সিনেমা হলের গলি

আমাদের জন্য আর কেউ রইলো না…

শাফিন আহমেদ ইউটিউবের পর্দায় ধীরে ধীরে বলছিলেন, এখন থেকে মাইলস ব্যান্ডটি আর শুধু মাইলস নেই। এটি এখন থেকে মাইলস লিমিটেড। ইউটিউবের পর্দা থেকে চোখ সরছিলো না। তার ক’দিন পর হামিন আহমেদ, মানাম আহমেদ, তূর্য, জুয়েল এরা সবাই মিলে শাফিনকে মাইলস থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছে বলে শোনা গেলো। তারপর আবার জানা গেলো শাফিন আহমেদ আইনী নোটিশ পাঠিয়েছেন হামিন বরাবর। শাফিন আর হামিন দুই ভাই। কমল দাশ গুপ্ত আর ফিরোজা বেগমের দুই সন্তান।

এসব আইন, আইনী নোটিশ, নতুন দল, মাইলস লিমিটেড, মন কষাকষি, দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, আমার হৃদয়ে এসবের কিছুই রোচে নি। আমি ঝাপসা চোখ এই সুদূর লন্ডন থেকে ইউটিউবের পর্দায় এসব সংবাদে বার বার ফিরে যাচ্ছিলো ফ্ল্যাশ ব্যাকে। বহু বছর আগের আমাদের সময়ে। যে সময়ে আমরা সত্যকার অর্থেই বেঁচে ছিলাম।

আর্মি স্টেডিয়ামে, সুলতানা কামাল ক্রীড়া কমপ্লেক্সে, রাওয়া ক্লাব, আবাহনী মাঠ, ওসমানী মিলনায়তন সহ বহু যায়গায় কনসার্ট হলে আমরা ছুটে যেতাম বন্ধু-বান্ধব সহ। টিকেট সংগ্রহ, অনেক কষ্টে মায়ের কাছ থেকে টিকেটের টাকা নেয়া, পথ ভাড়া নেয়া, ক্ষুদা পেলে কি খাব সেটি ভেবে মা আরো পকেটে টাকা গুঁজে দিতেন। যেতাম দল বেঁধে। নাচতাম হাতে হাত রেখে, গোল করে, বন্ধুরা কেউ খেতো গাঁজা, কেউ খেতো সিগারেট। এক ধুন্দুমার জীবন ছিলো।

মাইলস আগে কনসার্টে আসতো না। খুব এলিট টাইপ ব্যান্ড ছিলো তাঁরা। তারপর হঠাৎ করে আসা শুরু করলো। আমরা বাঁধ ভেঙ্গে কনসার্টের মাঠে হাজির হতাম। মাইলস গাইতো…চাঁদ তাঁরা সূর্য নও তুমি…নও পাহাড়ী ঝর্ণা, নীলা তুমি কি বোঝো না, এক ঝড় এসে ভেঙ্গে দিয়ে গেলো…

আমার মনে আছে মাইলস যখন গাইতো “ভুল করেও যদি মনে পড়ে…ভুলে যাওয়া কোনো স্মৃতি, কোনো ঘুম হারা রাতে…” আমি এত হাজার হাজার লোকের মধ্যেও নির্জন কোনে গিয়ে চোখ মুছতাম। এই গানের উপর সকল বিশ্বাস রেখে মনে হতো…হয়ত একদিন “তাঁর” মনে পড়বে আমার কথা…একটা অব্যাক্ত হাহাকার আর কাউকে না বলতে পারা যন্ত্রণার কথা মাইলস আমাদের বুকের গহীনে ঢুকে বলতো…

আমাদের কৈশোর, তারুন্যের উদ্দাম চঞ্চলতা দিয়ে আমরা শাফিন-হামিনদের আমাদের হৃদয়ে স্থান দিয়েছিলাম। আমাদের অসংখ্য স্মৃতি মাইলসের কাছে, মাইলসের অসংখ্য অর্জন আমাদের কাছে। আমাদের শৈশবের প্রেম, আমাদের কৈশোরের প্রেম সব কিছু নিয়ে দুই ভাই আলাদা হয়ে গেলো। এক ভাই বানায় মাইলস লিমিটেড আরেক ভাই হয়ত বানাবে পাইলস লিমিটেড। কে জানে…

কিন্তু এরা বুঝলোও না সে কবেকার কত প্রাচীন তরুনেরা ভয়ানক দুঃখ পেলো। বিষাদে আক্রান্ত হোলো। তাঁরা জানলোও না না কত শত স্মৃতি নিয়ে আমরা এতটা কাল যে হাতড়ে বেড়িয়েছি তার সব কিছু এরা এক ঝড়ের মত ভেঙ্গে দিলো। চোখ বন্ধ করলেই দেখি স্মৃতির দরজায় এসে দাঁড়ায় এক উটকো ও অবাঞ্চিত “মাইলস লিমিটেড”। হায়…

আমাদের অতীত তারুণ্যের একটা পর্যায়ে মঞ্চে এলো আর্টসেল। নতুন ক্রেজ লিংকন। আমি ওয়ারফেইজ আমলের মানুষ। সঞ্জয় তো সেই ছেড়ে গেছে কবেই। নেই বাবনা, নেই রাসেল। মেনে নিয়েছিলাম এতটা বছর ধরে। সব শেষ মিজান ছিলো। সেও চলে গেলো…

এমন এক ওয়ারফেজিয়ান উদ্দামের পরেও বরণ করেছিলাম আর্টসেলকে। এরশাদ, লিংকন, সাজুদের.. এরাও কথা রাখেনি। ভেঙ্গে দিলো একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে যত্তসব ছেলেমানুষী অভিযোগ তুলে। এদের সদস্যদের স্ত্রীদের ঝগড়া-ঝাঁটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়। কে আর্টসেলের স্ত্রী, সেটি নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়। আমরা যারা অভিমানী, তাঁরা এসব দেখে মুখ লুকাই। কাকে বলি আমি আমাদের সকল স্মৃতির কথা? কাকে বলি আমরা একা ঘরে হারাবার যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে শুনতাম “তোমরা কেউ কি দিতে পারো প্রেমিকার ভালোবাসা?”

আমি নিষ্পলক দৃষ্টিতে শুধু শুনি লিংকন বলছে এরশাদের বিরুদ্ধে আর এরশাদ ডিফেন্ড করছে নিজেকে। বুকের ভেতর কি একটা যেন দলা পাকাতে পাকাতে গলায় উঠে আসে… তারও কিছুদিন আগে ভেঙ্গে গেলো শিরোনামহীন। কত সহজে হয়ে গেলো বলা…তাই না? …”ভেঙ্গে গেলো”।

তুহিন আঙ্গুল তোলে জিয়ার দিকে…জিয়া তার দলবল সহ আঙ্গুল তোলে তুহিনের দিকে। এরা একটা বারো ভাবেনা কিংবা ভাবলো না আমাদের কথা। এরা একটা বারের জন্য ভেবেও দেখেনি আমাদের সমস্ত স্মৃতি, আমাদের সমস্ত ভালোবাসা… এদের কি কখনো মনে পড়ে আমাদের মুখ? আমরা যারা ওদের মুখের থেকে গানের কলি কেড়ে নিয়ে নিজেরাই গেয়ে দিতাম খোলা হাওয়ায়। সাক্ষী ছিলো সময়…সময় আমাদের হয়ে সাক্ষী দেবে…

ওরা কি মনে করতে পারে আমাদের ছবি, আমাদের চোখ, আমাদের চিৎকার, আমাদের শৈশব, আমাদের কৈশোর? নাকি স্টেজের ছদ্ম আলো, ছদ্ম ধোঁয়া’র ঘোরে এরা আমাদের কখনো মনেই রাখেনি…জানি না… ওরা কি মনে করতে পারে দলে দলে আমাদের সেই গোল হয়ে নাচা? আমাদের আনন্দ? আমাদের উচ্ছাস কিংবা বেদনার কথা?

আমাদের অতীত বহু কাল আগেই খেয়েছে রাজনীতিবিদেরা। দশকের পর দশক এরা আমাদের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে, দশকের পর দশক এরা আমাদের নিঃশেষ করে দিয়েছে। আমরা এইসব রাজনীতি, এইসব দূর্নীতি, এইসব রাষ্ট্রযন্ত্রের নোংরামি থেকে মুখ লুকাতাম শাফিনদের গানের তালে, তুহিনদের গানের তালে, আইয়ুব বাচ্চু, পার্থ, লিংকন, মিজান, সঞ্জয়, টিপু, চন্দন এদের গানের ভাঁজে… কিন্তু এরাও আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমাদের ক্রমশ গ্রাস করে নিচ্ছে ডিজে ট্যাজের কামড় দিওনা গান কিংবা “তোর মাথাটা ফাটাবো” টাইপ গান…

আমাদের শৈশব, আমাদের কৈশোর, আমাদের তারুণ্যের যে সামান্য স্মৃতি ছিলো, এসবের প্রত্যেকটি ওরা নষ্ট করে দিয়ে চলে যাচ্ছে নিজেদের মতো…

আমাদের জন্য আর কেউ রইলো না…

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close