একটা গল্প বলি। লোকটার ওজন ছিল ১৭৪ কেজি। আর দেড় বছরে সেই ওজন কমিয়ে নিয়ে আসেন ৮৮ কেজিতে! এই গল্পটা ডেডিকেশনের।

২০১০ সালে তার প্রথমবার ক্যান্সার ধরা পড়ে। তারপর যখন ছয়বারের মতন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, ১২টা সার্জারি আর ৯টা ক্যামোথেরাপি দিতে হয়। ডাক্তার যখন তাকে সার্জারি করতে নিয়ে যায়, তাকে জানানো হয়- তিনি বাঁচতেও পারেন, নাও বাঁচতে পারেন। তখন তিনি বলে উঠেন- তার বাঁচতে হবে, কারণ পরের বছর হবিট এর সেকেন্ড পার্ট বের হবে, তিনি এটা দেখেই মরতে চান! গত বছর সার্জারিতে যাওয়ার সময় তিনি অবলীলায় বলে উঠেন, ‘আরেহ ক্যানসারই তো হইসে, জ্বর তো হয় নাই!’ এই গল্পটা হাসিমুখে সব মোকাবেলা করার।

একবার তার একজন বন্ধু তাকে চ্যালেঞ্জ দেয়, তিনি যদি ৬ মাস সিগারেট না খেয়ে থাকতে পারেন, সে তাকে এক লাখ টাকা দিবে। প্রতিদিন ৫০/৬০টা সিগারেট খাওয়া লোকটা ঠিকই ৬ মাস সিগারেট না খেয়েছিলেন! এই গল্পটা চ্যালেঞ্জ নিতে পারার।

তিনি ভ্রমণ পিপাসু মানুষ, বিভিন্ন জায়গায় ভুঁড়ি ভুঁড়ি খাবারের ছবি আপলোড করেন। অথচ এর কিছুই তিনি হজম করতে পারেন না, প্রত্যেক বেলা খাবারের পর তিনি তা বমি করে ফেলে দেন! কারণ তার পাকস্থালীর ৮৫% কেটে ফেলে দেয়া হয়েছে! এই গল্পটা নিজেকে হ্যাপি রাখার।

এই যে এতক্ষন এতো গল্প বললাম, এরকম না জানা হাজার গল্প মিলে একটা অনুপ্রেরণার গল্প তৈরি হয়। হ্যাঁ, অনুপ্রেরণার নাম বেজবাবা। 

সুমন ভাই, আপনি জানেন না আপনার তৈরি করে দেয়া অদ্ভুত সেই ছেলেটির গল্প বুকে নিয়ে কত হাজার হাজার তরুন এখনো বাঁচার স্বপ্ন দেখে। আপনি জানেন না সুমন ভাই, ‘হারিয়ে যাইনি, এখনও চলছে এই হৃদপিন্ডটা’- কত ক্যানসার রোগীর হার না মানার সঙ্গী! আপনি জানেন না সুমন ভাই, ‘তুমি বলেছিলে মানুষ বদলায়, আমিও বদলে গেছি’-চিৎকার দিয়ে গাইতে গাইতে কত ধোঁকা খাওয়া প্রেমিক তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা পায়! আপনি জানেন না সুমন ভাই, ‘নিষ্পাপ আমার প্রস্থান লেখা থাকবে না, সাজানো কোন এপিটাফে’- এখনো কত অকাল গর্ভপাতে ঝরে যাওয়া ভ্রুনের কথা বলে! আপনি জানেন না সুমন ভাই, এখনো বৃষ্টি নামলে কত অভুক্ত হৃদয় আপনার এপিটাফে মন ভরায়।

ভালো থাকুন জাদুকর, যে জাদু দিয়ে আমাদের অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন, তার প্রবাহধারা বন্ধ না হোক। আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়গুলোর অনুপ্রেরণা ছিলেন আপনি, আমার লাইফের আরও যত খারাপ সময়ই আসুক না কেনো, অনুপ্রেরণা হিসেবে আপনিই থাকবেন।

(প্রিয় পাঠক, বেজবাবা ৩১শে ডিসেম্বর রাতে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন তার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে। অনেকেই হয়তো পড়েছেন, অনেকেই হয়তো পড়েননি। নিচে সেই স্ট্যাটাসটি দেওয়া হলো। একবার পড়ে দেখুন। স্ট্যাটাসটি পড়ার পর এই লোকটা যে এক অবিশ্বাস্য কিসিমের মানুষ, তা বোঝার বাকি থাকবে না সবার, এটা নিশ্চিত।)

*

২০১৭

জানুয়ারি: হেলথ চেকআপের জন্য ব্যাঙ্কক যাই। ডাক্তার ব্লাড টেস্ট করার পর বলে আমার কোলেস্টেরোল লেভেল অনেক হাই। ওষুধ দেয়।

ফেব্রুয়ারি: শরীর খারাপের দিকে যায়। ঘুম বন্ধ। ভয়ঙ্কর সব দুঃস্বপ্ন দেখা শুরু করি। সারাদিন মনে হয় একটা ঘোরের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি! পেটেও ব্যাথা বাড়তে থাকে কোন এক কারণে।

মার্চ: অবস্থার আরো অবনতি হয়। হেলুসিনেশন শুরু হয়। সিঙ্গাপুরে যাই সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে। সিঙ্গাপুরের ডাক্তার সমস্যাটা বের করে। ব্যাঙ্ককের ডাক্তার কোলেস্টেরোলের ওষুধ দিতে গিয়ে ‘ভুলে’ এপিল্পসির ওষুধ দেয়! আমি গত দুমাস এপিলেপ্সির ওষুধ খেয়ে দিন কাটিয়েছি! ভয়ঙ্কর ব্যাপার! সাথে সাথে ওষুধ বন্ধ করি। ব্যাংককে যাই আবার। স্পাইনের ডাক্তার বলে আমার সারভিকাল স্পাইনের অবস্থা অনেক খারাপ। যেকোনো সময় প্যারালাইজড হয়ে যেতে পারে পুরো শরীর! সাথে সাথে সার্জারি করাই। ডাক্তার আমার স্পাইনে ৩ টা স্ক্র্যু বসায়।

এপ্রিল: পেটে প্রচণ্ড ব্যথা। কিছু খেতে পারি না। বমি হয়ে যায়। ব্যাংককের ডাক্তার বলে এটা এসিফিউগাল ক্যানসারের পূর্বাভাস! আরেকটা সার্জারি হয়। স্টমাক পুরোপুরি ভাবে কেটে ফেলে দেয়া হয়।

মে: লোয়ার ব্যাকে অসম্ভব পেইন। হাঁটাচলা করতে পারি না ঠিকমত। সুতরাং আবার সার্জারি। ডাক্তার এবার আরও চারটা স্ক্র্যু বসায় স্পাইনে। সর্বমোট এখন আমার শরীরে ৭ টা স্ক্র্যু!

জুন: ব্যথার সাথে বসবাস।

জুলাই: কোন এক কারণে ব্যথা কমে না। বরং একটু বেশি ব্যথা অনুভব করি। থুতনিতে একটা টিউমার হয়।

অাগস্ট: থুতনির টিউমার অপসারণের জন্য সার্জারিতে ঢুকি ব্যাংককে। ডে সার্জারি। বিকালে হসপিটাল থেকে বিদায় নেই। রাস্তা পার হবার সময় একটা গাড়ি ধাক্কা দেয়। জ্ঞান হারাই। পাশের হসপিটালে ১১ ঘণ্টাব্যাপী ৯ টা সার্জারি হয় আমার।

সেপ্টেম্বর: আবার স্পাইনে সার্জারি! নিচের চারটা স্ক্র্যু খুলে ডাক্তার আরও ৮ টা স্ক্র্যু বসায়। সর্বমোট শরীরে এখন ওরা এগারো জন! সার্জারি চলাকালীন সমস্যা হয়। অ্যানাস্থেশিয়ার ভুল ডোসেজের কারণে আমার হার্ট বন্ধ হয়ে যায়। তারা আমাকে পুনরায় ফিরিয়ে আনে। সার্জারির পর আইসিইউ-তে নিয়ে যাবার ১ ঘণ্টার মধ্যে আমার লাং কলাপ্স করে। পুনরায় মরতে মরতে বেঁচে যাই।

অক্টোবর: অসম্ভব কষ্ট এবং ব্যথায় দিন কাটাই।

নভেম্বর: ব্যথা দিন দিন বাড়তে থাকে। পেইনকিলার ইনজেকশন নিতে হয় একদিন পর পর। ব্যাংককে ৪টা ডাক্তার দেখাই, কিন্তু পেইন কমে না। এর মাঝে সিডনিতে শো করে আসি।

ডিসেম্বর: সিঙ্গাপুরে যাই। সিঙ্গাপুরের ডাক্তার আমার সব ওষুধ চেঞ্জ করে দেয়। ব্যাথা কমা শুরু হয়। কনসার্ট করার জন্য প্রস্তুতি নেই। আবার রেকর্ডিং শুরু করি।

২০১৮, তুমি আসো। আমি রেডি!

 

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-