একশো আঠারো বছর আগের কথা। ১৮৯৯ সালের বাইশে অক্টোবর স্পেনের হুয়ান গাম্পার নামে এক ভদ্রলোক ‘লস দেপোর্তেস’ পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিলেন, একটা ফুটবল ক্লাব গঠন করতে চান তিনি। প্রথম দুই সপ্তাহে তেমন সাড়া এলো না, যে কয়জন তাঁকে চিঠি পাঠালেন, তাদের মধ্যেও ফুটবলের প্রতি অনুরাগটা খুব বেশী নজরে পড়লো না তার। তবে শেষদিকে বেশকিছু চিঠি এলো তার কাছে। তিনি প্রতিটা চিঠিরই জবাব দিলেন, জিমনাসিও সোলে একটা মিটিঙের আয়োজন করলেন গাম্পার, যারা আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন, তাদের সবাইকে নিমন্ত্রন করলেন সেখানে।

নির্দিষ্ট দিনে হাজির হলো এগারোজন মানুষ। সংখ্যাটা কাকতালীয়ভাবেই মিলে গিয়েছিল, একটা ফুটবল টিম গড়তেও তো এগারোজনই লাগে! গাম্পার দেরী করলেন না সিদ্ধান্ত নিতে, এই এগারোজন খেলোয়াড়কে নিয়েই সেদিন গঠন করলেন ক্লাব। গাম্পার কি জানতেন, কালের বিবর্তনে তার প্রতিষ্ঠিত সেই ক্লাবটা ‘মোর দ্যান এ ক্লাব’ খেতাব পাবে একদিন? দিনটা ছিল ১৮৯৯ সালের ২৯শে নভেম্বর, হুয়ান গাম্পারের হাত ধরে জন্ম নেয়া ক্লাবটার নাম ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনা, বিশ্বজুড়ে যার কোটি কোটি ভক্ত ছড়িয়ে আছে, মোহনীয় আর নান্দনিক ফুটবল উপহার দিয়ে বিশ্বকে মাতিয়ে রেখেছেন যে ক্লাবের ফুটবলারেরা, সুন্দর ফুটবল আর সাফল্যে যে সমার্থক শব্দ হতে পারে, সেটা যারা বাস্তবে দেখিয়ে দিয়েছে, তার নামই ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনা!

বার্সেলোনা, স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা, বার্সেলোনার জন্ম, লা লীগা, ইউরোপীয়ান চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, হুয়ান গাম্পার, এল ক্লাসিকো

সময় গড়িয়েছে, ধীরে ধীরে বার্সেলোনা পরিণত হয়েছে ইউরোপীয়ান ক্লাব ফুটবলের পরাশক্তিতে। সুসময় এসেছে, গেছে কত বাজে সময়ও। শুধুমাত্র ফুটবলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি এই ক্লাবের কার্যক্রম, হয়ে উঠেছে জনমানুষের প্রাণের দাবী আদায়ের কেন্দ্রস্থল, বিক্ষোভের মঞ্চ। কাতালুনিয়ার বিদ্রোহে বড় ভূমিকা রেখেছে ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনা, স্বজাত্যবোধের আভিজাত্যকে ধারণ করেছে গৌরবের সঙ্গে, রুখে দাঁড়িয়েছে রাজধানীকেন্দ্রীক স্পেনের স্বৈরশাসকদের অত্যাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে। মোর দ্যান এ ক্লাব তকমাটা তো বার্সেলোনার গায়ে এমনি এমনি সেঁটে যায়নি, ফুটবল ছাপিয়ে ঘরের মাঠ ন্যু-ক্যাম্পে বরাবরই শোনা গেছে জাতীয়তাবোধের বাণী। গ্যালারীতে কাতালানদের জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার অপরাধে জরিমানা করা হয়েছে ক্লাবকে, নিষিদ্ধও হয়েছে তারা! জেনারেল ফ্রাঙ্কোর আমলে কঠিণ দুঃসময় পার করেছে বার্সেলোনা, তাদের পায়ের নীচে পিষে ফেলতে মাদ্রিদের শাসকেরা ছিল তটস্থ। কিন্ত বার্সেলোনাকে দমিয়ে রাখা যায়নি। ছাইচাপা আগুণের মতোই ফুলকি দিয়ে বেড়েছে তার ঔজ্জ্বল্য, ধ্বংসস্তুপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতোই ডানা মেলে সাফল্যের পথে উড়েছে দলটা।

বার্সেলোনা, স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা, বার্সেলোনার জন্ম, লা লীগা, ইউরোপীয়ান চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, হুয়ান গাম্পার, এল ক্লাসিকো

ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য ঘটনাগুলোর একটিও বার্সেলোনার সঙ্গেই ঘটেছিল। সময়টা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের, সাল ১৯৪৩। কোপা ডেল রে’র সেমি-ফাইনালে মুখোমুখি বার্সেলোনা আর রিয়াল মাদ্রিদ। নিজেদের ঘরের মাঠ লেইস কোর্টস স্টেডিয়ামে ৩-০ গোলে লস ব্ল্যাঙ্কোসদের হারিয়েছিল বার্সা, সেটাই মেনে নিতে পারেনি মাদ্রিদের স্বৈরাচারী শাসকেরা। পুঁচকে একটা প্রাদেশিক ক্লাব কিনা হারিয়ে দেবে রাজধানীর দলটাকে, সেটা হজম করতে কষ্ট হচ্ছিল তাদের। দ্বিতীয় লেগের খেলা মাদ্রিদে, ম্যাচ শুরুর আগে বার্সেলোনার ড্রেসিংরুমে এসেছিলেন স্পেনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাপ্রধান, খেলোয়াড় আর কর্তাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, স্পেন সরকারের দয়াতেই এখনও প্রাণ নিয়ে ফুটবল খেলতে পারছেন তারা। এই হুমকির ভয়াবহতা কতটা ছিল, সেটার প্রমাণ মেলে সেদিন বার্সেলোনার ছন্নছাড়া খেলাতেই। ১-১১ গোলে মাদ্রিদের কাছে বিধ্বস্ত হয়েছিল তারা। কোনমতে মাঠ ছেড়ে বার্সেলোনায় ফিরতে পারলেই তখন বাঁচেন তারা!

কত রথী মহারথীর পায়ের ছাপে ধন্য হয়েছে বার্সেলোনার হোমগ্রাউন্ড, কত মহাতারকা গায়ে জড়িয়েছেন মেরুণ-নীল রঙা বার্সেলোনার জার্সিটা। ইয়োহান ক্রুইফ থেকে শুরু করে ম্যারাডোনা-রোমারিও-রোনালদো-রিভালদো কিংবা রোনালদিনহো থেকে শুরু করে জাভি-ইনিয়েস্তা হয়ে এখন লিওনেল মেসি-নেইমার- বিশ্বসেরা ফুটবলারেরা বার্সেলোনার হয়ে মাতিয়ে গেছেন মাঠ, এখনও জাদু দেখাচ্ছেন সময়ের সেরা খেলোয়াড়েরা। রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে এল ক্লাসিকোর ঝাঁঝ ছড়ায় পুরো ফুটবলবিশ্বেই, টিকি-টাকার মন মাতানো ছন্দে দুনিয়াকে মোহিতও করেছে এই ক্লাবটাই।

বার্সেলোনা, স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা, বার্সেলোনার জন্ম, লা লীগা, ইউরোপীয়ান চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, হুয়ান গাম্পার, এল ক্লাসিকো

একশো আঠারো বছর বয়স হয়ে গেল আজ, ১৯২৬ সাল থেকে পেশাদার ক্লাবে পরিণত হওয়া বার্সেলোনার ঝুড়িতে জমেছে চব্বিশটা লীগ শিরোপা, রেকর্ড ২৯টা কোপা ডেল রে ট্রফি আর ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স লীগের পাঁচটা শিরোপা। ক্লাব ওয়ার্ল্ডকাপও সবচেয়ে বেশী তিনবার ঘরে তুলেছে তারাই। সর্বকালের সবচেয়ে সফল ক্লাবগুলোর তালিকায় বার্সেলোনার নামটা তাই ওপরের দিকেই আছে। ঘরের মাঠ ন্যু-ক্যাম্প স্থাপিত হয়েছে ১৯৫৭ সালে, আটানব্বই হাজার দর্শকের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই স্টেডিয়াম সাক্ষী হয়েছে কত রোমাঞ্চকর ধ্রূপদী লড়াইয়ের, কত দুর্দান্ত সব ফুটবলীয় পারফরম্যান্সের!

মাত্র এগারোজন অপেশাদার ফুটবলার নিয়ে আজ থেকে ১১৮ বছর আগে যে ক্লাবটা যাত্রা শুরু করেছিল, কালের বিবর্তনে তারাই এখন বিশ্বের অন্যতম ধনী আর প্রভাবশালী ক্লাবে পরিণত করেছে নিজেদের; ফুটবলীয় সীমানা ছাপিয়ে যাদের কণ্ঠে শোনা যায় অত্যাচার-নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ আর মানবতার জয়গান! শুভ জন্মদিন ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনা, এভাবেই যুগে যুগে রমাঞ্চকর ফুটবলের জন্ম হবে এই ক্লাবের হাত ধরে, এটাই কামনা করবে ভক্তরা।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-