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও, ২০০২ সালে ফ্রান্সের একটি জাতীয় দৈনিকে সেদেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি কে তা নিয়ে জরিপ হলে সেখানে মানুষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খলনায়ক এডলফ হিটলারকে নয়, ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে অন্য এক জার্মানকে। এবং বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, সেই জার্মান কোন রাষ্ট্রনায়ক নন। তিনি নিতান্তই একজন ফুটবলার। কিন্তু তবু ফ্রান্সের মানুষের হিটলারের চেয়েও তার প্রতিই বেশি আক্রোশ!

পাঠকের মনে নিশ্চয়ই কৌতূহল, তবে কে সেই ব্যক্তি? তিনি হ্যারাল্ড শুমাখার। পশ্চিম জার্মানীর সাবেক গোলরক্ষক। এবং তিনিই জন্ম দিয়েছিলেন বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ঘৃণিত ও বিতর্কিত ঘটনাটির। আজকাল কোন খেলোয়াড় অন্য আরেকজন খেলোয়াড়কে একটু বেপরোয়াভাবে ট্যাকল করতে গেলেই তা নিয়ে যুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। কিন্তু নিঃসন্দেহে বলা যায়, শুমাখার যা করেছিলেন তা ছিল এইসব ট্যাকলের চেয়ে শতগুণে বেশি ভয়ংকর।

১৯৮২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের কথা। তারিখটা ৮ জুলাই। সেভিয়ার এসাদিও রামোন সানচেজ পিজুয়ান স্টেডিয়ামে খেলা চলছে পশ্চিম জার্মানী ও ফ্রান্সের মধ্যে। দুই দলই নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে খেলছে ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে। কেউ কারও চেয়ে কম যায় না। প্রথমার্ধ্বের খেলা শেষে যখন দুই দলের খেলোয়াড়েরা ডাগ-আউটে ফিরে আসছিলেন, তখন খেলায় ১-১ গোলের সমতা। কিন্তু তখন পর্যন্ত কেউ আঁচও করতে পারেনি, ম্যাচের পরবর্তী অংশে এমন সব ঘটনার জন্ম হতে চলেছে যার ফলে এই ম্যাচটি আজীবন রয়েছে যাবে ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতির পাতায়।

৫০ মিনিটে বদলী খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন বাত্তিস্তন। এর মিনিট সাতেক পর মাঝমাঠ থেকে মিশেল প্লাতিনির দারুণ এক পাস পান তিনি। সেই বলের থ্রু ধরে পশ্চিম জার্মানীর শেষ ডিফেন্ডারকেও পেরিয়ে গিয়েছিলেন এই ফরাসী ডিফেন্ডার। সামনে শুধু বিপক্ষ দলের গোলরক্ষক শুমাখার। এবার শুধু তাকে বোকা বানাতে পারলেই গোল হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। কিন্তু যেই না তিনি গোলমুখে শট নিতে যাবেন, তার চোখে-মুখে অন্ধকার দেখার জোগাড়। গোলপোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসা শুমাখার হাওয়ায় ভেসে কাঁধ দিয়ে চার্জ করে এমনই জঘন্য এক ট্যাকল করেছিলেন তাকে। শুমাখারকে দেখে মনেই হয়নি যে আদতে বল ধরার চেষ্টা এক মুহূর্তের জন্যও তার ভেতরে ছিল। শুধু যেন সর্বশক্তি দিয়ে বাত্তিস্তনকে থামিয়ে দিতে পারলেই হয়। আর এমন এক ট্যাকলের ফলে বাত্তিস্তন থেমেই শুধু যাননি। সাথে সাথে তার তিনটি দাঁত শেষ, এবং ভেঙে যায় মেরুদন্ডের হাড়ও।

তারচেয়েও বড় কথা, প্রচন্ড যন্ত্রণায় কাঁতরাতে কাঁতরাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়া ফরাসী ডিফেন্ডার আর উঠতে পারেননি। তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে, এবং কোমায় চলে যান তিনি। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এমন জঘন্য একটি ট্যাকল করার পরও রেফারি শুমাখারকে কোন কার্ড দেখাননি। ফ্রান্স পায়নি কোন পেনাল্টিও। ততক্ষণে ফ্রান্সের দুইজন বদলী খেলোয়াড় নেয়া হয়ে গেছে। তাই বাকিটা সময় তাদের খেলতে হয় একজন কম খেলোয়াড় নিয়েও। তারপরেও শেষ পর্যন্ত লড়ে যায় তারা। দারুণ উত্তেজনা ছড়ানো ম্যাচটিতে নির্ধারিত সময়ে কোন মীমাংসা না হলে খেলা গড়ায় পেনাল্টি শ্যুট আউটে। এবং সেখানে দুটি শট ঠেকিয়ে দিয়ে নিজ দলকে ফাইনালে তোলেন শুমাখার, বনে যান হিরো! ফ্রান্সের খেলোয়াড়দের মধ্যে অবশ্য ওই মুহূর্তে ম্যাচে হার-জিতের চেয়ে মাথায় বেশি ঘুরছিল বাত্তিস্তনের চিন্তা। যেমন মিশেল প্লাতিনি তো ধরেই নিয়েছিলেন যে আর বেঁচে নেই বাত্তিস্তন। কারণ স্ট্রেচারে করে বাত্তিস্তনকে বের করে নিয়ে যাওয়ার আগে তিনি যাচাই করে দেখেছিলেন, শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে তার। দেহও পুরোপুরি অসাড়।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য প্রাণে বেঁচে যান বাত্তিস্তন। আবারও ফেরেন ফুটবল মাঠেও। এমনকি ১৯৮৪ সালে ফ্রান্স আর পশ্চিম জার্মানী আবারও এক ম্যাচে মুখোমুখি হলে সেখানে খেলেন বাত্তিস্তন আর শুমাখার দুইজনই। এবং ম্যাচ শেষে জার্সি বদলও করেন তিনি। কিন্তু তাই বলে কি সেদিনের সেই দুঃসহ স্মৃতি ভুলতে পেরেছেন বাত্তিস্তন? পেরেছেন শুমাখারকে ক্ষমা করতে?

২০১২ সালে এক সাক্ষাৎকারে সে প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন তিনি এভাবে,

‘আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। কিন্তু তার সাথে আমার আর সাক্ষাতের ইচ্ছা নেই। এমনকি এ নিয়ে আমি আর কথাও বাড়াতে চাই না। সময়ের সাথে সাথে আমার মধ্যে এ উপলব্ধি হয়েছে যে লোকে আজীবন তাকে এই ঘটনার জন্য বিদ্ধ করে যাবে। কিন্তু কী লাভ তাতে! যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। এবং যা হয়েছিল তাকে আমি নিছকই দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখতে চাই। কারণ আমাদের পক্ষে তো আর কোনদিন জানা সম্ভব নয় যে সেদিন তিনি যা করেছিলেন তা ইচ্ছাকৃত ছিল কি না।’

শুমাখারও কিন্তু কোনদিনই নিজের মুখে সেই ঘটনার দায় স্বীকার করেননি। তবে তিনি তার রচিত বইয়ে এ কথা স্বীকার করেছেন যে ওই ঘটনার পর তার নিজেকে একটি কাপুরুষ বলে মনে হচ্ছিল!

*

এখন ঘরে বসেই অনলাইনে কিনুন ক্যাসপারস্কি ল্যাবের সব পণ্য, খুব সহজে। অনলাইনে পেমেন্ট, অনলাইনেই ডেলিভারি!

Comments
Spread the love