সিনেমা হলের গলি

আমরা কি নোবেলকে প্রাপ্য সম্মান দিতে পারিনি?

মাইনুল আহসান নোবেলের আরো একটি পারফরমেন্স দেখা হয়ে গেল। সারেগামাপার মঞ্চে এবার তিনি গেয়েছেন জেমসের “ভিগি ভিগি” গানটি। ২০০৫ সালে “গ্যাংস্টার” সিনেমায় এই গান গেয়ে বলিউডে অভিষেক হয়েছিল জেমসের। সেসময় এই গান তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। মানুষের মুখে মুখে ঘুরতে থাকে এই গানটি। 

আর এবার কলকাতা মাতাচ্ছেন এই প্রজন্মের তরুণ শিল্পী মাইনুল আহসান নোবেল। জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো সারেগামাপার প্রতিযোগী হিসেবে তিনি মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন তার দরাজ গলার গান দিয়ে। গীতিকার প্রিন্স মাহমুদের লেখা জেমসের গাওয়া “বাবা” গান যখন গাইলেন সারেগামাপার মঞ্চে, সবাই এতটা বিস্মিত হয়েছিল যে, নোবেল স্ট্যান্ডিং অভিয়েশন পেয়েছিলেন বিচারকদের কাছ থেকে। এরপর এবার মাতালেন “ভিগি ভিগি” গান গেয়ে। গলা ফাটিয়ে গেয়েছেন এবারও।

মাইনুল আহসান নোবেল এখন নতুন ক্রেজ, টক অব দ্যা টাউন। বাংলাদেশের মানুষ এমনিতে ভীষণ আবেগী। তারা মাইনুল আহসান নোবেলকে নিয়ে গর্বিত। নোবেলের সাম্প্রতিক পারফর্মেন্স শেয়ার দিয়ে সবাই অভিনন্দন জানাচ্ছেন। কিন্তু, এর সাথে শুরু হয়েছে অন্য সমস্যা। অনেকে নোবেলের ব্যাপারে মন্তব্য করছেন যে, নোবেল বাংলাদেশে প্রাপ্য সম্মান পাননি৷ তার ট্যালেন্টকে এদেশে মূল্যায়ন করা হয়নি। কথাগুলো তারা বলছেন, নেক্সটিউবার নামক একটি রিয়েলিটি শো থেকে নোবেল বাদ পড়ার কারণে। ইউটিউব কন্টেন্ট মেকার খোঁজার সেই অনুষ্ঠানে বিচারক হিসেবে ছিলেন সালমান মুক্তাদির, সৌভিক, তামিম মৃধা, আসিফ বিন আজাদরা। মানুষ তাদের অভিযুক্ত করে বলছেন, এরা নোবেলের ট্যালেন্টকে মূল্যায়ন করতে পারেনি, এরা আবার কিসের বিচারক!

আমরা এগিয়ে-চলোর পক্ষ থেকে নোবেলের সাথে কথা বলেছিলাম। তিনি তার মিউজিক্যাল জার্নি সম্পর্কে ধারণা দিয়েছিলেন এগিয়ে চলোকে৷ তার সাথে কথা বলে মনে হয়েছে, তিনি বেশ বিনয়ী। তার কারো প্রতি অভিযোগ নেই। বরং, তিনি গানটাতেই মনোযোগ রাখতে চান। তিনি এমনিতেও বেশ আপ্লুত তার প্রাপ্তিতে।

ফেসবুকে নোবেলের কমেন্টবক্সে অনেকে নেক্সটিউবারের কথা বলেন। তারা নোবেলের ট্যালেন্টকে প্রাপ্য মর্যাদা দেয়নি এসব আক্ষেপ যখন লিখেন, নোবেল একটা কমেন্টের রিপ্লাই দিয়েছিলেন, তিনি নেক্সটিউবার প্ল্যাটফর্মের প্রতি কৃতজ্ঞ।

প্রথমত, নোবেল নেক্সটিউবার প্ল্যাটফর্মে আরো ভাল পজিশন ডিজার্ব করেন এটা নিয়ে অমত নেই। কিন্তু, আমাদের দেখতে হবে, নেক্সটিউবার হলো ইউটিউব কন্টেন্ট মেকারদের জন্য প্ল্যাটফর্ম। এই প্রোগ্রামটা এই ঘরানার প্রথম কোনো আয়োজন বাংলাদেশে। তবে এখানে প্রতিযোগীদের যেসব টাস্ক দেয়া হয়েছে সেগুলো বেশ অদ্ভুত। কয়েকটা প্রোগ্রামের যেন পাঁচমিশালি একটা প্রয়াস ছিল সেটি। ইউটিউবার হওয়ার জন্য তীর ছুঁড়তে হবে, দৌড়াদৌড়ি করতে হবে, গাছে ঝুলতে হবে, বিচিত্র এক্রোব্যাট করতে হবে কেনো বুঝে আসেনি। হয়ত এটাই তাদের ইউটিউবার খুঁজে বের করার স্টাইল।

নোবেল যে এপিসোডে বাদ পড়েছিলেন, সেখানে তিনি যে কন্টেন্টের জমা দিয়েছিলেন সেটি এমনিতেও আপ টু দ্যা মার্ক হয়নি৷ অনুষ্ঠানের নিয়মে তার বাদ পড়াটা অযৌক্তিক না। সেই এপিসোডে অদিত ছিলেন। তিনি নোবেলকে বলেছিলেন, নোবেল যেহেতু গান ভাল গায়, সে চাইলে একটা প্যারোডি গান করে কন্টেন্ট করতে পারত। নোবেলও বুঝতে পেরেছিলেন তার ল্যাকিংসের জায়গাটা। যদিও মোটা দাগে ধরতে গেলে সেই প্রোগ্রামের ডিজাইন আসলে ততটা মানসম্পন্ন ছিল না।

কিন্তু, নোবেল মূল্যায়ন না পেয়ে বাদ পড়েছেন এই অভিযোগও পুরোপুরি সত্য না। কারণ, সবাই নোবেলের গানের ব্যাপারে অকুন্ঠ প্রশংসা করেছে। নোবেল সেই এপিসোডে স্ট্যান্ডিং অভিয়েশনও পেয়েছিলেন বিচারকদের কাছ থেকে। তবে, বাজে ব্যাপার হলো, নোবেল আগে কিছু টাস্ক উতরে এসে এই এপিসোড পর্যন্ত বাদ পড়লেও সেই একই এপিসোডে তথাকথিত ‘ওয়াইল্ড কার্ড’ বা এই জাতীয় কোনো ক্ষমতাবলে নতুন দুইজনকে এন্ট্রি করানো হয় শো’র শেষের দিকে এসে। তারা এসে যোগ দেন আগের টাস্ক পার হয়ে যাওয়া প্রতিযোগীদের সাথে। এটা কি সমতা, ন্যায্যতার হিসেবে যৌক্তিক হয়েছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে যৌক্তিকভাবেই। 

তবে নোবেলের গান নিয়ে কখনোই কারো দ্বিধা ছিল না। নোবেল যেহেতু গানের শিল্পী তাই তাকে গান দিয়েই মূল্যায়ন করা উচিত। সেই জায়গাটায় তিনি বাংলাদেশে কম ইজ্জত পেয়েছেন, মূল্যায়ন পেয়েছেন বলে মনে হয় না। কিছুদিন আগে বামবার তত্ত্বাবধানে একটা অনুষ্ঠানে গান গেয়েছেন নোবেল। যেখানে আরও ছিল শিরোনামহীন, ওয়ারফেজ, আর্টসেল, মাইলস সহ বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বড় বড় ব্যান্ড। একই মঞ্চে এতো বড় বড় ব্যান্ডদের সাথে পারফর্ম করার সুযোগ প্রমাণ করে বাংলাদেশেও তার মূল্যায়ন হচ্ছে, সামনে আরো হবে।

যেই সালমান মুক্তাদির সার্কেল নিয়ে অভিযোগ, সেই সালমানও নোবেলের প্রশংসা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। সালমান প্রশংসা করলেই যে নোবেল ভাল শিল্পী হিসেবে প্রমাণিত হবেন তা তো নয়। আর রিয়েলিটি শো দিয়ে কোনো শিল্পীকে বিচার করাও কি উচিত? আমরা দেখেছি, ক্লোজ আপের রিয়েলিটি শো, চ্যানেল আইয়ের রিয়েলিটি শো, বাংলাদেশ আইডল ইত্যাদি থেকে বের হওয়া শিল্পীদের এখন কয়জনের হদিস আছে? আমরাই কিছু লোককে নিয়ে মাতামাতি করি, তারপর ভুলে যাই৷ তারাও একটু খ্যাতি পেয়ে হারিয়ে যান। আর মূল্যায়ন কাকে বলে? লাকী আখন্দের মতো শিল্পীকে এদেশে মরতে হয় অর্থের অভাবে। তাকে মূল্যায়নের সুযোগ কি আমরা কম পেয়েছিলাম?

তাই অযথাই একটা বিতর্ক উসকে না দিয়ে একটা শিল্পীকে বাড়ার সুযোগ করে দিন। নোবেল লম্বা রেসের ঘোড়া। কে তাকে মূল্যায়ন করেছে কি করেনি, সেসব টেনে না এনে তাকে সাপোর্ট করুন। খামাখা এমন কিছু বলে আলোচনার তৈরি করবেন না, যা তাকে মানসিক চাপে ফেলে৷ 

আমাদের মূল্যায়নের জন্য কেউ বসে নেই। আমরা আজ একজনকে উপরে উঠাই, কাল তাকেই চূড়ান্ত অপমান করে তলায় নামাই। এই ভালবাসার দরকার নেই৷ মাইনুল আহসান নোবেল এখনো অনেক তরুণ। তার ক্যারিয়ার বড় হোক, নিজের কম্পোজ করা মৌলিক গান তিনি করুন, সেই গানের অপেক্ষায় থাকি। সেই গানকে ভালবাসতে যদি পারি, যদি এখন যেভাবে সম্মান দেখাচ্ছি সেটা তখনো দেখাতে পারি, খারাপ সময়েও পাশে থাকতে পারি সেটাই হবে সত্যিকারের মূল্যায়ন! অতটুকু অপেক্ষা কার সইবে?

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles