ফিচারটি যতবার পড়া হয়েছেঃ 605

বেইজ আর বেসিকই দেখাবে পথ!

Ad

১)

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে তখন ৬১/৬২ নাম্বার (এরকমই হবে। সঠিক আরসি নাম্বারটা মনে নেই) লংকোর্সে ক্যাডেটশিপের জন্য ক্যান্ডিডেটদের ISSB চলছে। বিভিন্ন গ্রুপ গ্রুপ করে ক্যান্ডিডেটদেরকে ইন্টার সার্ভিসেস সিলেকশন বোর্ডে রিপোর্ট করতে কলআপ লেটার পাঠানো হয়ে গেছে। যাদের এই ISSB সম্পর্কে ধারণা আছে তারা জানেন যে সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনীর অফিসার নির্বাচনের কাজটি এই বোর্ড করে থাকে। বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যতিক্রমধর্মী একটি এডমিশন টেস্ট, যেখানে ৪ দিন ধরে একজন ক্যান্ডিডেটের নানা ধরণের পরীক্ষা নেওয়া হয়, ক্যান্ডিডেটকে নানা সিচুয়েশনে ফেলা হয় এবং সকল পারফরম্যান্সকে গ্রাফ পেপারে ফেলে ঠিকই বের করে ফেলা হয়- লিডারশিপ কোয়ালিটির A টু Z কার মাঝে আছে এবং কার মাঝে নেই। শুধু একাডেমিক পড়াশুনাই নয়, শারীরিক ও মানসিক দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও এক্সট্রাকারিকুলার একটিভিটিজও আমলে নেওয়া হয়। যদি চেহারার সাথে প্রোফাইল, চিন্তাধারা এবং সাইকোলজি সবকিছুই পজিটিভ থাকে, তবে ISSB ক্যান্ডিডেটকে গ্রীনকার্ড প্রদান করে গ্রীন সিগনাল দেয় যে, সেই ক্যান্ডিডেটের মাঝে সশস্ত্র বাহিনীর অফিসার হওয়ার পটেনশিয়ালিটি আছে।

অতঃপর গ্রীনকার্ডধারী ক্যান্ডিডেট স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে সামরিক একাডেমীতে যায় কঠোর প্রশিক্ষণ এবং পড়াশুনা দুটো একসাথে করে সামরিক অফিসার হওয়ার জন্য। যতো সহজে লিখে ফেলা গেল, আসলে ততটা সহজ নয় ব্যাপারগুলো।
যাই হোক, ফিরে আসি, ISSB-তে ৬১ কিংবা ৬২ বিএমএ লংকোর্সের একজন ক্যান্ডিডেটের সেই গল্পতে। সে তার এইচএসসি কমপ্লিট করেছে উত্তরবঙ্গের এমন একটি কলেজ থেকে, সেই কলেজের নাম সেবারই সম্ভবত প্রথম শুনতে পান ISSB অফিসার্সরা। অজপাড়া গাঁ বলতে যা বুঝানো হয় সে ওইরকমই একটি জায়গা থেকে এসেছে। তার বাবা একজন কৃষিবিদ। আত্মীয়দের মাঝে কেউ আর্মি অফিসার তো নেই-ই, এমনকি রেফারেন্সে নেই ১ম শ্রেণীর কোন সরকারী কর্মকর্তার নাম। কেননা তার কলেজটিও সরকারী না যে বিসিএস ক্যাডার লেকচারারদের নাম দিবে। ISSB-তে বিভিন্ন বায়োডাটা ফর্মে যে সব তথ্য রেফারেন্সের জন্য চাওয়া হয়, সেখানে তার ‘ডিগ্রি’ কলেজের শিক্ষকদের নাম দিয়ে রেখেছে। ISSB-তে তার জন্য বানানো পারফরম্যান্সসহ বায়োডাটার ডোশিয়েতে স্বাভাবিকভাবেই লো ক্লাসের সিল লাগে প্রাথমিকভাবে।

প্রথম দিনের সাইকোলজি টেস্টের পর ISSB-এর সাইকোলজিস্ট আর সাইকিয়াট্রিস্টরা বুঝে যান, এর মধ্যেই আছে সেই পটেনশিয়ালিটি, যা তারা একজন নেতৃত্ব প্রদানকারী মানুষের মধ্যে তারা খুঁজে বেড়ান! অত্যন্ত হাই ক্লাস পজিটিভ সাইকোলজি, নিজের সম্পর্কে ক্লিয়ার কনসেপশন, কষ্ট করে উপরে উঠার ফিলিংস এবং জীবনে কিছু করে দেখানোর সিঁড়িটাকে আঁকড়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা কিংবা এসব কিছুই।

৪ দিনের ISSB-এর প্রতিটি পরীক্ষাতেই তার পারফরম্যান্সের গ্রাফ ছিল উর্ধ্বমুখী। একটা পরীক্ষার নাম: EXTEMPORE SPEECH, উপস্থিত বক্তৃতা। কমপক্ষে ৩ মিনিটের ইংরেজি বক্তৃতা। একজন অজপাড়া গা থেকে ৪ পয়েন্ট সামথিং নিয়ে ইন্টার পাস করা ক্যান্ডিডেট কী আর ইংরেজিই বা জানবে! কিন্তু সে যখন ৩ মিনিট শুরু করে শেষ করলো, তার কথার রেষ সবার কানে রয়ে গেল আরো ৩০ মিনিট! গ্রুপ টেস্টিংয়ে নিয়োজিত মেজরও অবাক হয়ে গেল এরকম এক্সটেম্পোর শুনে। একে একে সবগুলো টেস্ট শেষ করে সে যখন ডেপুটি প্রেসিডেন্সিয়াল ভাইভা দিতে বসল একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেলের সামনে, তার জন্য প্রথম প্রশ্নটা ছিলোঃ এতো ভালো ইংরেজি কোথা থেকে শিখেছো?

তার উত্তর ছিল- ENGLISH FOR TODAY পড়ে শিখেছি, স্যার!

যে ক্যান্ডিডেটের গল্প বললাম: সে অজপাড়া গা’র একটি অখ্যাত কলেজ থেকে HSC পাশ, বাবা কৃষক, ENGLISH FOR TODAY নামক বই পড়ে আর মোটা মোটা ব্যাটারি চালিত রেডিওতে বিবিসি শুনে ইংরেজি শিখেছে। সে ছিল এমন একজন মেয়ে যে ছোটকাল থেকে একটি স্বপ্নকে লালন করতো। ওই স্বপ্নকে সত্যি করতে পরিশ্রম করতে হয়েছে, গ্রামের মাতবর সমাজ, বাবা মা সবাইকে কনভিন্স করে আসতে হয়েছে ISSB-তে। সে কিন্তু আল্টিমেটলি গেইনার। ISSB তাকে নিরাশ করেনি! অজপাড়া গ্রাম থেকে উঠে আসা অখ্যাত এক কলেজ থেকে ইন্টার পাশ একটি মেয়ে আজ প্রথম শ্রেণীর সামরিক অফিসার। তার ছিল না হলিক্রস ভিএনসির মতো রিনাউন্ড কোন কলেজ, কিংবা ক্যাডেট কলেজ, ছিল না কোচিং টিউটর প্রাইভেট স্যার কিংবা ‘ভাইয়া/আপু’। ENGLISH FOR TODAY পড়েও ISSBতে গ্রীনকার্ড যে পাওয়া যায়,সেটা তো এই মেয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে। এই মেয়েটির সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় আছে।
২)

ছেলেটি বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান, ইন্সটিটিউট অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন (IBA)তে পড়ে। তার ব্যাকগ্রাউন্ডে এমন একটি কলেজ আছে, যে কলেজের নাম ইহজীবনে শোনার কথা নয় অন্তত IBA-এর শিক্ষার্থীদের। যেখানে ইংলিশ মিডিয়াম, এ-লেভেল, অতঃপর ভার্সন ক্যাডেট কলেজ, এনডিসি, রাজউক, ভিএনসি, গভঃ ল্যাব, ডিআরএমসির ছেলেপেলেরা লাইন দিয়ে থাকে একটা সিটের জন্য। একটা কমন ডায়লগ- আমি বিবিএ করতে চাই না,শুধু আইবিএতে পড়তে চাই!

বেশি কথা বলার দরকার নেই। আইবিএ কী, সেটা নিয়ে লেখার দরকার নেই। সেই ছেলেটির কথা বলছিলাম। সেই ছেলেটি এমন একটি হাই স্কুলে পড়তো সেই স্কুলে বছরে একবার পরীক্ষা হতো, তাও আবার শহর থেকে প্রশ্ন কিনে আনা হতো। আর কলেজের কথা তো বললামই। সেই ছেলেটি IBA-তে রিটেনে যখন চান্স পেলো এবং ভাইভার জন্য ডাক পেলো তখন তার এক সেট ফর্মাল পোশাক ছিলো না যেটা গায়ে দিয়ে সে ভাইভা দিতে যাবে! সে অনেক কষ্টের গল্প! সে গল্প শুনে মন খারাপ করার দরকার নাই। সে আল্টিমেটলি Institute of Business Administration-তে ভর্তি হলো। অজপাড়া গ্রাম থেকে উঠে আসা এই ছেলেটির ইংরেজি গ্রামারের বেসিক কোন লেভেলের ছিল, সেটা চিন্তার বাইরে। অন্ততঃ Mentors’ নামক IBA এডমিশন টেস্টের কোচিংয়ের সাথে জড়িত তার সিনিয়র অনেক ইন্সট্রাক্টরই জানে এই ছেলেটির ইংরেজির লেভেল কোথায়! কেননা যেখানে তারা আঁটকে যায়,ছেলেটা সেটার উত্তর দেয় সহজভাবে! এবং সৌভাগ্যবশত এই ছেলেটির সাথেও আমার ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় রয়েছে।

৩)

এতো বিশাআআল লেখার অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই। কে কোন কলেজ থেকে পড়েছে, কে কোন অজপাড়া গ্রাম থেকে উঠে আসছে, এটা কখনোই এডমিশন টেস্টে দেখা হয় না। আজকে রাজউক সবচেয়ে বেশি জিপিএ-৫ পেয়ে ফার্স্ট হতে পারে, তার মানে এই না যে রাজউকের সবাই বুয়েট ঢাবিতে চান্স পাবে! এডমিশন টেস্টে এরকম হাজার অজপাড়া গ্রাম থেকে উঠে আসা ছেলেমেয়েকে পাওয়া যায়, যাদের কলেজের নাম কেউ শুনে নেই। তো কী হয়েছে তাতে? THEY ARE IN POSITION… প্রতিবছর এরকম অসংখ্য আর হাজার হাজার এই টাইপের অজপাড়া গ্রাম থেকে উঠে আসা ছেলেমেয়েরা POSITION-এ গিয়ে দেখায়!

তারা দেশবিখ্যাত কলেজ, নোট শীট, লেকচার বা গাইড ছুঁয়ে দেখার সামর্থ্যও রাখে না। কিন্তু তারা টিকে যায় এক মহাযুদ্ধে। কারণ একটাই, তাদের বেইজ আর বেসিক ঠিক আছে। টেক্সটবই যেটা দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদদের নিয়ে গড়ে তোলা কারিকুলাম কমিটি ঠিক করেছে,তার উপর তাদের আস্থা আছে। আজকে গাইড-ভাইয়া-আপু-লেকচার শীট-কোচিং সাজেশন-শর্ট সাজেশন-কোয়েশ্চেন ব্যাংক ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে মাথা নষ্ট। ‘IF YOU CAN COVER ALL YOUR SYLLABUS OF THE ENTIRE REQUIRED CLASS’, কোনো প্রশ্ন তোমাকে আটকাতে পারবে না। এটাই বাস্তবতা।

সেটা ভার্সিটি এডমিশন হোক কিংবা হোক চাকরীর ইন্টারভিউ! বেসিকে সামান্য ঘাপলা থাকলে, সেটা পরবর্তীতে অনেক বড় ফুটো হিসেবে দেখা দেয় ক্যারিয়ারের জন্য। মেইন বই কিংবা টেক্সট বই যে সিলেবাসের উপর লিখিত. সেটার পুরোটার উপর ক্লিয়ার কনসেপশন আনাটাই সবচেয়ে বড় প্রিপারেশন।

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (2 votes, average: 4.50 out of 5)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

Ad