একজন পারিবারিক বন্ধু। ছোটবেলা থেকে জানি তিনি মুক্তিযোদ্ধা। কিশোরী বেলায় একজনের সাথে পরিচয় হলো যিনি ঐ মানুষটাকে বেশি পছন্দ করতেন না (বা সেই মুহূর্তে কোন কারণে পছন্দ করছিলেন না)। কথায় কথায় প্রসঙ্গ উঠলো একদিন তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে। অপছন্দ করা মানুষটি নাক উঁচু করে বললেন, “মুক্তিযোদ্ধা!? উনি তো ট্রেইনিং-এ গিয়েছিলেন মাত্র, যুদ্ধ করার সুযোগ পাননি! উনি আবার মুক্তিযোদ্ধা?”

আমি কিশোরী যেহেতু, কৈশোরের মনোজগতে দোলা দিয়েছিলো কথাটি। যিনি অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধ করেননি, তিনি হয়তো আসলেই মুক্তিযোদ্ধা নন। তখনো আমার সাথে সরাসরি পরিচয় না থাকা মানুষটিকে কিছুটা ‘ভন্ড’ই ভেবেছিলাম, মনে হয়েছিলো, তিনি যা করেননি, তা নিয়ে হয়তো বড়াই করেন। তাঁকে মুক্তিযুদ্ধ উপাধি দেয়াটা ঠিক নয়। এই প্রসঙ্গে পারিবারিক মন্ডলে এরপরে কখনো কথা উঠলে আমি এড়িয়ে চলতাম। মনে হতো, বাকিরা তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা ডাকলে ডাকুন, আমি কেন একটি ‘মিথ্যাচারে’ অংশ নেবো? আমি মুখফুটে কখনো কিছু বলিনি, কিন্তু মোট কথা, সেই যে মনে একটি সংশয়ের বীজ ঢুকেছিল সে বয়সে, সেটির কারণে আমি তাঁর প্রাপ্য সম্মান তাঁকে দেইনি। “প্রাপ্য” বলে মনেই হয়নি যে!

এরপর ভুলেও গেছি, বহু বছর পার হয়েছে। অনেক, অ-নে-ক বছর পর তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলবার সুযোগ হয়। এই কথা, সেই কথা থেকে আমিই তুললাম মুক্তিযুদ্ধের কথা। তাঁর গল্প শুনতে চাইলাম। ততদিনে আর কিশোরী মনের সে দ্বন্ধ নেই; আমি জানি, অস্ত্র হাতে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেয়া মানুষগুলো যেমন মুক্তিযোদ্ধা, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে মাঝি প্রতিদিন বাড়িঘর খোয়ানো মানুষগুলো পার করে নিয়ে যেতেন, তিনিও মুক্তিযোদ্ধা।

তিনি তাঁর ছাত্রাবস্থা থেকে গল্প বলা শুরু করলেন; পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আক্রমণ দেখেছেন, সহপাঠীর মৃত্যু দেখেছেন, হল থেকে পালিয়েছেন প্রাণ হাতে করে, গ্রামে গেছেন প্রথমে, সুযোগের অপেক্ষায় থেকে থেকে একদিন ইন্ডিয়াতে, সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। দেশে যেই ফিরেছেন, একটা যুদ্ধে অংশ’ও নেয়ার কথা ছিলো, তার ঠিক আগে দেশ স্বাধীন হলো।

না, এই মানুষটাকে ছোট করার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। আর কিছুদিন আগে ফিরলে তিনিও সম্মুখ-যোদ্ধা হতেন; হতে পারে, প্রাণ খোয়াতে পারতেন, পঙ্গু হতে পারতেন। যুদ্ধবন্দী ৯ মাস তিনি হেসেখেলে পার করেননি, তাঁর’ও যুদ্ধ ছিলো। চোখের সামনে মৃত্যু দেখেছেন, মৃত্যুভয় প্রত্যেক মুহূর্তে ছিলো – যুবক তিনি, পাকসেনা কিংবা রাজাকারদের চোখে পড়লে তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে মেরে ফেলাটা অসম্ভব ব্যাপার ছিলো না। – তিনি চাইলে দেশদ্রোহী হতেই পারতেন; নিজেকে বাঁচাতে হয়ে যেতেন রাজাকার, – নিজের দেশের মানুষদেরকেই অত্যাচার করতে পারতেন, খুন করতে পারতেন, এমন সব তথ্য দিতে পারতেন পাকিস্তানিদের যে বাংলার মানুষদের ক্ষতি হতেই পারতো।

তিনি সম্মুখযুদ্ধ হয়তো করেননি, কিন্তু তিনি তাঁর জীবন বাজি রেখেছিলেন। আমাদের দেশটা সুপারম্যানদের নিয়ে গড়া না; আপনার আমার মতো সাধারণ মানুষ, যাঁরা সেই মুহূর্তে সেটাই করেছিলেন, যেটুকু তাঁদের সুযোগ ছিলো, সামর্থ্য ছিলো। এমন মানুষ আমার পরিবারেও আছে, পারিবারিক বন্ধুদের মাঝে আছে। এই প্রত্যেকটা মানুষ আমাদের শ্রদ্ধা পাওয়ার যোগ্য, আমাদের সম্মান তাঁদের প্রাপ্য।

প্রথম আলো গত ১০ অক্টোবর একটি কার্টুন ছাপিয়েছে (“বেসিক আলী” ); কার্টুনটির ‘কৌতুক’ কেউ এক ঝলকে বুঝবেন কিনা, আমার সন্দেহ আছে। “আমি তো ভালোদের মাঝেই ছিলাম, তাই আমি কাউকে মারলে চলতো কি করে? – বেশ অনেকক্ষণ কার্টুনটির দিকে তাকিয়ে থাকার পরে অবশেষে এইটুকু আমার মাথায় ঢুকেছে। একটা ‘জোক’-এর পাঞ্চলাইন বুঝতে এতো সময় লাগলে সেটি আর কৌতুক থাকে না, সুপারফ্লপ হয়ে যায়। তারউপর জোকটি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে হলে আরেকটু সচেতন হওয়া যৌক্তিক, বিশেষ করে এমন একটি দেশে, যেখানে যুদ্ধাপরাধীর বিচার চার দশক পরে হয়, যেখানে মানুষ বিশ্বাসই করে না, গোলাম আযম, সাঈদী, এরা ‘ফুলের মতো পবিত্র’ তো নয়, বরং নরপশু। যে জোক দেখলে, কৌতুকটি বুঝে হোক, বা না বুঝে, মনে হয়, “মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্না করা” খুবই সাধারণ ব্যাপার। মুক্তিযোদ্ধারা ‘লাঞ্চ ব্রেক’ পেতেন, ক্যান্টিনে বসে খাবার অর্ডার দিতেন, ভরপেট খেয়ে আবার যুদ্ধে যেতেন। বাবুর্চিরা অষ্টপ্রহর ছিলেন তাঁদের খেদমত করার জন্য, যাঁদের জন্য ইহা নেহায়েতই চাকরি ছিলো আর সাধারণ যে কোন সময়ের মতো!!

না, এই মানুষগুলোকে প্রতিদিন প্রাণভয়ে থাকতে হতো! তাঁদের অনেকেই অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, কিন্তু যাঁরা কেবল চুলা’ই জ্বালিয়েছিলেন, সেই ‘অপরাধের’ জন্যেও পাক-সেনারা তাঁদের ব্রাশফায়ারে মারতে পারতো; তাঁদের পরিবারের মেয়েদের রাজাকারেরা ক্যাম্পে তুলে নিয়ে যেতে পারতো; ঘরের শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করতে পারতো। আজকে কোন কিশোর-কিশোরী এই কার্টুনটি দেখবে, মুচকি হাসি দেবে কি দেবে না, কিন্তু তাঁদের মাথায় গেঁথে যেতে পারে এই অবজ্ঞা-সূচক ভাবনা: “মুক্তিযোদ্ধা!? উনি তো রান্না করতেন মাত্র – উনি আবার মুক্তিযোদ্ধা!?”

এই মানুষগুলো আমাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে এর চাইতে বেশি সম্মানের অবশ্যই দাবিদার; আমরা যেন স্বাধীনতার চার দশকে এই সত্যটি কখনো ভুলে না যাই।

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-