মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

‘বারেক মামা ওয়াজ হিয়ার, সো ওয়াজ আই’

শিবরাজ চৌধুরী

টিএসসি আমাদের মায়ামহল। টিএসসি বলতে কেবল ইট বালু হাফওয়াল বোঝায় না। আবার টিএসসি মানে কেবল ছাত্র আর এলামনাই না। নাম যদিও তার ছাত্রশিক্ষক কেন্দ্র , শিক্ষক বিষয়টা প্রথাগতভাবে যা বোঝায়, টিএসসিতে তাঁরা অনুপস্থিত। মাঝে মাঝে ক্যাফেটেরিয়ায় পলিটিকাল মিটিং-টিটিং করেন, সেসব টিএসসি নামক যাপনের অন্তর্গত না।

টিএসসিতে আমরা যাই, আমাদের মুলাকাত হয়, পরিচয় হয়, প্রেম হয়, ঝগড়া হয়, আন্দোলন আসে হুহু হুহু করে। আমরা শুধু শুধু বসে থাকি, আলাপ দেই, গীবত করি, গালি দেই, গান গাই, ষড়যন্ত্র করি, সাহিত্য করি। সারা দিন ক্লাস-ল্যাব-মিডটার্ম ইত্যাদির ক্লেদ কালিমা দূর করতে টিএসসি যাই আমরা। তখন হাওয়ার সাগরে থেকেও আমরা ভুলে গিয়েছি, হাওয়ায় ভাসছি, এই তাৎপর্য মূর্তিমান হয় কিছু মানুষ দ্বারা।

এরা হলেন টিএসসির চা, বিড়ি, শরবত, পিঠা ইত্যাদির বিক্রেতারা। চা আর বিড়িই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা উদ্বাস্তু হই। কেন? টিএসসি তো স্বীয় জায়গাতেই আছে। তাও কেন আমরা শ্যাডো, লালকেল্লা, টং বা অন্যত্র ভাগ হয়ে যাই? কারণ ফেব্রুয়ারিতে প্রশাসন এদের বসতে দেন না। আমরা এক মাস ধুঁকে ধুঁকে মরি, বইমেলা অর্ধেক মাটি হয়ে যায় টিএসসিবাসীর। তারপর মার্চ আসে, ১ তারিখে এরা ফিরে আসেন, আমরা সকাল থেকে উত্তেজিত হয়ে থাকি, কখন টিএসসি যাবো, যেয়ে এদের চেহারাটা দেখামাত্র আমাদের শ্যাডো যাওয়া হয় না আর, সমাজবিজ্ঞান চত্বর কালেভদ্রে। হাওয়া আসে, রোদ আসে, বৃষ্টি আসে, ঝড় আসে, ত্রাস আসে, ভালবাসা আসে আর আমরা টিএসসি থেকে শিক্ষিত হতে থাকি, আর ইট কাঠের এক প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠে। ক্যাটালিস্ট হিসেবে তারা মনোরম টাইফুন, বছরের পর বছর ধরে এই দায়িত্ব স্বেচ্ছায় পালন করে যাচ্ছে।

প্রথম দুই বছর টিএসসি যাতায়াত কম ছিল। গেলেও রুবেল ভাই আর ইউনুস সাব। কিন্তু মানবের পাল্লায় পড়ে বারেক মামার বান্ধা কাস্টমার হয়ে গেলাম। আর তো কেউ বললেই এত চিনি দেবে না। দুই দিন আসেননি, এসিস্টেন্ট বাজে চা বানিয়েছে, উনি ফিরতেই নালিশ দিয়েছি। চিনি দেয়নি, নালিশ দিয়েছি, উনি সম্রাটের মতন আজ্ঞা দিয়েছেন, “আমার চিনির হিসাব আমি করুম, মামায় আমার কাস্টমার, চিনি চাইলে দিবি”। নয়া কেউ ক্যাম্পাসে আসলে উনার মরিচ চা দিয়েই আমি আপ্যায়ন করেছি। এই লোকটা আমার এবং আমাদের যাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছে, ঠিক যেমন ইউনুস সাব, স্বপন মামা, রুবেল ভাই, কালাম ভাই বা হারুন সাবেরা। এদের কাউকে কাউকে কেন এত তাড়াতাড়ি চোখের সামনে দিয়ে চলে যেতে হবে? যেখানে আমার আর মোটে দুই মাস বাকি ক্যাম্পাস জীবনের!

এই যে এত এত সূর্য উঠে ডুবে যাওয়া, এত আন্দোলন, এত হতাশা, মনোমালিন্য, ব্রেকাপ, ভালবাসা এইসবের সরব নীরব সাক্ষী বারেক মামা। আমার জন্যে, মানবের জন্যে, প্রজ্ঞার জন্যে, দীপ্তির জন্যে, মারুদার জন্যে বা আরো বহু বহু মানুষের জন্যে। আজ ওই জায়গাটায় দাঁড়াবো কীভাবে যে জায়গায় বসে গতকালই স্বস্তিকা জিজ্ঞাসা করল, “বারেক মামা আসলো না? পানি খাওয়া লাগতো”। ইদানিং শরীর খারাপ যাচ্ছিলো, সে তো কত লোকেরই যায়, তাই বলে এইভাবে নক্ষত্র হয়ে যাবেন!

এই মানুষগুলা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এরা অত পাননি, টিএসসির বাচ্চারা এই যে ঘুরে ফিরে, এনারাও এরকম ছিলেন। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলো হাওয়ায় বড় হয়ে ধ্রুবতারা হয়েছেন, থাকবেন, আমরা আসব যাব, ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রে আমাদের অনেকের অলিখিত অভিভাবক থাকবেন এরাই। টাকা নেই, টাকা দরকার, বের করে দেবেন। ভাংতি নেই, ভাংতি দরকার, দেবেন। নেশাপাতি করে শরীর খারাপ করেছে কারও, মানা করবেন। প্রেম ভেঙেছে, মন খারাপ, একটা চা খান বলে বানিয়ে দেবেন।

মানুষ নক্ষত্রের সন্তান। নক্ষত্রে প্রত্যাবর্তন করবে। তবুও বারেক মামা কোন ভুলে এসে আমাদের মায়ামহলের তত্ত্বাবধান করে গিয়েছেন, এজন্যে কৃতজ্ঞতা জানাবার সুযোগটাও পেলাম না। তিনি এখন বলছেন হয়তো, “তোমরা শুধায়েছিলে মোরে ডাকি, পরিচয় কোন আছে নাকি, যাবে কোনখানে? আমি শুধু বলেছি কে জানে!”

তার “কে-জানে”র পথে তার প্রতি আমাদের ভালবাসারা গার্ড অফ অনার দিচ্ছে, আমি জানি, দিচ্ছে, টিএসসি ভুলবে না আপনাকে। খুব বুড়ো বয়সে টিএসসি আসলে আপনার জায়গাটায় বসে ভাববো, “বারেক মামা ওয়াজ হিয়ার, সো ওয়াজ আই।”

“বারেক মামা ওয়াজ হিয়ার, সো ওয়াজ আই”

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close