ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

আমরা এত অমানুষ হয়ে গেলাম!

ফেসবুকে গতকালই ভিডিওটা চোখে পড়েছিল। পাঞ্জাবি পরিহিত একটা মানুষকে কয়েকজন লোক হায়েনার মতো দলবেঁধে ঘিরে ধরেছে। মানুষটার চুল-দাঁড়িতে মেহেদী লাগানো, পঞ্চাশ-ষাটের বেশী বয়স, বোঝাই যায়। লাল গেঞ্জি পরা এক যুবক তার বাহু চেপে ধরে আছে, যাতে তিনি পালিয়ে যেতে না পারেন। একজনকে দেখা গেল মুখবন্ধ একটা হাঁড়ি নিয়ে হাজির আছে সেখানে। লোকগুলোর উদ্দেশ্য বোঝা যায়নি তখনও। হুট করেই হাঁড়ির ঢাকনা খোলা হলো, সেখান থেকে তরল একটা পদার্থ জোর করেই ঢেলে দেয়া হলো তার মাথায়। বৃদ্ধমতোন মানুষটা ছাড়া পাবার চেষ্টা করছিলেন, কিন্ত এতগুলো লোকের সঙ্গে শক্তিতে তো তিনি পারবেন না। এর মধ্যে লাল গেঞ্জি পরা সেই যুবক আবার খুব যত্ন করে সেই তরল পদার্থটা বৃদ্ধের মাথা থেকে সারা শরীরে মাখিয়ে দিলো! যাবার বেলায় লোকগুলো তাকে শাসিয়ে গেল, এই ঘটনা নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে পরিণাম ভালো হবে না বলে!

ভিডিওর এই ঘটনাটা বরিশালের। গত শুক্রবার সকালে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করা হয় বাকেরগঞ্জের কাঁঠালিয়া ইসলামিয়া দারুচ্ছুন্নাত দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক, তত্বাবধায়ক এবং মসজিদের ইমাম আবু হানিফাকে। ভিডিওতে দেখা যাওয়া সেই কলসিতে করে আনা হয়েছিল বিষ্ঠা, সেগুলোই ঢেলে দেয়া হয়েছে আবু হানিফার গায়ে। যারা তাকে লাঞ্ছিত করেছে, তারা তারই এলাকার অধিবাসী। কি ঘটেছিল সেদিন? কেন খোলা রাস্তায় জনসম্মুখে এভাবে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এই লোকগুলো? তার অপরাধটা কি? চলুন, আবু হানিফার মুখেই শোনা যাক ঘটনার বৃত্তান্ত।

কাঁঠালিয়া গ্রামে দারুল উলুম দ্বীনিয়া আরাবিয়া কমপ্লেক্স আর এতিমখানা নির্মাণের জন্যে ২০০৯ সালে মাদ্রাসার পক্ষ থেকে জায়গা কেনা হয়েছিল। মাদ্রসার সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট জামায়াতপন্থী কিছু লোক ওই জায়গা দখলের পায়তারা করছিল অনেকদিন ধরেই। যখন জায়গাটা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়েছিল, তখন সেটাকে তারা ব্যবহার করতো। দখল ঠেকাতে মাদ্রসার পক্ষ থেকে ২০১৪ সালে একটা মামলাও করা হয়েছিল।

এবছরের দোসরা ফেব্রুয়ারী কাঁঠালিয়া মাদ্রসার কমিটি গঠিত হয়, সভাপতি নির্বাচিত হন অ্যাডভোকেট এইচ এম মজিবুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। খন্দকার মোঃ জাহাঙ্গীর আলম নামের এক জামায়াতপন্থী নেতা সভাপতি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্ত তিনি হেরে যান। এই জাহাঙ্গীর ছিলেন মাদ্রাসার জমি দখলের চক্রান্তে জড়িত থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম।

শিক্ষক, শিক্ষক লাঞ্ছিত, বরিশাল, জামায়াত

মাদ্রাসা কমিটির নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর থেকেই আবু হানিফাকে হুমকি দিতে থাকে জাহাঙ্গীর আর তার লোকজন। আবু হানিফা কমিটির নির্বাচনে মজিবুরকে জিততে সাহায্য করেছেন, এরকম অভিযোগ ছিল তাদের। বিভিন্ন সময়ে আবু হানিফার কাছে পাঁচ লক্ষ টাকা চাঁদাও দাবী করেছিল তারা। টাকা না দিলে খুন করে লাশ গুম করা হবে, এরকম হুমকিও তাদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন আবু হানিফা।

ঘটনার দিন সকালে ফজরের নামাজ পড়ে গ্রামে হাঁটতে বের হয়েছিলেন আবু হানিফা। বাড়ি থেকে একটু দূরে যাওয়ার পরেই হানিফার ছোট ভাই জাকারিয়া সহ জাহাঙ্গীর ও মাসুম সর্দার এবং জাহাঙ্গীরের দলের কয়েজন মিলে তার পথরোধ করে। তাকে মারধর করা হয় সেখানে। তিনি বাড়িতে তার ছেলেকে জানানোর জন্যে ফোন বের করেছিলেন পকেট থেকে, সেটাও কেড়ে নেয়া হয়। তারপর মাটির হাড়িতে করে আনা বিষ্ঠা ঢেলে দেয়া হয় তার মাথায়। এই ঘটনা নিয়ে সালিশ করার চেষ্টা করলে বা পুলিশকে জানালে পরিণতি খুব খারাপ হবে বলেও গালাগালি করতে করতে তাকে হুমকি দিয়ে যায় তারা।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাহাঙ্গীর বা আবু হানিফা, দুজনেই জামায়াতী মতাদর্শের রাজনীতি করেন। আর তাদের দ্বন্দ্বটা যতোটা না মাদ্রাসার ওই জমিকেন্দ্রিক, তারচেয়ে বেশী পারিবারিক। এরা একই পরিবারের আত্নীয়-স্বজনও বটে! বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে ঝগড়া বিবাদটা তাদের মধ্যে অনেক আগে থেকেই চলে আসছিল। কিন্ত এমন আক্রমণাত্নক পর্যায়ে সেটা কখনোই যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে ঘটনার বর্ণনা শুনে গ্রামের মানুষজনও অবাক হয়ে গেছে। এরকম কিছু যে একজন মানুষের সঙ্গে কেউ ঘটাতে পারে, সেটা বিশ্বাসই করতে পারেননি তারা।

অভদুত একটা সমাজ আমাদের! এক রাজনৈতিক নেতা এখানে শিক্ষককে কানে ধরিয়ে উঠবস করান, তো আরেকজন ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে শিক্ষকের গায়ে বিষ্ঠা ঢেলে দেন, জনসম্মুখে লাঞ্ছিত করেন শিক্ষককে! শিক্ষাগুরুর মর্যাদা আমরা এভাবেই রক্ষা করছি! আবার ঘটনায় অদ্ভুত একটা টুইস্টও আছে। এই ঘটনায় নির্যাতনকারী আর নির্যাতিত, দুজনেই জামায়াতপন্থী। অথচ ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ভিডিওর বেশীরভাগের ক্যাপশনেই জাহাঙ্গীরকে আওয়ামীলীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়েছে। এই কাজটা কি উদ্দেশ্য নিয়ে করা হয়েছে, সেটা যারা করেছেন তারাই ভালো জানেন!

শিক্ষক, শিক্ষক লাঞ্ছিত, বরিশাল, জামায়াত

ভিডিওটা দেখে, আর ঘটনাটার বর্ণনা শুনে শিউরে উঠেছি বারবার। একজন শিক্ষকের স্থান সম্মানের আসনে সবার ওপরে, সেই শিক্ষককে এভাবে রাস্তায় দলবেঁধে আক্রমণ করে মারধর করা হচ্ছে, তার গায়ে বিষ্ঠা ঢেলে দেয়া হচ্ছে! তিনি একটা মসজিদের ইমাম, তার পেছনে দাঁড়িয়ে শতশত মানুষ নামাজ পড়েন, সেই মানুষটাকে এভাবে জনসম্মুখে লাঞ্ছিত করা হচ্ছে, এটাও আমাদের দেখতে হলো! আবু হানিফা কি এমন অপরাধ করেছেন তাদের দৃষ্টিতে, আমি জানিনা। তাহলে তাকে এভাবে অসম্মানিত করার সাহস কি করে হয় কিছু দুর্বৃত্তের? আবু হানিফ তো পরিমল নন, কুষ্টিয়ার পান্না মাষ্টার নন। শিক্ষক নামের এই দুই কুলাঙ্গার যখন অপকর্ম ধরা পড়েছিল, তখন তো উৎসাহী কেউ তাদের গায়ে বিষ্ঠা ঢেলে দিতে এগিয়ে আসেনি। আবু হানিফা কি জাহাঙ্গীর বা তার দলবলের কাছে এতই নিকৃষ্ট ব্যাক্তি? ক্ষমতার মোহ কিংবা লোভ মানুষকে কতটা নীচে নামিয়ে আনতে পারে, সেটা জাহাঙ্গীর নামের পিশাচটা প্রমাণ করে দিলো।

লোকলজ্জার ভয়ে আবু হানিফা পুলিশের কাছেও যেতে চাননি। পরে যখন ভিডিওটা ভাইরাল হয়ে গেল, তখন থানায় গিয়েছেন, মামলা করেছেন। মামলা করার পরেও তার কাছে হুমকি আসা বন্ধ হয়নি। পুলিশ ইতিমধ্যে তিনজনকে আটক করেছে এই ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে। কিন্ত মূল আসামী জাহাঙ্গীর এখনও গ্রেফতার হয়নি। আমি এই মানুষের চেহারা নিয়ে সমাজে বসবাস করা পিশাচগুলোর কঠিণ শাস্তি চাই। এদের এমন শাস্তি দেয়া হোক, এমন অবস্থা করা হোক, যাতে এরপরে শিক্ষকের সঙ্গে বেয়াদবি করার আগে যে কারো মনে পড়ে এদের পরিণতির কথা। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচার করার আগে যেন সম্ভাব্য শাস্তির ভয়ে যে কেউ শিউরে ওঠে, এমন শাস্তি চাই এদের।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close