রাজীব হাসান

একদিকে চাকরির তীব্র সংকট, অন্য দিকে এই বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স বের হয়ে যায়। অর্থাৎ বাংলাদেশে কাজ করছেন এমন বিদেশিরা প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩২ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছেন। আজই প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছে, কেবল বৈধ হিসাবে ১৬ হাজার কোটি টাকা রেমিট্যান্স বের হয়ে যায় বাংলাদেশ থেকে। অবৈধ হিসাবে সংখ্যাটা দ্বিগুণেরও বেশি।

***

বাংলাদেশে কাজ করেন এমন অনেক বিদেশি, বিশেষ করে ভারতীয়দের ওয়ার্ক পারমিট নেই। এই ভারতীয়রাই বছরে ৩২ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যায় বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। এটার সঠিক হিসাব যদিও নেই। পাশাপাশি চীন, ইন্দোনেশিয়ার কর্মীরা রেমিট্যান্স নিয়ে যাচ্ছেন। পোশাক খাতে শ্রীলঙ্কার অনেক কর্মী মিড লেভেলে লোভনীয় বেতনে কাজ করেন। এমনকি পাকিস্তানিদের সংখ্যাটাও কম নয়।

ধরা যাক, ৩২ হাজার ৩৩২ কোটি টাকাই রেমিট্যান্স হিসেবে বের হয়ে যায়। প্রতি মাসে ২ হাজার ৬১১ কোটি টাকা। প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকার লোভনীয় বেতন দিলেও এই টাকায় আমরা বাংলাদেশের ৫ লাখ ২২ হাজার তরুণকে চাকরি দিতে পারতাম। তাতে ৫ লাখ ২২ হাজার পরিবারের মুখে হাসি ফুটত। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের অর্ধেক এখনো বেকার।

বৈধ ও অবৈধভাবে বাংলাদেশে আনুমানিক দেড় লাখ বিদেশি কাজ করেন। এই দেড় লাখের বেতনে কমপক্ষে ৫ লাখের কর্মসংস্থান বাংলাদেশে কি সম্ভব নয়? আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো একটা বড় সংখ্যক কর্মী নিচ্ছে ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে।

কেন? সমস্যাটা কোথায়? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি যথেষ্ট দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারছে না? আমাদের পড়াশোনা কি সিংহভাগ শিক্ষার্থীর কর্মজীবনে কোনো কাজে আসে না? আমরা পড়ি এক, আর আমাদের কর্মজীবনে দক্ষতা লাগে আরেক? ভাবা দরকার!

***

আমি ছোটবেলা থেকে খুব রেডিও শুনতাম। বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, ডয়েচে ভেলে। ইরান, এমনকি চীনের রেডিওতেও বাংলা অনুষ্ঠান হতো। মনে আছে, চীনের রেডিও থেকে অদ্ভুত বাংলা শোনা যেত। অন্য সব রেডিও বাংলা ভাষাভাষীদের নিয়োগ দিলেও চীন তা করেনি। চীন তাদের কর্মীদেরই বাংলা শিখিয়েছিল। চীনা উচ্চারণের টানে বাংলা বলতেন তারা—আয়াপনায়ারা শুউউনছেএএন চায়না রেদিও ইন্দারান্যাশনাল…

বাংলাদেশ থেকে ৫-৬ জন কর্মীকে নিয়োগ না দেওয়ার বদলে চীন কেন তাদেরই ৫-৬ জনকে বাংলা শিখিয়েছিল? শুদ্ধ বাংলা না পারলেও কেন সেটাই মেনে নিয়েছিল? কারণ চীন তখন উন্নয়নের সেই ধাপে ছিল, যেখানে তাদের লোকবলের অভাব নেই, কিন্তু বিদেশিদের পেছনে খরচ করার মতো টাকার অভাব আছে। সেটা মাত্র ৫-৬ জন বিদেশিই হোক না কেন।

আমাদের প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী নেই এটা যদি সত্য হয়, এও সত্যি, সমান দক্ষতার একজন বিদেশি কর্মীর ব্যাপারে আমাদের মালিকেরা যতটা খুশি, নিজ দেশের কর্মীর ওপর ততটাই আস্থাহীনও। অথচ আমরা এখন চীনের সেই অবস্থায় আছি, যেখানে ৬ জনের কর্মসুযোগ তৈরি হলেও সেটা যেন নিজ দেশের ভেতরেই হয় তার ব্যবস্থা করা।

***

আমরা প্রচুর রেমিট্যান্স আয় করি। কিন্তু চৌবাচ্চার সেই অঙ্কের মতো আরেক দিক দিয়ে গলগল করে কিন্তু পানি বেরিয়েও যাচ্ছে। হয়তো সব ফুটো আমরা বন্ধ করতে পারব না। কিন্তু অনেকগুলোই পারব।

না হলে কী হবে? একটা পুরোনো জোক বলি শোনেন।

প্লেনে তিনজন পাশাপাশি সিটে যাচ্ছে। আমেরিকানটা ভাব দেখানোর জন্য হাত থেকে বহু দামের আইফোনটা ফেলে দিল জানালা দিয়ে। পাশের দুজন হায় হায় করে উঠতেই আমেরিকানটা বলল, এ আমাদের দেশে অনেক আছে। জাপানিটা ভাবল, সে কী করে! সে জানালা দিয়ে ফেলে দিল ডায়মন্ডের ঘড়িটা। পাশের দুজন হায় হায় করে উঠতেই জাপানিটা বলল, এ আমাদের দেশে অনেক আছে। এবার বাংলাদেশির পালা। সে কী করল। জানালা দিয়ে আমেরিকান আর জাপানি এই দুজনকে দিল ফেলে। পুরো প্লেনের যাত্রী অবাক। দুটো মানুষকে ফেলে দিতে পারলে ভাই! মানুষ তো!

বাংলাদেশি হাই তোলার ভঙ্গীতে বলল, এ আমাদের দেশে অনেক আছে!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-