ইনসাইড বাংলাদেশ

স্বপ্নের দেশে দুঃসহ-অভিশপ্ত-দুঃস্বপ্নের যাত্রা!

গহীন জঙ্গলের ভেতরে লুকিয়ে আসছে ওরা। দলে প্রায় জনা ত্রিশেক তরুণ, নানা দেশের। এদের মধ্যে বাংলাদেশী আছে ছয়-সাতজন। অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর আরেকটা প্রান্তে এসেছে ওরা, কতটা ঘাত প্রতিঘাত সইতে হয়েছে সেটা ওরা ছাড়া আর কেউ জানেনা। জায়গাটা উত্তর আর দক্ষিণ আমেরিকার সংযোগস্থলে, পানামায়। সামনের পথটা সবচেয়ে বিপদসঙ্কুল, পাড়ি দিতে হবে উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে ভয়াল জঙ্গল ‘ড্যারিয়ান গ্যাপ’। নদীতে কুমির আর অজগর, ডাঙায় বিষাক্ত সাপ আর মাদক পাচারকারীদের ভয়। পাড়ি দিতে হবে কয়েকটা দেশের সীমান্ত, সেগুলোতে ধরা পড়লেও বাকী জীবন পচে মরতে হবে জেলে!

অনেকগুলো দেশ থেকে এসেছে ওরা ত্রিশজন। বাংলাদেশী-ভারতীয় যেমন আছে, আছে আফ্রিকান বা সিরিয়ান শরণার্থীরাও। একটাই লক্ষ্য ছিল ওদের, কোনভাবে আমেরিকায় গিয়ে পৌঁছুবে তারা। স্বপ্নের দেশ আমেরিকা, সেখানে যেতে পারলেই ভবিষ্যত নিশ্চিত। জাদুর দশটায় নাকি ডলার ওড়ে, কাজকর্ম করে সেই ডলারটা হাতিয়ে নেয়া শুধু। কিন্ত স্বপ্নের দেশে যাওয়ার পথটা যে এমন দুঃস্বপ্নে ঢাকা হতে পারে, এরকম কোন ভাবনাই ছিল না ওদের মাথায়।

ওরা দেশ ছেড়েছে প্রায় একমাস আগে, মালয়েশিয়া হয়ে তাদের আনা হয়েছিল আফ্রিকান উপকূলে, তারপর ট্রলারে করে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে। সেখান থেকে বলিভিয়া-কলম্বিয়া-ইকুয়েডর হয়ে তারা পাড়ি দিয়েছে দক্ষিণ আমেরিকা, প্রবেশ করেছে উত্তর আমেরিকায়। শ্বাপদসংকূল একটা ভয়াল পথ ওরা পাড়ি দিয়েছে খোলা নৌকায়, পায়ে হেঁটে, কিংবা সাঁতার কেটে। শরীরে শক্তি নেই, পেটে নেই খাবার। এই আধমরা দেহটাকে কোনমতে টেনে নিয়ে চলছে ওরা, কিংবা চলতে বাধ্য হচ্ছে।

ড্যারিয়ান গ্যাপ, পানামা, অবৈধ অভিবাসী, আমেরিকা

বাংলাদেশ থেকে যারা এই অবৈধ পথে আমেরিকা যাওয়ার চেষ্টায় নেমেছেন, ওদের একজন জুয়েল। অস্ট্রেলিয়ার সংবাদ সংস্থা এসবিএসের ক্যামেরার সামনে করুণ গলায় তিনি বলছিলেন গত একমাসের কথাগুলো। চারদিন ধরে কিচ্ছু খায়নি দলের কেউ, পানিও নেই কারো সাথে, ঝিরি বা নদীর পানি গলায় ঢেলে কোনমতে তৃষ্ণা মেটানোর চেষ্টা করেছে সবাই। সেই পানিটাও আবার গেলা যায় না, কেমন যেন ঘোলাটে, গিলে আবার ফেলে দিতে হয়। পায়ে চলার মতো রাস্তাও নেই অনেক জায়গায়, উঁচুনিচু পথ ধরে হেঁটে যেতে হয়। পিছলে পড়ে হাত-পা কেটে গেছে অনেকের। এখনও অর্ধেকের বেশী পথ বাকী, আশায় বসতি গড়া চোখগুলোতে এখন রাজ্যের হতাশা। স্বপ্নের জাল বুনে দেশ ছেড়েছিলেন সবাই, সেই স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছে কত আগেই। জীবনের কঠিন বাস্তবতার অন্যরকম একটা রূপ দেখতে দেখতে ক্লান্ত সবাই।

দেশে তেমন কিছু করতে পারছিলেন না, স্বচ্ছলতার আশায় দালালের প্রলোভনে পড়ে ছুট লাগালেন আমেরিকার পানে। কিন্ত বিমানের বদলে জায়গা হলো সামুদ্রিক ট্রলারে, ভারত-আটলান্টিক মহাসাগরের বিশাল ঢেউ, ঝোড়ো হাওয়া আর পথের হাজারটা বিপদ-আপদ পেরিয়ে মাটির দেখা পেয়েছিলেন তারা ব্রাজিলে এসে।

সবকিছু বুঝতে পারলেও, দালালদের পাতা ফাঁদে তখন তারা বন্দী। ওরা যেভাবে বলে, সেভাবেই করতে হয় সবকিছু। মেনে নিতে হয় ওদের অন্যায় আবদারগুলোও। নইলে কপালে জোটে মারধর আর নির্যাতন। ড্যারিয়ান গ্যাপে এনে আটকে রাখা হয় এই মানুষগুলোকে, ছিনিয়ে নেয়া হয় টাকাপয়সা। ভয় দেখায় মেরে ফেলার, এখানে খুন করে লাশ ফেলে গেলে কাকপক্ষীতেও খুঁজে পাবে না কোনদিন।

জুয়েলের গল্পটা একটু অন্যরকম। দেশে থাকতে সক্রিয় রাজনীতি করতেন, কিন্ত প্রাণের ঝুঁকি থাকায় পরিবার থেকেই তাকে বিদেশে চলে যাবার কথা বলা হয়েছিল। দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমেরিকায় যাওয়ার বন্দোবস্ত করেছিলেন তিনি। সেই জুয়েল এখন পানামার গহীন জঙ্গলে দিন কাটাচ্ছেন, জানেন না আদৌ কোনদিন আমেরিকায় পা রাখতে পারবেন কিনা। জুয়েল জানেন না তার দেশে বাবা-মা বেঁচে আছে কিনা, বাবা-মা’ও জানেন না তাদের সন্তান কোথায় আছে, কিভাবে আছে!

ড্যারিয়ান গ্যাপ, পানামা, অবৈধ অভিবাসী, আমেরিকা

দালাল ছাড়াও আছে এখানকার বিচ্ছিন্নতাবাদী গেরিলা সংগঠনগুলোর উৎপাত। আছে মাদক পাচারকারীরা, ওদের চোখে পড়ে গেলে টাকাপয়সা রেখে দিয়ে খুন করে ফেলতে দ্বিধা করে না। কখনও আবার ওদের বোঝাগুলো বহন করানো হয় এই মানুষগুলোকে দিয়ে। সীমান্তে আছে নিরাপত্তারক্ষীরা, ওদের হাতে ধরা পড়লে জেল নিশ্চিত, আর পালাতে চাইলে পিঠে এসে বিঁধবে গুলি। পায়ের নীচে সাপখোপ পড়ছে কিনা, এই ভয়ে তটস্থ থাকতে হয় সারাটাক্ষণ। আমেরিকা যাওয়ার বদলে সাক্ষাৎ একটা নরকে এসে পড়েছে যেন ওরা, সর্বক্ষণ এমনটাই মনে হয় ওদের।

পানামার একটা বেসরকারী এনজিও জানিয়েছে, প্রতিবছর অবৈধভাবে আমেরিকায় আসার জন্যে যতো অভিবাসী ড্যারিয়ান গ্যাপ পাড়ি দেয়, তাদের মধ্যে বাংলাদেশীদের সংখ্যা তৃতীয় সর্বোচ্চ। ড্যারিয়ান গ্যাপের আশেপাশে অস্থায়ী বোর্ডিং বা কতেজগুলোর দেয়ালে খুঁজলেই বাংলায় অনেক লেখা পাবেন যে কেউ। সেখানে বাংলায় নিজের নাম বা অন্যকিছু লিখে রেখেছেন এখানে রাত কাটিয়ে যাওয়া বাংলাদেশী অভিবাসীরা। অনিশ্চয়তায় ভরা যাত্রাপথে নিজের নামটা কোথাও রেখে যেতে পারাটাতেই হয়তো আনন্দ খুঁজে নিয়েছেন তারা।

প্রতিবছর ড্যারিয়ান গ্যাপের এই মৃত্যসংকূল পথ পাড়ি দিয়ে আমেরিকার দিকে ছোটেন বিভিন্ন দেশের অন্তত পঁচিশ হাজার অভিবাসী। খানিকটা উন্নত জীবনযাত্রার আশায় জীবনের এই ঝুঁকিটা নেন তারা, কেউবা না বুঝেই দালালের কথার প্রলোভনে পড়ে ভিটেবাড়ি সবকিছু বিক্রি করে দেশ ছাড়েন। তাদের কারো গন্তব্য হয় জেলখানা, কেউবা তারও আগে নিখোঁজ হয়ে যান জীবনের মঞ্চ থেকে, তাদের নিস্প্রাণ শরীরটা পেছনে ফেলে এগিয়ে যান বাকীরা, স্বপ্নটাকে ছুঁতে। সেই স্বপ্ন ছোঁয়ার পথটা যে দুঃস্বপ্নেরই নামান্তর!

তথ্যসূত্র কৃতজ্ঞতা- এসবিএস নিউজ, অস্ট্রেলিয়া।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close