একজন মাদ্রাসা প্রিন্সিপালের মাথায় মল ঢালার ঘটনায় প্রতিবাদ মোড় নিয়েছে নতুন দিকে! ফেসবুকে এক দল উগ্র ধর্মান্ধ মৌলবাদী এবং উগ্র ধর্মান্ধতার পৃষ্ঠপোষকেরা পুরো ঘটনাটা ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করার জন্য প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে এই বলে যে কেবল নাকি মুসলমান হওয়াতেই শ্যামল কান্তি স্যারের উপর হামলায় যে প্রতিবাদটা হয়েছিল, মাওলানা আবু হানিফাকে হেনস্থার ঘটনায় সেরকম প্রতিবাদ হয়নি। মানে এই শয়তানগুলো বলতে চেয়েছে শ্যামল কান্তি স্যারের ক্ষেত্রে যেমন সবাই কানে ধরে ছবি প্রতিবাদ জানিয়েছিল, স্রেফ মুসলিম হওয়াতেই নাকি মাওলানা আবু হানিফের ক্ষেত্রে মাথায় মল ঢেলে প্রতিবাদ জানায়নি সবাই! কি জঘন্য আর বিচিত্র এদের চিন্তাভাবনা, কি কুৎসিত এদের ধর্মব্যবসা!

অথচ দুটো ঘটনাই একেবার দুইরকমের, দুজনেই শিক্ষক, স্রেফ এই মিলটুকু ছাড়া এই দুটো ঘটনায় আর কোন মিলই নেই। শ্যামল কান্তি স্যারের ক্ষেত্রে কেন মানুষ কানে ধরে প্রতিবাদ জানিয়েছিল? কারণ নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় ধর্মান্ধদের ধর্মীয় অনুভূতি উসকে দিয়ে একেবারেই ডাহা মিথ্যা একটা অভিযোগে স্রেফ হিন্দু হবার কারণে শ্যামল কান্তি স্যারের উপর চড়াও হয় উগ্র মৌলবাদীরা। আর এই সুযোগে মীমাংসার নামে নিজেদের ক্ষমতার দাপট দেখানোর জন্য এবং উগ্র ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের নেতা সাজার অভিপ্রায়ে জাতীয় পার্টির নেতা সেলিম ওসমান শ্যামল কান্তি স্যারকে প্রথমে থাপ্পড় মেরেছিল, তারপর কানে ধরে উঠবস করিয়েছিল। এবং সবচেয়ে জঘন্য ঘটনাটি হচ্ছে এই পুরো ঘটনা স্থানীয় অসংখ্য মানুষের উপস্থিতিতে হলেও একজনও প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসেনি। এমন ভয়ংকর নির্লজ্জ সাম্প্রদায়িক হেনস্থার পরেও শ্যামল কান্তি স্যারের পাশে দাঁড়াবার কেউ ছিল না। তাকে ফাঁসানো হয়েছে, তারপরে অপদস্থ করা হয়েছে একাধিকবার। কোনোপক্ষ থেকে তার সমর্থনে কোনো কথা বলা হয়নি, তার পক্ষে কোনো আইনজীবী দাঁড়াতে রাজী ছিলেন না একটা সময়ে। তারপরে তাকে জেলে পাঠানো হয়েছে। সামাজিক ভাবে তার অবস্থানকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত সেই ঘটনার সুরাহা হয়নি। ফলে আমরা প্রতিবাদ একজন অসহায় বিচার না পাওয়া ক্রমাগত অপমানিত হওয়া শিক্ষকের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম স্বতঃস্ফুর্তভাবে, স্যারকে কানে ধরিয়ে অপমান করার প্রতিবাদে কানে ধরে ছবি তুলে ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচার হিসেবে টাঙ্গিয়ে প্রতিবাদ করেছিলাম।

অথচ আজ তারা মাওলানা আবু হানিফার ঘটনাটা প্রচার করছে এমনভাবে যেন আবারো ধর্মান্ধদের উসকে যায়। প্রথমে তারা প্রচার করলো, স্রেফ মুসলিম হবার কারণেই মাওলানা আবু হানিফার ঘটনায় আমরা প্রতিবাদ করিনি, কারণ এই হামলা নাকি আওয়ামীলীগের সন্ত্রাসীরা করেছে, তাই আমরা কোন প্রতিবাদ করবো না। অথচ তাদের এই ভয়ংকর অপপ্রচার ধরা খেয়ে গেল একদিনের মধ্যেই, যখন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এল যে এই হামলা চালানো হয়েছে মাদ্রাসার জমি দখল করতে না পেরে এবং প্রিন্সিপালের মাথায় মল ঢেলেছে জামায়াত-শিবিরপন্থী শয়তানেরা।

কাঁঠালিয়া গ্রামে দারুল উলুম দ্বীনিয়া আরাবিয়া কমপ্লেক্স আর এতিমখানা নির্মাণের জন্যে ২০০৯ সালে মাদ্রাসার পক্ষ থেকে জায়গা কেনা হয়েছিল। মাদ্রাসার সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট জামায়াতপন্থী কিছু লোক ওই জায়গা দখলের পায়তারা করছিল অনেকদিন ধরেই। যখন জায়গাটা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়েছিল, তখন সেটাকে তারা ব্যবহার করতো। দখল ঠেকাতে মাদ্রাসার পক্ষ থেকে ২০১৪ সালে একটা মামলাও করা হয়েছিল। 

এ বছরের ২রা ফেব্রুয়ারী কাঁঠালিয়া মাদ্রসার কমিটি গঠিত হয়, সভাপতি নির্বাচিত হন অ্যাডভোকেট এইচ এম মজিবুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। খন্দকার মোঃ জাহাঙ্গীর আলম নামের এক জামায়াতপন্থী নেতা সভাপতি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্ত তিনি হেরে যান। এই জাহাঙ্গীর ছিলেন মাদ্রাসার জমি দখলের চক্রান্তে জড়িত থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম।

মাদ্রাসা কমিটির নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর থেকেই আবু হানিফাকে হুমকি দিতে থাকে জাহাঙ্গীর আর তার লোকজন। আবু হানিফা কমিটির নির্বাচনে মজিবুরকে জিততে সাহায্য করেছেন, এরকম অভিযোগ ছিল তাদের। বিভিন্ন সময়ে আবু হানিফার কাছে পাঁচ লক্ষ টাকা চাঁদাও দাবী করেছিল তারা। টাকা না দিলে খুন করে লাশ গুম করা হবে, এরকম হুমকিও তাদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন আবু হানিফা।

ঘটনার দিন সকালে ফজরের নামাজ পড়ে গ্রামে হাঁটতে বের হয়েছিলেন আবু হানিফা। বাড়ি থেকে একটু দূরে যাওয়ার পরেই হানিফার ছোট ভাই জাকারিয়া সহ জাহাঙ্গীর ও মাসুম সর্দার এবং জাহাঙ্গীরের দলের কয়েজন মিলে তার পথরোধ করে। তাকে মারধর করা হয় সেখানে। তিনি বাড়িতে তার ছেলেকে জানানোর জন্যে ফোন বের করেছিলেন পকেট থেকে, সেটাও কেড়ে নেয়া হয়। তারপর মাটির হাড়িতে করে আনা বিষ্ঠা ঢেলে দেয়া হয় তার মাথায়। এই ঘটনা নিয়ে সালিশ করার চেষ্টা করলে বা পুলিশকে জানালে পরিণতি খুব খারাপ হবে বলেও গালাগালি করতে করতে তাকে হুমকি দিয়ে যায় তারা।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাহাঙ্গীর জামায়াতী মতাদর্শের রাজনীতি করেন। ঝগড়া বিবাদটা তাদের মধ্যে অনেক আগে থেকেই চলে আসছিল। কিন্ত এমন আক্রমণাত্নক পর্যায়ে সেটা কখনোই যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে ঘটনার বর্ণনা শুনে গ্রামের মানুষজনও অবাক হয়ে গেছে। এরকম কিছু যে একজন মানুষের সঙ্গে কেউ ঘটাতে পারে, সেটা বিশ্বাসই করতে পারেননি তারা।

আর আমরাও বিশ্বাস করতে পারিনি যে এমন জঘন্য একটা ব্যাপারকে ফেসবুকের উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীরা একেবারেই ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে দোষ চাপাবে আওয়ামীলীগের উপর এবং “স্রেফ মুসলিম বলেই প্রতিবাদ হচ্ছে না” টাইপের নির্লজ্জ বয়ান দিয়ে একই সাথে মাথায় মল ঢালার মত নোংরা ইঙ্গিত দেবে এবং শ্যামল কান্তি স্যারের উপর সাম্প্রদায়িক হামলাকে তুচ্ছ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করবে। এরা হয়তো এটাও জানে না যে মাওলানা আবু হানিফার সাথে যে অপরাধ হয়েছে, তার সাথে জড়িতদের তিনজনকে গ্রেফতার করতে একদিন সময় লেগেছে (মামলা হওয়ার পরে)। বাকিরাও গ্রেফতার হবে, কারণ স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশ ব্যাপারটিকে গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় থানার পরিদর্শক দুইজনেই ঘটনার সাথে জড়িতদের শাস্তি দেয়ার বিষয়ে জোর দিয়েছেন। অথচ এই ধর্মান্ধ কীটগুলো কত সহজেই মিথ্যাচার চালিয়েছিল যে এই ঘটনা আওয়ামীলীগের কর্মীরা করেছে তাই বিচার হবে না। এবং এই মিথ্যাচার ফেসবুকে ছড়িয়েছে বাতাসের গতিতে! উগ্র ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক মিথ্যাচার ছড়িয়ে দিতে কি প্রবল উৎসাহ আমাদের!

শিক্ষক, শিক্ষক লাঞ্ছিত, বরিশাল, জামায়াত

অথচ সাম্প্রদায়িক যে ভয়ংকর অনাচার চলছে আমাদের দেশে গত ৪০ বছর ধরে, সে ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহ কিংবা চিন্তা আমাদের আছে বলে মনে হয় না। সাম্প্রদায়িকতা বলতে কি বোঝায়, সেটাই হয়তো পরিষ্কার জানে না অনেকেই! প্রীতম দাশ সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে খুব স্পষ্ট করে লিখেছেন নিচের এই লেখাটা-

সাম্প্রদায়িকতা জিনিসটা কী বোঝেন আপনারা? না বুঝলে এইবেলা বুঝে নেন। আবু হানিফার সাথে প্রতিপক্ষের দ্বন্দ্বের মূল কারণ মাদ্রাসার জমি। এই জায়গায় এই মাওলানা না থেকে কোনো ‘হিন্দু’ শিক্ষক থাকলে কী হতো বলেন দেখি। আবু হানিফার মামলা পুলিশ নিয়েছে সাথে সাথে, ঘটনার দুই দিনের ভিতরে। তারপরে কাজে নামতে সময় লেগেছে একদিনেরও কম। কোনো হিন্দুর জমি নিয়ে একই ঘটনা ঘটলে সেই মামলা পুলিশের খাতায় উঠতো না। অপরাধীরা বীরদর্পে ঘুরে বেড়াতো, মাঝেমধ্যে ধমকি দিয়ে যেত, সোমত্থ মেয়ে থাকলে ধর্ষণ করে ফেলে রেখে যেত। মাথায় আবর্জনা ঢালা হলে, তাকে প্রাণে মেরে ফেলা হয়নি বলে গ্রাম্য শালিসে একটা ‘মীমাংসা’ করে ফেলা হতো। তারপরে একদিন তিনি ইন্ডিয়া চলে যেতেন। প্রতিবাদী ভাইয়ারা তখন ‘হিন্দুরা কেন ইন্ডিয়ায় যায়’ বলে বিপ্লব করতেন। বাংলাদেশে অসংখ্য মন্দিরের জমি, হিন্দু মালিকের জমি দখল করা হয়েছে একটা ছাপড়া বসিয়ে ‘মসজিদ’ নাম দিয়ে, কারণ কিছু বলতে গেলে তাকে একটা সাম্প্রদায়িক চেহারা দেয়া সহজ হবে। ধর্মকে, ধর্মের পবিত্রতাকে এত নিচু কাজে ব্যবহার করার সময়ে প্রতিবাদী ভাইয়ারা খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা খেতে থাকেন।

সাম্প্রদায়িকতা কী বোঝেন? যখন পশ্চিমবঙ্গে একজন দরিদ্র অন্ধ মুসলমান ভিক্ষুককে বিজেপির আমদানি করা রামনবমীতে জোর করে হুমকির মুখে ‘জয় শ্রীরাম’ বলানো হয়, তাকে সাম্প্রদায়িকতা বলে।

আসল কথা হলো, বোঝেন নাই, কারণ আপনারা বুঝতে চাননা। অথবা সবই বোঝেন, না বোঝার ভান করেন মাত্র। আপনাদের এত এত প্রতিবাদী জোশ খুঁজে পাওয়া যায় না, যখন শরৎকাল আসার আন্দাজ পাওয়া যায় মূর্তি ভাঙ্গার খবরে।

আর কত মিথ্যাচার গা ভাসিয়ে উগ্র সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়িয়ে দিয়ে দেশটাকে নরক বানাবো আমরা? মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের প্রধান ও আদি শত্রু ছিল জামায়াত-শিবির-হেফাজতের মত উগ্র ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠী, আজো আমাদের আসল শত্রু তারাই! কেন প্রতিবার এই সহজ কথাটা ভুলে যাই আমরা? কেন আমাদের ঘাড়ের উপর বাঁশেরকেল্লার মত রাজাকার আলবদর বেঈমানদের মুখপাত্ররা উঠে বসে ধর্মান্ধতার বিষ ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পায় সারাদেশে? একজন সম্মানিত মাদ্রাসা শিক্ষকের মাথায় পায়খানা ঢেলে তাকে অপমানের মত ভয়ংকরতম অপরাধ যে একমাত্র বেইমান মুনাফেক ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠন জামায়াতই করতে পারে, প্রকাশ্য দিবালোকের মত এই চিরন্তন সত্যটা বুঝতে কেন আমাদের দেরি হয়?

আরও পড়ুন– আমরা এত অমানুষ হয়ে গেলাম!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-