লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন!
হলিউড, বলিউড কি ঢালিউড!

সর্বক্ষেত্রেই শব্দগুলো যেন অনেকটা অলিখিতভাবেই পুরুষবাচক। এই তিনটি শব্দ শুনলে অবচেতন মনে একজন গম্ভীর পুরুষ মাইক হাতে নিয়ে উঁচুস্বরে শব্দগুলো বলছেন, এরকম দৃশ্যই চোখে ভাসে। এ ধারণা সৃষ্টির অন্যতম কারণ দর্শক এখনও এই চিন্তাধারা থেকে বের হতে পারেনি, যে একজন নারীও নির্মাতার আসনে বসতে পারেন। পক্ষান্তরে একজন নারীর পক্ষে সামাজিক বাধা উপেক্ষা করে ঐ অবস্থানে যাওয়াটা এখনও খুব সহজসাধ্য হয়ে উঠেনি। বিশ্লেষকরা এর কারণ হিসেবে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং চিন্তাভাবনার সীমাবদ্ধতাকেই বড় করে দেখেন। এসব সত্ত্বেও শত বাধা পেরিয়ে যে সব নারী এই পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন তাদের মধ্যে থেকে কয়েকজন বাংলাদেশী নির্মাতার বিজয়াখ্যান নিয়েই এই লেখা-

নারগিস আক্তার: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে পুরস্কারপ্রাপ্ত বাংলাদেশী নারী নির্মাতা নারগিস আক্তার। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সফল নারী চলচ্চিত্র নির্মাতা তাকেই বলা হয়ে থাকে। যিনি একাধারে চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক এবং পরিচালক। নারগিস আক্তার গঠনমূলক এবং শিক্ষনীয় গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মানকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। দেশে চলচ্চিত্র নির্মানে নারীদের অনগ্রসরতার কারন হিসেবে তিনি পারিবারিক আপত্তিকেই প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে মনে করেন। চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তার প্রথভ কাজ এইডস বিষয়ে জনসচেতনামূলক “মেঘলা আকাশ (২০০১)” ছবিটির মাধ্যমে। পরবর্তীতে তিনি “চার সতীনের ঘর (২০০৫)”, “মেঘের কোলে রোদ(২০০৮)”, “অবুঝ বউ(২০১০)”, “পুত্র এখন পয়সাওয়ালা (২০১৫)” ও “পৌষ মাসের পিরীত(২০১৬)” নির্মান করেন। তার লেখা “মেঘের কোলে রোদ” ও “অবুঝ বউ”- এর চিত্রনাট্যের জন্য তিনি দুবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তার সরকারী অনুদানে নির্মানাধীন চলচ্চিত্র নাট্যজন সেলিম আল দীন রচিত “যৈবতী কন্যার মন”।

ক্যাথরিন মাসুদ: যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে জন্ম নির্মাতা ক্যাথরিন শেপিয়ারের। শহরের আর্টস ইন্সটিটিউট থেকে পোস্টগ্রাজুয়েশন সমাপ্ত করে নিউইয়র্কে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। আর ঠিক সে সময়েই তার সাথে পরিচয় ঘটে বাংলাদেশে “চলচ্চিত্রের ফেরিওয়ালা” খ্যাত নির্মাতা তারেক মাসুদের সাথে। ১৯৮৮ সালে তারেক মাসুদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একসাথে চলচ্চিত্রে পথচলা শুরু হয় তাদের। আর তখন থেকেই তিনি ক্যাথরিন মাসুদ নামে এদেশের মানুষের কাছে পরিচিত হতে থাকেন। ক্যাথরিন ও তারেক মিলে ঢাকায় একটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন যারনাম “অডিও ভিশন”। তিনি মূলত তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র সম্পাদক হিসেবেই কাজ করতেন। তবে “মাটির ময়না (২০০২)” চলচ্চিত্রে তিনি প্রযোজক ও সহলেখক ছিলেন। আবার তারেক মাসুদের “রানওয়ে (২০১০)” ছবিটিও তার প্রযোজনায় নির্মিত হয়। এই সিনেমার সঙ্গীত পরিচালকও ছিলেন তিনি নিজে। ক্যাথরিন মাসুদ নিজেও একাধিক চলচ্চিত্র নির্মান করে। তার মধ্যে “অন্তরযাত্রা (২০০৫)”, “মুক্তির গান (১৯৯৫)”, “মুক্তির কথা (১৯৯৯)” সিনেমাগুলো সর্বাপেক্ষা আলোচিত।

রুবাইয়াত হোসেন: ছোটবেলায় সত্যজিত ও ঋত্বিক ঘটক দেখে চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ জন্মেছিল। অতঃপর তার সেই আগ্রহ পূর্ণতা পায় নিউইয়র্ক ফিল্ম একাডেমিতে চলচ্চিত্রে অধ্যায়নের সুবাদে। চলচ্চিত্রে আসার আগে অবশ্য তিনি স্নাতক করেছিলেন আমেরিকার স্মিথ কলেজে ওইমেন স্টাডিস বিষয়ে। সেই সুবাদে ব্যক্তিমনে তিনি ধারন করেন নারী অধিকার, নারীবাদ এবং নারীর প্রতি যৌন হয়রানীর বিরুদ্বে তার প্রতিবাদী কন্ঠস্বর। বলছিলাম “আন্ডার কন্সট্রাকশন (২০১৬)”- এর নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেনের কথা। যদিও তার প্রথম সিনেমা “মেহেরজান” এক বির্তকে মুক্তির চারদিনেই প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যায়। তবে দুঃসময় কাটিয়ে কিছুটা বিরতি দিয়ে আবারো তিনি শুরু করেন চলচ্চিত্র নির্মান। ঢাকা শহরের গল্পের আড়ালে একজন নারীর চোঁখে নারীর ব্যাক্তিস্বত্তাকেই খুঁজে ফিরেছেন তিনি তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র আন্ডার কন্সট্রাকশনে। নারীবাদী নির্মাতা রুবাইয়াতের এ ছবিটি গতবছরের রেইনবো ফিল্ম সোসাইটি আয়োজিত “ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্‍সব- ২০১৫”- এর উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে প্রদর্শিত হয়। নারীবাদ নিয়ে নির্মিত ভিন্নধর্মী এ মুভিকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে “পালাবি কোথায়”- এর পর সবচেয়ে সাহসী চলচ্চিত্র হিসেবেই বিবেচনা করা যেতে পারে। দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে তার এ ফিল্মটি প্যারিসে ভেসল সাউথ এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভালেও পুরস্কার পায়। তবে সমালোচকদের একটি অংশ ছবিটিকে শুধুমাত্র নির্মাতার নিছক স্বেচ্ছাচারিতা বলেও মনে করেন।

শাহনেওয়াজ কাকলী: তিনি একজন বাংলাদেশী চলচ্চিত্র, মঞ্চ নাটক, এবং টেলিফিল্ম নির্মাতা। এবং একজন চিত্রশিল্পী। তার শিক্ষা জীবন কাটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। মূলত সেসময় থেকেই তার চলচ্চিত্রের প্রতি অনুরাগ। পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্র অভিষেক “উত্তরের সুর (২০১২)” সিনেমার মাধ্যমে। যেটি ঐবছর চলচ্চিত্রে দেশের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ মোট চারটি পুরস্কার অর্জন করে। ভারতের গোয়া, কলকাতা এবং মুম্বাইতে কয়েকটি উত্‍সবে ছবিটি বিশেষভাবে সমাদৃত হয়। বড় পর্দায় চলচ্চিত্র পরিচালনায় শাহনেওয়াজ কাকালীর আদর্শ পরিচালক ঋত্বিক কুমার ঘটক। ফলে অবচেতন ভাবেই ছবিটিতে গুরুর প্রভাব বিদ্যমান বলেই তার ধারনা। “উত্তরের সুর” ছবিটি গত বছর ম্যুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটির “নতুন চলচ্চিত্র, নতুন নির্মাতা” উত্‍সবে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগেও এটি প্রদর্শিত হয়। শাহনেওয়াজ কাকলী এখন পর্যন্ত মোট তিনটি চলচ্চিত্র নির্মান করেছেন। তার প্রথম দুটি চলচ্চিত্র “উত্তরের সুর(২০১২)” ও “নদীজন(২০১৫)” মুক্তি পেলেও “জলরং” এখনো মুক্তি পায়নি।

সামিয়া জামান: সংবাদ উপস্থাপিকা , প্রতিবেদক এবং টকশো উপস্থাপনায় পরিচিত মুখ সামিয়া জামান। তার আরেকটি পরিচয় তিনি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা। তার চলচ্চিত্রর হাতেখড়ি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনার সময় থেকে। চলচ্চিত্র নির্মানে প্রথম কাজ ১৯৮৭ সালে স্বনামধন্য নির্মাতা মোরশেদুল ইসলামের “সূচনা” চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করা থেকে। পরিচালক হিসেবে তার নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র “রাণী কুটির বাকি ইতিহাস (২০০৬)”। সাইকোলজিকাল থ্রিলার ধাঁচের এ চলচ্চিত্র, দর্শক ও বোদ্ধামহলে বেশ প্রশংসিত হয়। তার নির্মিত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র “আকাশ কত দূরে” বড় পর্দায়মুক্তি পায় ২০১৪ সালে। ২০১৫ সালে জেনেভা আন্তর্জাতিক ওরিয়েন্টাল ফিল্মফেস্টিভালে তিনি সম্মানিত জুরির দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি একাত্তর টিভিতে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন।

মেহের আফরোজ শাওন: বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মেহের আফরোজ শাওন আমাদের কাছে অভিনেত্রী ও গায়িকা হিসেবে দর্শকপ্রিয় অনেক আগে থেকেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তার অভিষেক হয়েছে চলচ্চিত্র পরিচালনায়ও। দেশবরেণ্য কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের কাহিনী অবলম্বনে গতবছর মুক্তি পায় তার পরিচালিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র “কৃষ্ণপক্ষ”। ছবিটির সাফল্য প্রাপ্তির খাতায় মেহের আফরোজ শাওনের জীবনের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা ঘটায়। হুমায়ূন আহমেদের আরেক উপন্যাস “নক্ষত্রের রাত” নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মান করবেন বলেও তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন নির্মাণের জায়গা থেকে নারীদের অনেক ধরণের সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। প্রগতিশীল রূপে সমাজে অনেক মানুষ আছেন, যারা আদিকালের সেই ধ্যান-ধারণা নিয়ে বাস করেন। এখনো নারীদের সব থেকে যে বৈষম্যের শিকার হতে হয়, সেটি তার পোশাক। পোশাক দিয়ে কেন একজন নারীকে বিবেচনা করা হবে, সেটি এখনো নির্মাতা হিসেবে তার বোধগম্য না। কেননা নির্মান হয় মেধা দিয়ে, পোশাক দিয়ে তো আর নয়!

রুপালি পর্দায় অভিনয় জগতে দর্শকদের মন জয় করার পর অনেক নায়িকাই পরিচালক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এদের মধ্যে সর্বপ্রথম রোজিনা “আশা নিরাশা(১৯৮৬)” নামে একটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন, এরপর ১৯৮৮ সালে সুজাতা নির্মান করেন “অর্পন”। সুচন্দা নির্মান করেন “সবুজ কোট, কালো চশমা(১৯৯৯)” ও “হাজার বছর ধরে(২০০৫)” নামে দুটি চলচ্চিত্র। এর মধ্যে হাজার বছর ধরে নির্মান করে সুচন্দা বেশ প্রশংসিত হবার পাশাপাশি একাধিক জাতীয় পুরস্কার ও পেয়েছেন। মিষ্টি মেয়ে খ্যাত কবরী ২০০৬ সালে নির্মান করেন “আয়না”। মৌসুমী নির্মান করেন “কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি (২০০৩)” ও গুলজারের সাথে যৌথভাবে “মেহের নেগার(২০০৫)” নামে দুটি চলচ্চিত্র।

Comments
Spread the love